১০ হাজার দিরহামের জন্য পদ খোয়ালেন নওয়াজ

নিউজ ডেস্ক:  দীর্ঘ অপেক্ষার পর পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিকে ঘিরে গত শুক্রবার পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে দেশটির তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে তাঁর পদে অযোগ্য ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন। আদালতের এই রায় নিয়ে নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করেছেন দেশটির বিশিষ্ট কয়েকজন আইন বিশেষজ্ঞ।

এই আইন বিশেষজ্ঞদের একজন ব্যারিস্টার সালাউদ্দিন আহমেদ। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় জিও নিউজকে নিজস্ব মতামতে তিনি বলেন, ২০১৩ সালের নির্বাচনে নিজ প্রার্থিতার মনোনয়নপত্রে নওয়াজ শরিফ তাঁর সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক (ইউএই) কোম্পানি এফজেডই ক্যাপিটালের কাছ থেকে পাওয়া বেতন ১০ হাজার দিরহাম প্রদর্শন করেননি—শুধু এর ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের এই রায় বিস্ময়কর। প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর পদ থেকে অপসারণে এটা কোনো আইনি ভিত্তিই নয়।

এর কারণ ব্যাখ্যা করে সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, হিসাবরক্ষণের মৌলিক নীতিমালা এটাই নির্দেশ করে, কোনো কোম্পানির অ্যাক্রুয়াল সিস্টেমে উপার্জিত অর্থ গ্রহণ করা হোক বা না হোক, তা প্রদর্শিত বা ঘোষিত বলে গণ্য হয়। যা হোক, ব্যক্তিবিশেষের গৃহীত ক্যাশভিত্তিক ব্যবস্থা অনুযায়ী, তিনি যে অর্থ গ্রহণ করেননি, তা প্রদর্শন না করার সুযোগ রয়েছে তাঁর।

এই আইনজ্ঞ বলেন, শুধু হিসাবরক্ষণের নীতিমালা বিবেচনা করলেই প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া ওই রায়ের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। কারও অপ্রদর্শিত আয়ের কারণে তাঁকে সরকারি পদে অযোগ্য ঘোষণা করার ভিত্তি নেই।

নওয়াজকে অযোগ্য ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন সংবিধানের ৬২ (১) (এফ) অনুচ্ছেদ অনুসারে—উল্লেখ করে পাকিস্তানের সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সর্বোচ্চ আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবিদ হাসান আদালতের সিদ্ধান্তে হতাশা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘যেভাবে ঘটনা কাজে লাগানো হচ্ছে, তা দেখাটা মর্মপীড়াদায়ক। যেহেতু এ ঘটনায় দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, তাই তা চ্যালেঞ্জ জানানোর বা বিবাদীর পক্ষে আবেদনের সুযোগ নেই।’

প্রধানমন্ত্রী বা সরকারি পদে আজীবনের জন্য অযোগ্য ঘোষণাকে নওয়াজ চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে অভিজ্ঞ এই আইনজীবী বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে নওয়াজ কোথায় চ্যালেঞ্জ জানাবেন, সেটাই প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হওয়া উচিত। সংবিধান বলছে, প্রযোজ্য আইনি ধারা বিদ্যমান না থাকা পর্যন্ত কাউকে আজীবনের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা যাবে না। রায়ের এমন স্ববিরোধিতা আইনজীবীদের মনে বিরক্তি উদ্রেককর।

সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে আরেক বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার মনসুর শাহ বলেন, ‘অনুচ্ছেদ ৬২’র মতো খুবই বিপজ্জনক তলোয়ার সুপ্রিম কোর্ট তাঁর হাতে তুলে নিয়েছেন। বিশ্বজুড়েই সুষ্ঠু বিচারকার্যে বিবাদীকে একবার আপিল করার অধিকার দেওয়া হয়ে থাকে। পাকিস্তানের সংবিধানের ১০-এ অনুচ্ছেদেও সেই অধিকার দেওয়া আছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট ‘অনুচ্ছেদ ৬২’র মতো অস্পষ্ট বিধানের বলে নওয়াজকে অযোগ্য ঘোষণা করে এক ‘প্যান্ডোরার বাক্স’ খুললেন।

পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে সংবিধানের ৬২ ও ৬৩ অনুচ্ছেদের ওপর ভিত্তি করে নওয়াজ শরিফকে অযোগ্য ঘোষণা করা বিষয়ে স্ববিরোধিতার কথা তুলে ধরেন খ্যাতিমান মানবাধিকার আইনজীবী ও সমাজকর্মী আসমা জাহাঙ্গীরও। জিও নিউজের ‘নয়া পাকিস্তান’ অনুষ্ঠানে তালাত হুসেইনের সঙ্গে আলাপের সময় তিনি আদালতের সিদ্ধান্তের স্ববিরোধিতার কথা জানান।

আসমা জাহাঙ্গীর বলেন, ‘নৈতিকতার মানদণ্ডে যদি আপনি অভিযুক্ত হন, সে ক্ষেত্রে অযোগ্যতার মেয়াদ কয়েক বছরের জন্য কার্যকর হতে পারে। কিন্তু যখন সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬২ (১) (এফ) অযোগ্যতা নির্ধারণের ভিত্তি হয়, তখন এই মেয়াদ হয় আজীবনের জন্য। তখন অভিযুক্ত ব্যক্তি কোনো রাজনৈতিক দলের কেবল একজন নেতাই হতে পারবেন; পার্লামেন্টের সদস্য হতে পারবেন না।’

সুপ্রিম কোর্ট যেখানে নওয়াজের পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা দেখাশোনা করছেন, তখন এই পরিবার সুষ্ঠু বিচার পাবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আসমা জাহাঙ্গীর বলেন, এটা স্পষ্টভাবেই সম্ভব নয়। কেননা, যদি আপিল করা হয়, তা-ও এই আদালতই দেখবেন।