ভাঙনের কারনে দ্বীপজুড়ে হাহাকার

নিউজ ডেস্ক: প্রাপ্তি আছে, প্রত্যাশা আছে। আছে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করার মতো মানবিকতা। কিন্তু প্রাপ্তি-প্রত্যাশা কিংবা সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি আপাদত দূরে থাক। ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর দুঃখ-দুর্দশা দেখার যেন কেউ নেই।

একসময় যাদের গোয়াল ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ আর আঙিনাজুড়ে সবজির বাগান ছিল; তাদের নদী ভাঙার আগ্রাসনই এখন নিত্যসঙ্গী। ‘সকালে আমির বিকেলে ফকির’- এমন বাস্তবতা সুখে-শান্তিতে বসবাস করা এখানকার মানুষের জীবনে ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে।

বলছিলাম বাংলাদেশের উল্লেখিত কয়েকটি দ্বীপের মধ্যে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির পরিচয় নিয়ে ক্রমেই বেড়ে ওঠা অন্যতম একটি দ্বীপ হাতিয়ার কথা। এটি নোয়াখালী জেলার মানচিত্রে বর্তমানে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হিসেবে উল্লেখিত হলেও একসময় নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির কারণে দেশের সর্বত্র পরিচিত একটি স্থান ছিলো।

বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ আর প্রমত্তা মেঘনার ভাঙনের খেলায় হাতিয়ার নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি বহু আগেই নদীগর্ভে বিলীন করে দিয়ে এখন পরিণত হয়েছে দ্বীপে। এখন শুধু মুল ভূ-খন্ডের অস্তিত্বকে মানচিত্রের মাঝে টিকিয়ে রাখতে নিরন্তর চেষ্টা এখানে বসবাস করা মানুষের।

নদী ভাঙন রোধে নিজেদের কিছুই করার সামর্থ না থাকলেও বহুবার বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন এবং মিলাদ-মাহফিল ও দোয়ার আয়োজন করেছে তারা। কিন্তু তাতেও কোন লাভ হয়নি বরং ব্যর্থ হচ্ছে বারবার।

নদী ভাঙার আগ্রাসনে নিঃস্ব হয়ে হাতিয়ার উপকূলীয় অঞ্চল কেরিং চরে বাস করা ৭০ বছরের বৃদ্ধ নুরুল হুদা জাগো নিউজকে জানান, পাঁচ বার নদী ভাঙনের শিকার হয়ে এখন এ নতুন চরে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে ঠাঁই নিয়েছেন তারা।

কিন্তু তাতেও কোনো স্বপ্ন পূরণের সম্ভাবনা দেখছেন না বলে জানান তিনি। আগামী দু’তিন বছরের মধ্যে স্থানটিও নদী ভাঙনের কবলে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

এমন দুঃখ-দুর্দশা শুধু নুরুল হুদার জীবনে নয়। হাতিয়ার উপকূলে নতুন করে জেগে উঠা বয়ারচর, নলেরচর, নিঝুম দ্বীপ, ধমারচর, কালামচরসহ প্রায় নতুন বিশটি চরে বসবাস করা দেড় লক্ষাধিক মানুষও দু’তিনবার করে নদী ভাঙার আগ্রাসনে নিঃস্ব হয়েছে।

ওয়েব স্টার নামের একটি সংস্থার রিপোর্টে বলা হয়, ১৮৯০ সাল থেকে হাতিয়ার মূল ভূ-খণ্ডের উত্তর ভাগের ভাঙন শুরু হয়। তবে সেসময় ভাঙনের তীব্রতা ছিল খুবই ক্ষীণ। মূলত নোয়াখালীর মূল ভূ-খণ্ড রক্ষায় ১৯৫৭ সালে ভবানীগঞ্জ চর লরেন্সে ১.৪ মিলিয়ন রুপি ব্যয়ে একটি এবং ১৯৬৪ সালে ৯ মিলিয়ন টাকা ব্যয়ে আটকপালিয়া মান্নান নগরে একটি ক্রস ড্যাম নির্মাণ করা হয়। এরপর হাতিয়ার নদী ভাঙন বহুগুণে বেড়ে যায়।

এছাড়া সন্দ্বীপ চ্যানেল, হাতিয়া চ্যানেল, কুতুবদিয়া চ্যানেল এবং নাফ নদীর জোয়ারের পানি হাতিয়া ও তৎসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় বেশি ক্রিয়াশীল হওয়ায় এটি তীব্র ভাঙনে রূপ নেয়। ফলে হাতিয়া উপজেলার উত্তরাঞ্চলের হরনী, চানন্দী, সুখচর ও নলচিরা ইউনিয়ন মেঘনায় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়। এছাড়া চরকিং ইউনিয়ন, চরঈশ্বর ইউনিয়ন, তমরদ্দি ইউনিয়ন ও সোনাদিয়া ইউনিয়নের পশ্চিমাংশের বিশাল এলাকা মেঘনার আগ্রাসনে নিমজ্জিত হয়।

শুধু তাই নয়, প্রাচ্যের ভেনিস হিসেবে খ্যাত হাতিয়ার পুরাতন শহর, হাতিয়া জামে মসজিদসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ক্ষুধার্ত মেঘনার করাল গ্রাসে নিমজ্জিত হয়েছে। এতে হাজার কোটি টাকার সম্পদহানি ছাড়াও দেড় লক্ষাধিক অধিবাসী ভিটেমাটি হারিয়েছে।

তারা এখন বিভিন্ন সাইক্লোন শেল্টার, বেড়িবাঁধ, কিল্লায় মানবেতর জীবন যাপন করছে। কেউ কেউ নদী ভাঙনের শিকার হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় আশ্রয় গ্রহণ করেছে।

বর্তমানে তমরদ্দি ইউনিয়ন, চরকিং ইউনিয়ন ও সোনদিয়া ইউনিয়নের বিশাল এলাকা নদী ভাঙনের অপেক্ষায় রয়েছে। নদী ভাঙন রোধে এ যাবৎ সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সেগুলো প্রায় ৪৬ বছরেও সফলতার মুখ দেখেনি।

সত্তরের দশকে তৎকালীন সরকার হাতিয়ার ভূমি পুনরুদ্ধার প্রকল্প গ্রহণ করেছিল। ভূমি পুনরুদ্ধার ও হাতিয়া ভাঙন রোধ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ১৯৭৫ সালের ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার ও নেদারল্যান্ড সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। ১৯৮১ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ১ কোটি টাকা ব্যয়ে হাতিয়ার ভাঙন কবলিত এলাকায় স্পার নির্মাণ করা হয়েছিল। অবশ্য সে কর্মসূচি সফল হয়নি। পরে ১৯৮৪ সালের এপ্রিলে ‘ভাঙন রোধের সুপারিশমালা’ বাংলাদেশ সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু আজও ভাঙন রোধে কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

এক সমীক্ষায় দেখা যায়, হাতিয়ার ৫৫ ভাগ অর্থাৎ ৩৫-৭০ বছর বয়সী মানুষ কমপক্ষে ৪-৬ বার নদী ভাঙনের শিকার হয়েছে। হাতিয়ার ৮০ ভাগ লোক কৃষক এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। কৃষি জমি ভেঙে যাওয়ার কারণে অনেক কৃষক বেকার হয়ে পড়েছে। আর এ সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

সূত্রমতে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে বিগত চার দশকে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তার ৩০ শতাংশ কাজও হয়নি। ফলে নদী ভাঙন রোধ করা সম্ভব হয়নি।

আশার মাঝে হতাশার কথা হলো তমরদ্দি ইউনিয়নের পশ্চিম পাশে নদী ভাঙন রোধে শত কোটি টাকা ব্যয়ে ব্লক নির্মাণ করা হলেও অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সেটিও অসমাপ্ত থেকে যায়।

নোয়াখালী জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম জাগো নিউজকে জানান, ইতোমধ্যে পাউবো’র একটি প্রতিনিধি দল হাতিয়ার নদী ভাঙন পরিদর্শন করেছে। তারা গৃহীত পদক্ষেপ নিয়ে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে।

কারিগরি কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে অতি দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন এই কর্মকর্তা। তবে দ্বীপের সর্বস্তরের জনগণের প্রাণের দাবি- অতি দ্রুতই যেন নদী ভাঙন রোধে গৃহীত পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মুখ দেখে।