নতুন মুদ্রানীতিতে নতুনত্ব থাকবে কতটা

নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থবছরের সঙ্গে মিল রেখে বছরে দু’বার মুদ্রানীতি ঘোষণা করে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে কাঙ্ক্ষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য থাকে মুদ্রানীতিতে। উত্পাদনমুখী বিনিয়োগের পাশাপাশি আর্থিক খাত শৃঙ্খলিত রাখার ঘোষণা থাকে মুদ্রানীতিতে। সরকারের বাজেটের সঙ্গে মিল রেখেই ঘোষিত হয় মুদ্রানীতি। এবারের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৫ শতাংশ।

এ সপ্তাহেই ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম এবং ২০১৭ সালের দ্বিতীয় মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ফজলে কবির। মুদ্রানীতি তৈরির অংশ হিসেবে এবারও বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিশিষ্টজনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে আসা পরামর্শের আলোকে তৈরি করা এই নতুন মুদ্রানীতিতে কি থাকছে তা দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট সবার মনোযোগ ও কৌতূহলের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে।

গত অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় এবারও সতর্ক মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে বলে ধারণা করা যায়। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকায় তা নিয়ন্ত্রণের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হবে। মূল্যস্ফীতি টানা তিন প্রান্তিক ধরে বাড়ছে। সর্বশেষ এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের হিসাবে, এই তিন মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ হয়েছে। এর আগের প্রান্তিকে এই হার ছিল ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ। অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৩২ শতাংশ।

তবে অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে, জুলাই-সেপ্টেম্বরে ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। পুরো অর্থবছরের মধ্যে গত তিন মাসেই সাধারণ সীমিত আয়ের মানুষকে বেশি চাপে ফেলেছে। শেষ প্রান্তিকে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির কারণ হিসেবে আগাম বন্যার কথা বলা যায়। যার কারণে চালের দাম বেড়েছে।

আবার এই প্রান্তিকে বাজেট পাস হয়েছে। তাই বাজেট উপলক্ষেও কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। মূলত এসব কারণে শেষ প্রান্তিকে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়েছে। সার্বিকভাবে বিদায়ী অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ। যা আগের বছরের চেয়ে কম। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ।

খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। খাদ্য আমদানিতে খরচও বাড়ছে। তবে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ে মন্দাবস্থায় কমেছে বৈদেশিক মুদ্রা আয়। নতুন বিনিয়োগ না হলেও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহে কিছুটা চাঙ্গা ভাব ফিরে এসেছে। এতে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ এসেছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যে কারণে নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবাহ কিছুটা বাড়ছে।

এসব বিষয়কে সামনে রেখেই চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঠিক করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সামনে যে মুদ্রানীতি আসবে তা বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জই হবে। কারণ বর্তমানে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। এর মধ্যে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা খুবই কঠিন হবে। অর্থবছরের প্রথমার্ধ্বের মুদ্রানীতিতে বিনিয়োগের ওপর বেশি জোর দিতে হবে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে। এছাড়া যেহারে বাজারে কাজের জন্য লোক আসছে সে হারে কর্মসংস্থান হচ্ছে না।

তাই কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। রেমিট্যান্স ও রপ্তানির নেতিবাচক ধারার এক বিশেষ কারণ, এক্সচেঞ্জ রেট খুবই শক্তিশালী। এ বিষয়ে চিন্তা করতে হবে। অর্থাত্ এক্সচেঞ্জ রেট বা মুদ্রা বিনিময় হার সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে। খেলাপি ঋণ কমানোর বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এছাড়া সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমানোর বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মনোযোগী হতে হবে। গত অর্থবছরে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বেড়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত উত্পাদন দৃশ্যমান হয়নি। তাই উত্পাদনশীল খাতের ওপর জোর দিতে হবে। বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রতি বেশি জোর দিতে হবে।

কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে গৃহীত কার্যক্রমের ঘোষণা থাকতে হবে মুদ্রানীতিতে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ঋণ প্রবাহ বাড়ানোর দিক নির্দেশনা থাকতে হবে নতুন মুদ্রানীতিতে। অনেক উন্নত ও উচ্চ আয়ের দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে। এ কারণে তাদের মুদ্রানীতিতে নতুনত্ব আনার সুযোগ থাকে। সরকারের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে মিল রেখেই বাংলাদেশ মুদ্রানীতি দিতে হয়। এ কারণে মুদ্রানীতির সঙ্গে সম্পর্ক না হলেও আর্থিক শৃঙ্খলা আনা মুদ্রানীতির অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত। ব্যাংকগুলো কেন খারাপ হয়ে পড়েছে, খেলাপি ঋণ কিভাবে কমানো যায়, তার উদ্যোগ থাকতে হবে মুদ্রানীতিতে। তবে সরকারের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মিল রেখে ১৬ শতাংশ ব্রড মানি (ব্যাপক মুদ্রার) প্রক্ষেপণ করা যেতে পারে।

নতুন মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) আইন কার্যকর না হওয়ায় চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে বলে মনে করছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি আগেভাগেই বাজেটের সংশোধনও করবেন বলে জানিয়েছেন। নতুন আইনের আওতায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার ধরে চলতি অর্থবছরের বাজেটটি তৈরি করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এই আইন কার্যকরের সময় দুই বছর পিছিয়ে গেছে।

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী বলেছেন, নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হওয়া পিছিয়ে গেলেও বাজেটের আকারে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। সেজন্য এবারের সংশোধিত বাজেট অন্যবারের তুলনায় আগেই দেওয়া হবে। নতুন ভ্যাট আইনের আওতায় ভ্যাট থেকে বাড়তি ২০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের চিন্তা ছিল সরকারের। চলতি অর্থবছরের নতুন মুদ্রানীতিতে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন প্রাণ সঞ্চারে বিশেষ দিক নির্দেশনা থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা সবার।