বাজেট খুশি করলো কাদের ?

বিভুরঞ্জন সরকার:  অর্থনীতির ‘অ আ ক খ’ও আমি বুঝি না। বাজেট বিষয়েও নাদান। বাজারের প্রতিক্রিয়া দেখেই বাজেটের ভালো মন্দ বোঝার চেষ্টা করি। গণমাধ্যমের লেখালেখি, আলোচনা – সমালোচনার মধ্যেই আমার বাজেট জ্ঞান সীমাবদ্ধ। কাজেই গভীর কোনও বিশ্লেষণ বা আলোচনা, নয় একেবারেই সাধারণ কিছু আলোচনা তুলে ধরছি।

জাতীয় সংসদে মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ২০১৭-১৮ অর্থ বছরের ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বিশাল বাজেট পেশ করেছিলেন ১ জুন। এতো বড় অংকের বাজেট এই প্রথম। দেশের অর্থনীতির শক্ত অবস্থান এবং সরকারের সক্ষমতা বোঝানোর জন্যই কি এই বিপুল অংকের বাজেট? এতো সেই গবেট স্কুলবয়ের পরীক্ষার খাতা ইয়াব্বড় ‘ক’ লিখে দেখো কত বড় ‘ক’ মন্তব্য করার মতো নয়? ঢাউস বাজেট দিয়ে মন্ত্রিসভার বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য অর্থমন্ত্রী সবাইকে চম দেখাতে গিয়ে নিজেই যে গ্যাড়া কলে পড়বেন সেটা হয়তো আগে ভাবেননি।
বাজেট পেশ হলে বাজেট নিয়ে আলোচনা – সমালোচনার ঢেউ বয়ে যাওয়া আমাদের দেশের একটি সাধারণ রীতি।

আগে সংসদে বাজেট পেশ শেষ হতে না হতেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল রাজপথে বাজেটের পক্ষে – বিপক্ষে মিছিল বের করতো। সরকার পক্ষ বাজেটকে স্বাগত জানাতো, আর বিরোধীরা ‘গরিব মারার বাজেট, গণবিরোধী বাজেট’ ইত্যাদি বলে স্লোগান দিত। মানি না মানবো না বলে বাজেট প্রত্যাখ্যান করতো। এতে বাজেটের কিছু আসতো যেতো না। তবু এটা ছিল একটা রুটিন রাজনৈতিক কর্মসূচি। তবে এখন অবস্থা একটু বদলেছে। মিছিল মিটিংয়ের বদলে এখন বিবৃতি দেওয়া, টকশোতে অংশ নেওয়া, সভা-সেমিনারে বক্তব্য দেওয়াই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবার বাজেট ঘোষণার পরও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

বজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘মনে হয়েছে, এবার জীবনের শ্রেষ্ঠতম বাজেট দিয়েছি। এ জন্য অনেক কষ্টও করেছি। প্রশাসনের অন্যরাও আমার মতোই কষ্ট করেছেন’। কথায় আছে, কষ্ট করলে কেষ্ট মিলে। কিন্তু এবার অর্থমন্ত্রীর বেলায় তা হলো না। অনেক কষ্ট করে জীবনের শ্রেষ্ঠতম বাজেট দিয়েও তিনি কোনও মহলের কাছ থেকে প্রশংসা না পেয়ে পেলেন নিন্দা-সমালোচনা। শুধু সরকারের বাইরে থেকে নয়, সরকারি দলের মন্ত্রী -এমপি-নেতারাও অর্থমন্ত্রীকে ছেড়ে কথা বললেন না। সংসদে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই অর্থমন্ত্রী সমালোচিত হলেন কিন্তু প্রধানমন্ত্রী কাউকে নিবৃত করার চেষ্টা করলেন না। পরে আওয়ামী লীগের দু’এক জন নেতা বলেছেন, এতে সংসদ প্রাণবন্ত হয়েছে। এটাই নাকি গণতন্ত্রের ‘বিউটি’। হতে পারে। ওনারা যখন বলেছেন, তখন সেটাই হয়তো ঠিক । তাদের কথাতো আর অর্থহীন হতে পারে না। এই ‘বিউটিফুল’ গণতন্ত্র চর্চা কত দিন অব্যাহত থাকে সেটাই দেখার বিষয়।

বাজেট সমালোচকরা কী বলছেন তা একটু দেখা যাক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বাজেট বিশাল অঙ্কের, কিন্তু বাস্তবায়নযোগ্য বলে মনে হয় না। অর্থমন্ত্রীর মহাসড়কে ওঠার প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দুর্বলতা দূর না করে মহাসড়কে উঠে পড়লে তো দুর্ঘটনা ঘটবে।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, বাজেটে সার্বিকভাবে কিছু সাহসী পদক্ষেপ আছে। কিছু ক্ষেত্রে উচ্চাভিলাষ আছে। কিছু ক্ষেত্রে উদাসীনতাও আছে। আবার কিছু পদক্ষেপ সঠিক পথে নেই। অর্জনযোগ্য নয় জেনেও দেখানোর জন্য হলেও বড় বাজেট দেওয়া হয়েছে।

সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ছাড়া নতুন অর্থবছরের বাজেট হয়েছে উল্লেখ করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি বলেছে, কোনও ধরনের সংস্কার ছাড়া বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দিয়ে দক্ষতার সঙ্গে এই বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বাজেটের অনেক প্রক্ষেপণের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। হিসাব মেলাতে অবাস্তব তথ্য দেওয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি বাজেটকে খারাপ এবং অগ্রহণযোগ্য বলে প্রত্যাখ্যান করবে সেটাই স্বাভাবিক। তাদের ভাষায় ‘অনির্বাচিত’,‘জবাবদিহিতাহীন’ একটি সরকার জনকল্যাণকর বাজেট দেয় কিভাবে? যেন তারা ক্ষমতায় থাকতে কত জনবান্ধব বাজেট দিত। বিএনপি বাজেটকে এক কথায়‘প্রতিক্রিয়াশীল’ বলে বাতিল করেছে। ( বিএনপি কবে থেকে প্রগতিশীল হলো তা অবশ্য দেশবাসীর জানা নেই) ।

বাজেটে ভ্যাট আইন প্রয়োগ, বাড়তি আবগারি শুল্ক, ব্যাংক আমানতে সুদ আরোপ এবং সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমানোর প্রস্তাব করায় বিভিন্ন মহল থেকে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হওয়ায় বাজেটের ভালো মন্দ অন্য সব কিছু আড়ালে চলে যায়। বাইরের উত্তাপ সংসদের ভেতরেও সংক্রমিত হয়। সরকারি দলের কয়েক জন মন্ত্রী, এমপি, নেতাও বাজেট সমালোচনায় শরিক হয়ে অর্থমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক বক্তব্যও দেন। সংসদে সরকার দলীয় সদস্যদের সাময়িকভাবে বিরোধী দলের ভূমিকায় দেখে জাতীয় পার্টির সদস্যরাও চুপ থাকতে পারেননি। তারাও অর্থমন্ত্রীর প্রতি বাণ ছুড়েছেন। ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা,যারা অর্থমন্ত্রীর কাছে নানা সময়ে নানা বিষয়ে ‘তদবি