খুলনার বাতিঘর: বিএল কলেজের ১১৫ বছর পূর্তি

শংকর কুমার মল্লিক:  বৃহত্তর খুলনা এলাকায় উচ্চশিক্ষার প্রথম বাতিঘর সরকারি ব্রজলাল (বিএল) কলেজ। ১৯০২ সালে খুলনা শহরের আট কিলোমিটার উত্তরে ভৈরব নদের তীরে দৌলতপুরে মাত্র দুই একর জমির ওপর এই কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। কলেজের প্রতিষ্ঠাতা খুলনার (বর্তমান বাগেরহাট) বাঐডাঙ্গা গ্রামের জমিদার ও তৎকালীন কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী ব্রজলাল চক্রবর্তী (শাস্ত্রী)। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, পরিশ্রম ও অর্থায়নে এবং খুলনাসহ তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন স্থানের বিদ্যোত্সাহী জমিদার ও সমাজের উচ্চবিত্ত মানুষের অর্থানুকূল্য ও অকুণ্ঠ সমর্থনে এই কলেজের প্রতিষ্ঠা ও উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি সম্ভব হয়েছিল। প্রতিষ্ঠার কাল বিবেচনায় বাংলাদেশে এ কলেজের স্থান দশম এবং তৎকালীন অবিভক্ত বাংলায় একত্রিশতম। ১৯০২ সালের ৩ জুলাই কলেজের দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু হলেও শ্রেণি পাঠদান শুরু হয় ২৭ জুলাই।

শুরুতে প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল ‘হিন্দু একাডেমি’। এর দুটি অংশ ছিল—চতুষ্পাঠী ও কলেজ। ১৯০৩ সালে চতুষ্পাঠী এবং ১৯০৭ সালে বি-গ্রেডের কলেজ হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন লাভ করে। পরে চতুষ্পাঠী বন্ধ হয়ে গেলে শুধু কলেজের কার্যক্রম চলতে থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ে ৪৯ জন ছাত্র নিয়ে এফএ (ফার্স্ট আর্টস) ক্লাস শুরু হয়। তখন শিক্ষকের সংখ্যা ছিল অধ্যক্ষসহ চারজন। আবাসিক কলেজ হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং এটি ছিল অবিভক্ত বঙ্গদেশের প্রথম আবাসিক কলেজ। প্রথম সাত বছর এখানে বর্ণহিন্দু ছাত্ররা লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছে। তা ছাড়া অন্যদের এখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ ছিল না। ১৯০৯ সালে এই কলেজে নিম্নবর্ণের হিন্দু ও মুসলিম ছাত্ররা ভর্তির সুযোগ পায় এবং ওই বছর আইএসসি কোর্স খোলার অনুমতি দেয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯১৪ সালে বিএ, বিএসসি পাস কোর্স খোলার অনুমতি পাওয়া যায়।

একই বছর কলেজটি প্রথম শ্রেণির কলেজ হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যালেন্ডারে স্থান পায়। কলেজে ছাত্র বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন কোর্স চালু হওয়ার কারণে আরও জায়গার দরকার হয়। ১৯১২ সালে খুলনা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রখ্যাত দানবীর হাজী মুহম্মদ মুহসীনের সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেট থেকে ৪০ একর জমি কলেজকে দান করা হয়। ১৯২৫ সালে ইংরেজি, দর্শন ও গণিত—এই তিন বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এ কোর্স চালু ছিল। ওই সময় ছাত্র ও শিক্ষকের অভাবে অনার্স পড়ানো বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে ১৯৬০ সালে ১০টি বিষয়ে অনার্স এবং ১৯৭৩ সালে ৫টি বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স খোলা হয়।

কলেজ প্রতিষ্ঠার পরপরই স্বনামধন্য অধ্যাপক সতীশ চন্দ্র মিত্রের আন্তরিক প্রচেষ্টায় কলেজে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তাঁরই সম্পাদনায় ১৯২৩ সালে দেবায়তন নামে কলেজ ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়। সতীশ মিত্র নানা জায়গা থেকে বহু গুরুত্বপূর্ণ দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ, জার্নাল, পত্রপত্রিকা সংগ্রহ করে গ্রন্থাগারটি সমৃদ্ধ করেছিলেন। তা ছাড়া গ্রন্থাগারের এক কোণে তিনি একটি ছোট জাদুঘর গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে বহু পুরোনো পাণ্ডুলিপি, ধাতব মুদ্রা, পাথরের মূর্তি ও নানাবিধ মূল্যবান প্রত্নবস্তু সংরক্ষিত ছিল। ১৯৩১ সাল পর্যন্ত আমৃত্যু তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি এই গ্রন্থাগারের সার্বিক দায়িত্ব পালন করে গেছেন। ছন্দগুরু প্রবোধ চন্দ্র সেন, অমূল্য কুমার দাশগুপ্ত (‘সম্বুদ্ধ’ ছদ্মনামে তৎকালীন কলকাতার পত্রপত্রিকায় লিখতেন), অমূল্য ধন সিংহ, ড. নীলরতন সেন, মুনীর চৌধুরী, সুবোধ চন্দ্র মজুমদার, জিল্লুর রহমান, মো. আবদুল গণি, মুহম্মদ কায়কোবাদ, কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক প্রমুখ কৃতী শিক্ষক এই কলেজে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকতা করেছেন।

এই কলেজের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সময়ে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, পল্লিকবি জসীমউদ্‌দীন, ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌, সাহিত্যিক রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী, হুমায়ুন কবির, মনোজ বসু, চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান, কবি সৈয়দ আলী আহসান, আবুল হোসেন, আল মাহমুদ প্রমুখের আগমন ঘটে। ১৯৩৮ সালে এই কলেজে প্রথম ছাত্র সংসদ গঠিত হয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে এই কলেজের ছাত্র-শিক্ষকের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ৫৪ বছর এই কলেজে কোনো ছাত্রী ভর্তি হতে পারেনি। ১৯৫৬ সালে প্রথম হোসনেয়ারা বেগম ও হাসমত আরা হেলেন নামের দুজন ছাত্রী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হন। হোসনেয়ারা বেগম এই কলেজের প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট। ১৯৭৩ সালের আগে এই কলেজে কোনো নারী শিক্ষক ছিলেন না। ওই বছর দর্শন বিভাগে যোগদান করেন অধ্যাপক মুক্তি মজুমদার।

বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়াতেই প্রাইমারি স্কুল, মিডল ইংলিশ স্কুল, মিডল হাই ইংলিশ স্কুল, পরবর্তীকালে মাধ্যমিক উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বিএল কলেজ প্রতিষ্ঠার আগে নড়াইলে ১৮৮৬ সালে ভিক্টোরিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলেও উচ্চশিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে নানা কারণে সে সময় এই কলেজ তেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেনি। এই অঞ্চলের মানুষ বিএল কলেজ প্রতিষ্ঠার আগে কলকাতায় গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছে। তার অন্যতম কারণ খুলনা জেলাসহ এর আশপাশের এলাকার সঙ্গে কলকাতার ভৌগোলিক দূরত্ব কম, সহজ যোগাযোগব্যবস্থা, ছোট-বড় জমিদার বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির অধিকাংশ মানুষের কলকাতা শহরে আবাসনের ব্যবস্থা থাকা, অন্যদের আত্মীয়ের বাড়ি অথবা জায়গির থাকার সুবিধা ইত্যাদি।

তবে বিএল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর এই অঞ্চলের মানুষের কাছে উচ্চশিক্ষার সিংহদুয়ার খুলে গিয়েছিল। মাধ্যমিক পর্যায়ের লেখাপড়া শেষ করে যাদের কলকাতা গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সামর্থ্য ও সুযোগ ছিল না কিংবা কম ছিল, তাদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পথ সুগম হয়েছিল। বিশ শতকের চল্লিশের দশক পর্যন্ত বাগেরহাট কলেজ (বর্তমান নাম সরকারি পিসি কলেজ, প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৮ সালে) ছাড়া বৃহত্তর খুলনা জেলায় আর কোনো কলেজ ছিল না। বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক পাস, ২১টি বিষয়ে স্নাতক সম্মান এবং ১৬টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর কোর্স চালু আছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার। কর্মরত শিক্ষক আছেন ১৮৬ জন। শিক্ষার্থীদের জন্য আছে আইসিটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র, সাইবার সেন্টার, সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিএল কলেজ থিয়েটার, ডিবেটিং ক্লাব ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠন। শ্রেণিকক্ষে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সুস্থ সংস্কৃতিচর্চার চমৎকার পরিবেশ রয়েছে এখানে। শতাধিক বছর ধরে এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি এই অঞ্চলের মানুষের হৃদয়ে ও মননে জ্ঞানের আলো জ্বেলে চলেছে।

শংকর কুমার মল্লিক: সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, সরকারি ব্রজলাল কলেজ, খুলনা।