নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে সুশীল সমাজের পরামর্শ

নিউজ ডেস্ক : অংশগ্রহণমূলক একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে সুশীল সমাজের সঙ্গে বৈঠক করেছে নির্বাচন কমিশন।

সোয়া দুই ঘণ্টার আলোচনায় উঠে আসা সুপারিশগুলো লিপিবদ্ধ করেছে নির্বাচন কমিশন। এগুলো পরে পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করে অংশীজনদের এবং সরকারকে দেয়া হবে।

তবে যারা আলোচনায় অংশ নিয়েছন তারা পরে লিখিত আকারে আরও বিস্তারিত পরামর্শ দিতে পারবেন।
সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।

এতে অংশ নিতে সুশীল সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি পেশায় প্রতিষ্ঠিত জনকে আমন্ত্রণ জানায় নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন ভবনে বৈঠক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের ছবি তোলার অনুমতি দেওয়া হলেও মত বিনিময় সভায় কাউকে থাকতে দেওয়া হয়নি। তবে সংলাপ থেকে বেরিয়ে সুশীল সমাজের কয়েকজন সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করা, সেনা মোতায়েন এবং ‘না’ ভোটের বিধান চালু, নির্বাচনকালীন সরকারের ধরনসহ বিভিন্ন বিষয়ে মত দিয়েছেন তারা।

বেলা ১১টা থেকে শুরু হওয়া এই সংলাপ চলে বেলা সোয়া একটা পর্যন্ত।

সংলাপে নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে এনে আস্থার সম্পর্ক তৈরি, নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনী মোতায়েন, নির্বাচনী আইন সংস্কার, নির্বাচন কমিশনের আইনি ক্ষমতার প্রয়োগ, না ভোট ফিরিয়ে আনা, ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্নিরাধারণসহ নানা বিষয়ে বক্তব্য তুলে ধরেন সুশীল সমাজের সদস্যজনেরা।

তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা অন্য কোনো কমিশনার এ সময় কোনো কথা বলেননি।

সংলাপ থেকে বের হওয়ার পর পরামর্শ দাতারা তারা কী বলেছেন, সেটা গণমাধ্যমকর্মীদেরকে জানান।

পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা ব্রিফিং করেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন।

গত ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর আগামী জাতীয় নির্বাচনের পথনকশা ঘোষণা করে। এই পথনকশার অংশ হিসেবে সোমবার নাগরিক সমাজের সদস্যদের সঙ্গে সংলাপে বসে তারা। এরপর রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও আলোচনায় বসবে নির্বাচন কমিশন।

সংলাপ শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা গণমাধ্যম কর্মীদেরকে বলেন, সংলাপে আসা বিশিষ্টজনরা তাদের নানা বক্তব্য তুলে ধরেছেন। তবে সেখানে কোনো বিতর্ক হয়নি।

এর আগে সংলাপ থেকে বের হয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমান বলেন, সংলাপে গুরুত্ব পেয়েছে নির্বাচনের সময় সেনা মোতায়েন প্রসঙ্গ।

বেশিরভাগ অংশীজন বলেছেন, নির্বাচনে যদি সেনাবাহিনী মোতায়েন করা না হয় তাহলে নির্বাচনটা হয়ত সুষ্ঠু হবে না। এর বাইরে নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচন কমিশনের আস্থার সম্পর্ক তৈরি করাসহ নানা বিষয়ে কথা হয়েছে।

তারেক শামসুর রেহমান বলেন, ‘একটা জিনিস আমি দেখলাম যে সিইসি কোনো বিষয়ই খণ্ডন করেননি। কোনো আর্গুমেন্ট তিনি খণ্ডন করেননি। নির্বাচন কমিশনাররাও কোনো আর্গুমেন্ট খণ্ডন করেননি। প্রতিটি আর্গুমেন্ট তারা নোট করেছেন এবং তারা যেটা বলার চেষ্টা করেছেন যে, আমরা প্রতিটি সাজেশন লিপিবদ্ধ করব, এবং লিপিবদ্ধ করে আমরা বুকলেট আকারে প্রয়োজনে আপনাদের কাছে দেব, প্রয়োজনে সরকারের কাছে আমরা দেব।’

এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক তারেক শামসুর রেহমান বলেন, ‘এই সংলাপের মূল বিষয় সেটা বেরিয়ে এসেছে, কয়েকটি পয়েন্ট, সেগুলো তারা নোটডাউন করেছেন এবং কগনিজ্যান্সিতে নেবেন বলে আমাদেরকে জানিয়েছেন। এখন দেখা যাক ভবিষ্যতে তারা কোন পর্যায়ে যেতে পারে।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘আজকে যে আলোচনাটা হয়েছে, সবচেয়ে বড় যে বার্তাটা এসেছে, সেটা হলো নির্বাচন কমিশনকে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। আর সে জন্য নির্বাচন কমিশনের হাতে যেসব আইনি ও প্রশাসনিক ক্ষমতা আছে, সেগুলোকে কার্যকর ব্যবহার করার কথা হয়েছে।’

হোসেন জিল্লুর রহমান জানান, তফসিল ঘোষণার আগে নির্বাচন কমিশনের তেমন কিছু করার নেই- সিইসির আগের এমন বক্তব্য তারা গ্রহণ করেননি। তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, করার জন্য এখনই তাদের করার অনেক কিছু আছে প্রস্তুতি হিসেবে। সেটার ব্যাপারেও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব বেশ কিছু গেছে। কিছু আইন কার্যকর করার ব্যাপারে কথা হয়েছে। কিছু আইন সংশোধন করার কথা বলা হয়েছে এবং কিছু কিছু নতুন আইনও করার কথা বলা হয়েছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, পোলিং এজেন্ট ও ভোটারদের মনে যে ভয়ভীতি আছে, সেটা দূর করতে হবে। এ জন্য তিনি ভোটের সময় সেনা মোতায়েনের কথা বলেছেন।

আসিফ নজরুল বলেন, ‘ইলেকশন কমিশন কোনো ইস্যু রেইজ করেনি। তারা ওপেনলি বলতে দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ওনাদের (নির্বাচন কমিশন) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যে সুপারিশগুলো এসেছে, সেগুলো ওনারা লিপিবদ্ধ করবেন এবং ফাইনালি সবার কাছে আমাদের পাঠাবেন। ইলেকশন কমিশন একটা কথা বলেছেন, যেটা আমাদের ভালো লেগেছে, ওনারা বলেছেন, আমাদের প্রস্তাবগুলো যেন আমরা লিখিতভাবে দেই। লিখিতভাবে আমরা যেন ডিটেইল কথা বলি, সে সুযোগ তারা আমাদের দিয়েছেন।’

ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ করা যায় কিনা তা বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, “রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক্ষেত্রে নিজস্ব লোকও হতে পারে; অথবা ইসির চিহ্নিত জেলা প্রশাসকও হতে পারে। এ কর্মকর্তা নিয়োগেও সক্রিয় থাকতে হবে। ইসির সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অভিযোগ আমলে নেওয়া হয় না বা প্রতিকার নেই- এটাতে সক্ষমতা প্রমাণ হয় না। অভিযোগ আমলে নিয়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে অনেক অনিয়ম রোধ হত।”

সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান জানান, তিনি নির্বাচনে সময় সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেয়ার বিরোধিতা করেছেন।
ওয়ালিউর রহমান আরো বলেন, এই ক্ষমতা দিলে সেটা দিতে হবে ডিসি বা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে। তারাই এই ক্ষমতার প্রয়োগ করবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, নির্বাচনের আগে সংসদ বিলোপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তিনি বলেন, যদি সংসদ বহাল তাকে এবং তিনশ জন সংসদ দায়িত্বে তাকেন, তাহলে তারা সরকারি সহযোগিতা নেবেন। নির্বাচনকালীন সরকারের এই ব্যবস্থাটা রিভিউ করা দরকার।

নির্বাচনকালীন সময়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের কাছে দেয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন দিলারা চৌধুরী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, “ভোটের সময় সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারলেই জনগণ সন্তুষ্ট থাকবে। এক্ষেত্রে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে হবে। ইসি সঠিকভাবে কাজ করলে কোনো রাজনৈতিক দলই তাদের পছন্দ করবে না। তবে জনগণকে তারা পাশে পাবে।”

বিলুপ্ত স্থানীয় সরকার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, “নির্বাচন হচ্ছে সুপার পলিটিক্যাল ইভেন্ট। এ নির্বাচনের মাধ্যমে দলগুলো ফল ঘরে তোলে। কিন্তু এখনকার সংকট দূর করে নির্বাচনী কৌশলে আসতে হবে।”

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, “সব দলকে ভোটে আনতে হবে এবং সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে আইনে ঘাটতি থাকলে তার ব্যবস্থা নেবেন। নাগরিক প্রতিনিধিরা সঙ্গে থাকবেন।”

আগামীতে এক কোটি প্রবাসী নাগরিকদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করে ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরির পরামর্শ দেন তিনি।

কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নির্বাচন কমিশনের অধীনে দশম সংসদ নির্বাচন এবং স্থানীয় সরকারের বেশ কয়েকটি নির্বাচন ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ হয়েছিল বিভিন্ন মহলে। যেহেতু কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন একাদশ সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করবে, তাই তাদের আস্থা অর্জনের কথা বলা হচ্ছে।

সিপিডির সম্মানিত ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “ইসিকে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। দৃঢ় স্বাধীন ভূমিকা নিয়ে মানুষের কাছে তা দৃশ্যমান করতে হবে এবং প্রমাণ করতে হবে। নির্বাচনী আইন কার‌্যকর করার ক্ষেত্রে অনেক দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। প্রশাসন কীভাবে নিরপেক্ষ থাকবে এবং তাদের নিরপেক্ষ রাখতে ইসি কীভাবে ভূমিকা রাখবে- তা দেখতে হবে।

“তফসিল ঘোষণার আগে ইসির করার কিছু নেই- এমন বক্তব্যকে আমরা অনেকে গ্রহণ করিনি। এখন থেকে ইসির অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে। ধর্মকে নির্বাচনী প্রচারে কোনোভাবেই নেওয়া যাবে না। বড়ভাবে ঐক্যমত হয়েছে- না ভোট চালুর বিষয়ে ব্যাপক ঐক্যমত রয়েছে। সেনাবাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে রাখতে হবে। পাশাপাশি এ দুটো বিষয়ে ভিন্নমতও এসেছে আলোচনায়।”

দেবপ্রিয় বলেন, “নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- ইসির বন্ধু রাজনৈতিক দল নয়; ইসির বন্ধু হল জনগণ, সুশীল সমাজ, মিডিয়া ও আইন-আদালত। নির্বাচনকালীন-নির্বাচনোত্তর সহিংসতা রোধের ক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।”

২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির আগের ৯০ দিনের মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করতে গত ১৬ জুলাই দেড় বছরের কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করে কে এম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন।

এর অংশ হিসেবে রাজনৈতিক দল, নির্বাচন পরিচালনা বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যম প্রতিনিধি, পর্যবেক্ষক ও নারী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় শুরু করেছে ইসি।