চট্টগ্রাম বন্দরের সমস্যা সমাধানে ২০ সিদ্ধান্ত

নিউজ ডেস্ক: চট্টগ্রাম বন্দরে এখন জেটি দরকার কমপক্ষে ৭০টি। গত ৪৫ বছরে হয়েছে মাত্র ৩০টি। ৩৭ একর জায়গা পড়ে থাকার পরও এতদিনে নির্মিত হয়নি ওভার ফ্লো ইয়ার্ড। জনবল সংকট নিরসনে কেন মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগে? গত এক বছরেই ৫৫টি যন্ত্রপাতি কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। অথচ ২০০৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সাত বছরে কেন যন্ত্রপাতি কেনা হলো মাত্র ৪৫টি। কারা এ সমস্যা জিইয়ে রেখেছেন ? তাদের চিন্হিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সরকারদলীয় এমপি ও চিটাগাং চেম্বারের সাবেক প্রেসিডেন্ট এমএ লতিফ । একই রকম দাবি জানান ব্যবসায়ী নেতারা।

গতকাল সোমবার সংশ্লিষ্টদের নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের উদ্যোগে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এমন ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। সভায় বন্দর ও কাস্টমসের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বক্তব্য রাখেন বিজিএমইএ, শিপিং এজেন্ট, বার্থ অপারেটর, ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিরা। চার ঘণ্টা আলোচনা শেষে নেওয়া হয় ২০টি সিদ্ধান্ত। এসব সিদ্ধান্তের অগ্রগতি প্রতি দুই মাস পরপর মনিটর করারও ঘোষণা দেওয়া হয়।

বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম খালেদ ইকবালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য এমএ লতিফ। বিশেষ অতিথি ছিলেন নৌ মন্ত্রণালয়ের সচিব অশোক মাধব রায়। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন এনবিআরের সদস্য (কাস্টম) লুৎফর রহমান, কাস্টম কমিশনার এএফএম আবদুল্লাহ খান, সদস্য (প্রকৌশল) কমডোর জুলফিকার আজিজ, সদস্য (হারবার অ্যান্ড মেরিন) কমডোর শাহীন আলম।

আমদানি-রফতানি কার্যক্রম সহজীকরণ এবং ২৪ ঘণ্টা বন্দর-কাস্টমস চালু রাখার বিষয়ে ব্যবহারকারীদের নিয়ে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। বৈঠকে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে বন্দরের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন বন্দরের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম।

২০ সিদ্ধান্ত :জেটি সংকট নিরসন করতে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজ ২০১৯ সালের মধ্যে শেষ করতে হবে। কর্ণফুলী কনটেইনার টার্মিনাল ও লালদিয়া টার্মিনালের নির্মাণকাজ ২০২০ সালে, বে-কনটেইনার টার্মিনালের প্রথম পর্যায়ের নির্মাণকাজ ২০২১ সালের মধ্যে শেষ করা হবে। বেসরকারি আইসিডির সক্ষমতা বাড়িয়ে সেখানে ৩৭ ধরনের বাইরে আরও কিছু পণ্যের খালাস কাজ সম্পন্ন করা যায় কি-না তা নিয়ে এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা। ২৪ ঘণ্টার সেবা ফলপ্রসূ করতে সংশ্লিষ্টদের অফিস খোলা রাখা, এলসিএল (এক কনটেইনারে বিভিন্ন আমদানিকারকের পণ্য) কনটেইনার জাহাজ থেকে নামানোর দু’দিনের মধ্যে আনস্টাফিংয়ের ব্যবস্থা করা, এফসিএল (পুরো কনটেইনারে এক আমদানিকারকের পণ্য) কনটেইনার দিনে দিনে ডেলিভারি দেওয়ার ব্যবস্থা করা। ৫৫টি যন্ত্রপাতির মধ্যে যেগুলো এখনও এসে পেঁৗছেনি সেগুলো দ্রুততম সময়ে আনা নিশ্চিত করা, ছয়টি কি গ্যান্ট্রি ক্রেন সংগ্রহের কার্যক্রম আরও জোরালো করা, পণ্য পরীক্ষার জন্য স্বতন্ত্র একটি শেড নির্মাণ প্রক্রিয়া দু’দিনের মধ্যে গ্রহণ করা, ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের কাজ শুরু করে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে লাইটারেজ জেটি উদ্বোধন করা। বিএসটিআই-ব্যাংক-কোয়ারান্টাইম-ফুড-নৌবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট যেসব দপ্তর থেকে ছাড়পত্র নিতে হয় সেগুলো বন্ধের দিনও চালু রাখা, এফসিএল কনটেইনার চার দিনের ফ্রি অব টাইমের মধ্যে শতভাগ খালাস করতে বিজিএমইএকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করার সিদ্ধান্ত হয়।

এ ছাড়া বন্দরের গেটে আইএসপিআর কোড মেনে নিরাপত্তারক্ষী আরও বাড়ানো, সারচার্জসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিপিং এজেন্টসহ সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা আরও জোরালো করা, প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করে নিলাম কাজ এক মাসে অন্তত দুইবার সম্পন্ন করা, বন্দরের প্রতিটি গেটে স্ক্যানার বসাতে কার্যক্রম গ্রহণ করা। বেসরকারি অফডককেও লাইসেন্স নীতিমালা মেনে স্ক্যানার সংগ্রহ করতে হবে। রফতানি পণ্য জাহাজীকরণে ‘কাট অব টাইম’ যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে বিজিএমইএকে আরও উদ্যোগী হওয়া, বন্দর ব্যবহারকারীদের নিয়ে একটি কো-অর্ডিনেশন কমিটি গঠন করে সভার সিদ্ধান্ত ও প্রতি দুই মাস পর পর তা পর্যালোচনা করা, বন্দরের যে কোনো প্রস্তাব দুই থেকে সাত দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত দিতে নৌ মন্ত্রণালয়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা, প্রতিদিন চার হাজার কনটেইনার ডেলিভারি দিতে বন্দরের যাবতীয় প্রস্তুতি থাকা এবং বন্দরের যে কোনো সমস্যা দ্রুততম সময়ে জানতে ২৪ ঘণ্টার কলসেন্টার কিংবা মোবাইল অ্যাপস চালু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সভা শেষে নৌ সচিব বলেন, মন্ত্রণালয়ে আসা বন্দরের যে কোনো প্রস্তাবনা দুই থেকে সাত দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। তবে অন্য মন্ত্রণালয় যুক্ত থাকলে ভিন্ন কথা। ২৪ ঘণ্টা বন্দর-কাস্টমস সেবা চালু করার বিষয়টি আগস্টের প্রথম সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন বলেও জানান তিনি।

বন্দর চেয়ারম্যানের সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মঈনুদ্দিন আহমেদ বলেন, ৫০ বিলিয়ন ডলারের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কতটা জেটি দরকার, কতগুলো যন্ত্রপাতি দরকার তা এখনই চূড়ান্ত করতে হবে।

বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বন্দর ও কাস্টমসের সংকট যদি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এখনই ঠিক করা না হয়, তাহলে ভয়াবহ সংকটে পড়বে দেশের পোশাক খাত। আমরা আর কোনো প্রতিশ্রুতি শুনতে চাই না। এখনই স্পষ্ট ঘোষণা চাই কোন অবকাঠামো কখন নির্মিত হবে। নতুন যন্ত্রপাতি কবে আসবে, নতুন জেটির কাজ কবে শেষ হবে।’

চিটাগাং চেম্বারের পরিচালক অঞ্জন শেখর রায় বলেন, ‘নতুন জেটি নির্মাণের ঘোষণা শুনতে চাই এ সভা থেকেই। কেন গত ১০ বছরে নতুন জেটি হয়নি তার কারণও জানতে চাই।’ মেট্রোপলিটন চেম্বারের সভাপতি খলিলুর রহমান বলেন, ‘স্ক্যানারের সংখ্যা কেন বাড়ছে না? যন্ত্রপাতির সমস্যা কারা জিইয়ে রাখল তাদেরও চি?িহ্নত করে শাস্তি দেওয়া দরকার।’ এ ক্রান্তিকালে শাটআউট করে রফতানি কনটেইনার ফেলে রেখে যদি কোনো জাহাজ চলে যায় তবে পোশাক খাতের সংকট আরও ভয়াবহ হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিজিএমইএর বক্তব্যের জবাবে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, ‘দৈনিক চার-পাঁচ হাজার ট্রাক ঢুকছে বন্দরে। কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের যন্ত্রপাতিও নাড়াতে পারি না ইয়ার্ডে। পৃথিবীর আধুনিক কোনো বন্দরে এভাবে পণ্য খালাস হয় না। তাই বিজিএমইএকে অনুরোধ করব, চার দিনের ফ্রি অব টাইমের মধ্যে অন্তত ৮০ শতাংশ মালপত্র বন্দর ইয়ার্ড থেকে নিয়ে যেতে। এখন গড়ে ৬৫ শতাংশ পণ্য ফ্রি অব টাইমে নিয়ে যাচ্ছেন তারা।’

সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি একেএম আকতার হোসেন বলেন, ‘যেদিন শুল্ক দেওয়া হচ্ছে, সেদিনই পণ্যের ডেলিভারি চান তারা। এখন শুল্ক দেওয়ার পর পণ্য ডেলিভারি দিতে আরও দু-একদিন বাড়তি সময় যায় বন্দরে। বৃষ্টি হলে বন্ধ করে রাখতে হচ্ছে পণ্য পরীক্ষার কাজ। কারণ চট্টগ্রাম বন্দরে নেই পণ্য পরীক্ষার কোনো শেড। আবার ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়ার কথা বলা হলেও নৌবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো থেকে শুক্র ও শনিবার সেবা পাওয়া যাচ্ছে না।’ এর জবাবে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, ‘পণ্য পরীক্ষার জন্য স্বতন্ত্র একটি শেড নির্মাণ করা হবে। দু’দিনের মধ্যে বন্দর এ প্রক্রিয়া শেষ করবে। কাজ শেষ করব ছয় মাসের মধ্যে।’

বেসরকারি আইসিডি মালিকদের সংগঠন বিকডার সভাপতি নুরুল কাইয়ুম খান বলেন, ‘৩৭ ধরনের পণ্যের সঙ্গে কম শুল্কের আরও অন্তত ১০টি পণ্য আইসিডিতে খালাসের অনুমতি দিলে আমাদের কোনো অসুবিধা হবে না। অফডকে পণ্য নিতে বার্থ অপারেটরদের আরও সক্রিয় হতে হবে।’ বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী বলেন, ‘জাহাজজট কমাতে ১৩, ১০ ও ১১ নম্বর জেটিতে বিশেষ ব্যবস্থায় জাহাজ নোঙর করার সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। ২৪ ঘণ্টার সেবা পেতে হলে সন্ধ্যার পরও ব্যাংক খোলা রাখতে হবে।’ জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম অঞ্চলের নির্বাহী পরিচালক মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বন্দর-কাস্টমসে ২৪ ঘণ্টার সেবা নিশ্চিত করতে হলে ব্যাংক থেকে কী কী সাপোর্ট দরকার তা আমাদের লিখিত দিন। আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’

শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক সাহেদ সারওয়ার বলেন, ‘বন্দরে পণ্য আনতে বিদেশি কোনো শিপিং মালিক সারচার্জ আরোপ করেনি। এ ব্যাপারে কারও কাছে তথ্য থাকলে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। শাটআপ করে রফতানি কনটেইনার না নিয়ে কোনো জাহাজ চলে গেলে চলমান সংকট আরও বাড়বে। শিফট পাল্টানোর আগে-পরে এক ঘণ্টা শ্রমিক-কর্মচারীদের পাওয়া যায় না। বন্দরকে এ বিষয়টি মনিটর করতে হবে।’