নতুন দিগন্ত মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস

মাহফুজুর রহমান: একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। আমি তখন স্কুলে পড়ি। আমার চাচি তাঁর বাবার সুচিকিৎসার জন্য কিছু টাকা জমিয়েছেন। টাকার পরিমাণ ১২ টাকা ছয় আনা। তিনি জমানো খুচরা পয়সাগুলো আমার হাতে দিয়ে এগুলো মানিঅর্ডার করে পঞ্চগড়ে তাঁর বাবার কাছে পাঠাতে বললেন। পয়সাগুলো দেওয়ার সময় তিনি বলে দিলেন, এগুলো যেন আমি দোকান থেকে নোট আকারে পরিবর্তন করে তারপর ডাকপিয়নের হাতে দিই। তা না হলে দূরের রাস্তা পাড়ি দেওয়ার সময় খুচরা পয়সাগুলো হারিয়ে যেতে পারে।

টাকা পাঠানোর জন্য এখন আর কেউ ডাকঘরে যায় না। নিম্ন আয়ের লোকেরা ব্যাংকেও যায় না। তাদের জন্য চালু হয়েছে মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেস । সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় মোবাইল ব্যাংকিং। এই সেবা এখন দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এর গ্রাহক এবং লেনদেনের সংখ্যা ও পরিমাণ প্রতিনিয়তই বাড়ছে।

বিশ্বব্যাপী আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারকরা বর্তমানে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। এ দেশেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বছর দুয়েক আগেই বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষণা করেছে, দেশের সব মানুষকেই ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা হবে। বাংলাদেশে ৫৬টি ব্যাংক ও ৩১টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান আর্থিক খাতে কাজ করলেও এদের অবস্থান ও আগ্রহ মূলত শহরকেন্দ্রিক। ফলে গ্রামাঞ্চলের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী আর্থিক সেবা থেকে সম্পূর্ণরূপেই বঞ্চিত থেকেছে। অথচ সমাজের এই শ্রেণিকে উন্নয়ন ধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার তাগিদ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস কার্যক্রমের উদ্যোগ গ্রহণ করে।

মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস কার্যক্রম সাধারণত দুই ভাগে করা যায়। যেমন—টেলকো লেড বা মোবাইল অপারেটরনির্ভর পদ্ধতি এবং ব্যাংক লেড বা ব্যাংকনির্ভর পদ্ধতি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ ক্ষেত্রে পৃথক বা যৌথ পদ্ধতি চালু আছে। তবে বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং চালুর পর্যায়ে ব্যাংক লেড পদ্ধতিটিই বাছাই করা হয়। ব্যাংকগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২৮টি ব্যাংককে মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসের সেবা প্রদানের অনুমোদন প্রদান করা হলেও বাজারে পসার পায় ১৯টি। বর্তমানে এদের মধ্যে ১৭টি ব্যাংক বা ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রদান করছে। বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে ২০১১ সালে। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি বিকাশ এবং ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ‘রকেট’ অন্য ব্যাংকগুলোর চেয়ে এগিয়ে আছে।

মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেসের সেবাগুলোর মধ্যে নগদ অর্থ জমা, উত্তোলন ও স্থানান্তরই বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়েছে। তবে এই সার্ভিসের মাধ্যমে মোবাইল ফোনের টকটাইম কেনা যায়, ইউটিলিটি বিল প্রদান করা যায়, বেতন-ভাতাদি বিতরণ করা যায়, মার্চেন্ট পেমেন্ট করা যায়। এ সেবাগুলো ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে।

মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দেশব্যাপী এ কাজের জন্য এজেন্ট নিয়োগ করে থাকে। সেবাটি দেশের সর্বত্র পৌঁছে দেওয়ার জন্য শহর-বন্দর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত এজেন্ট নিয়োগ করা হয়। এসব এজেন্টের মাধ্যমে সেবা গ্রহণকারী গ্রাহকদের হিসাব খোলা হয়ে থাকে। গ্রাহক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে গ্রাহকের কেওয়াইসি (Know Your Customer) সম্পন্ন করা হয়। সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মূল সার্ভারে এসব তথ্য সংরক্ষণের পর গ্রাহক লেনদেন শুরু করতে পারেন। ঝুঁকি কম রাখার স্বার্থে একজন গ্রাহকের প্রতিদিনকার লেনদেনের একটা সীমারেখা টেনে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ অনুসারে একজন গ্রাহক প্রতিদিন অনধিক দুবারে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা ক্যাশ-ইন করতে পারেন। আর এই সীমা মাসে অনধিক ২০ বারে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা। ক্যাশ-আউটের ক্ষেত্রেও লেনদেনের ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। দিনে অনধিক দুবারে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা এবং মাসে অনধিক ১০ বারে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা ক্যাশ-আউট করা যায়।

দেশের প্রতিটি ছোট-বড় জনপদে মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসের এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে সবাইকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনা হয়েছে। এজেন্টের কাজ হলো গ্রাহকের হিসাব খোলা, পরিচিতি নিশ্চিত করা, ক্যাশ-ইন ও ক্যাশ-আউট (নগদ লেনদেন) করা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অন্যান্য নির্দেশনা অনুসরণ করে রিপোর্ট করা।

বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চলের বহুসংখ্যক মানুষ বর্তমানে শহরাঞ্চলে কাজ করে। বিশেষত পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের কথা বলা যায়। তাঁরা ঢাকায় কাজ করলেও প্রতিনিয়ত গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়, নিয়মিত টাকা পাঠাতে হয়। আগে এসব মানুষ দালালদের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে গিয়ে প্রায়ই বিড়ম্বনার শিকার হতো। আবার ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে হিসাব খোলাসহ যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতার ভয়ে তাঁরা ব্যাংকে যেতে খুব একটা স্বচ্ছন্দ বোধ করে না। অন্যদিকে ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন যখন-তখন যেখানে-সেখানে করা যায় না। মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস এই শ্রেণির মানুষের জন্য আশীর্বাদ হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা জমানো ও টাকা প্রেরণ তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে গ্রাহক সংখ্যা পাঁচ কোটি ৩৭ লাখ। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে এ সংখ্যা ছিল এক কোটি ৩১ লাখ। বর্তমানে প্রতিদিনকার গড় লেনদেনের সংখ্যা ৬০ লাখ ৬৪ হাজার ৪৩২টি। আবার প্রতিদিনকার লেনদেনে অর্থের পরিমাণ গড়ে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি। তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করা হলে এটা প্রতীয়মান হয় যে বিগত পাঁচ বছরে এই বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় পাঁচ গুণ। আর চলতি ২০১৭ সালেই লেনদেনের পরিমাণ ও গ্রাহকের সংখ্যা সবচেয়ে বেড়েছে।

প্রতিদিনকার লেনদেনের ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারিত থাকায় অতি সাধারণ ও দরিদ্র মানুষরাই এই সেবা গ্রহণ করে বলে অনুমান করা যায়। সমাজের এ শ্রেণির মানুষদের প্রতিদিন হাজার কোটি টাকা লেনদেন করার তথ্য উন্নয়ন চিন্তাবিদদের মনে আশার সঞ্চার করবে—এটাই স্বাভাবিক। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এই পদক্ষেপ দেখে অনেকেই যেমন আপ্লুত, যথাযথ নিয়ন্ত্রণহীনতা দেখে অনেকে আতঙ্কিত।

অর্থপাচার, ডিজিটাল হুন্ডি, সন্ত্রাসীদের মুক্তিপণ আদায়ের কাজে ব্যবহার, লটারিতে পুরস্কার জেতার ঘোষণা দিয়ে প্রতারণা এবং পেট্রোলবোমা মারার ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের কাজে ব্যবহার এই গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় সেবাকে আজ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এ অবস্থায় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তত্পরতা যদি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অপব্যবহার দমন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।

লেখক : সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক