বাঘা তেঁতুল: মশা ও মানুষ

সৈয়দ আবুল মকসুদ:  মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মীয়তা দুরকমের—রক্তসম্পর্কের ও বৈবাহিক সূত্রের। প্রাণিজগতে মানুষের সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক মশার। সে সম্পর্ক আত্মিক নয়, দৈহিক। মশার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক রক্তের। মশা মানুষের রক্তসম্পর্কের শত্রু। শত্রুকে ঘৃণা করা যায় কিন্তু অবহেলা করা সম্ভব নয়।

পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে, তার মধ্যে একমাত্র মশার কাছেই বাংলা সাহিত্য ঋণী। ‘রাতে মশা দিনে মাছি,/ এই নিয়ে কলকাতা আছি’—পদ্যের কথা বলছি না। মশা না থাকলে শরৎ চাটুজ্যের অমর কীর্তি শ্রীকান্ত লেখা হতো না। শ্রীকান্তর মতো চরিত্রও আমরা পেতাম না। মশার কামড় সহ্য করতে না পেরেই শ্রীকান্তকে সন্ন্যাসগিরিতে ইস্তফা দিয়ে সংসারজীবনে ফিরে আসতে হয়। অবশ্য মশার কামড়েই যে কত মানুষকে এই মায়াময় সংসার থেকে পরপারে যেতে হয়েছে, তার হিসাব একমাত্র আজরাইল (আ.) অথবা যমদূত ছাড়া আর কারও পক্ষে রাখা সম্ভব নয়।

গত ১০ হাজার বছরে পৃথিবীতে অজগর, সাপ, বাঘ, ভালুক, হাতি যত মানুষকে হত্যা করেছে, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি মানুষকে ধরাধাম থেকে পরলোকে পাঠিয়েছে মশা। মশা নিয়ে দেশে দেশে শুধু পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পেরেশানে থাকেন না, কীটতত্ত্ববিদ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে গলদঘর্ম হচ্ছেন বহুকাল যাবৎ। হাতি নিয়ে যত গবেষণা হয়েছে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি গবেষণা হয়েছে মশা নিয়ে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সিটি করপোরেশনে মশা নিধনের জন্য বাজেট যত, পাগলা বন্য হাতির আক্রমণ থেকে বাঁচার বাজেট তার শতাংশের এক ভাগও নয়। সুতরাং প্রাণী হিসেবে ক্ষুদ্র হলেও গুরুত্বের দিক থেকে মশার স্থান অনেক ওপরে।

অনাদিকাল থেকেই মশা ও মানুষের শত্রুতা চলছে। কুশাসক নমরুদের নাকে অন্য কোনো কীটপতঙ্গ নয়, সাহস করে ঢুকে গিয়েছিল মশা। সেই মশাই তার প্রাণনাশের কারণ হয়। দিগ্‌বিজয়ী গ্রিক বীর আলেকজান্ডার অনায়াসে ভারতবর্ষ দখল করে নিতেন, যদি মশার ভয়ে তিনি স্বদেশে ফিরে গিয়ে দেহত্যাগ না করতেন। তাঁর কত সৈন্য যে ভারত সীমান্তে এসে মশার কামড়ে মারা গেছে, তার হিসাব শুধু তিনিই জানতেন।

কয়েকজন ইংরেজ সিভিল সার্ভেন্টের রোজনামচা ও আত্মজীবনী পড়েছি। বাপ-মা ও প্রেয়সী ছেড়ে আইসিএস হয়ে বাংলায় এসে সবচেয়ে বিপন্ন বোধ করেছেন তাঁরা মশা নিয়ে। কয়েকজন ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্ট মশার কামড়েই বাংলার মাটিতে সমাধিস্থ হয়েছেন। ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে বলতে গেলে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে বঙ্গীয় মশা। বিপ্লবীদের আবির্ভাব ঘটে অনেক পরে। কুড়ি শতকের প্রথম দশকে।

মশার বহুমাত্রিক ভূমিকা। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে টিক্কা খানদের ঘাতক বাহিনী ভয় করত শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের এবং মশাকে। খান সেনা ও পশ্চিম পাকিস্তানি প্যারামিলিটারি বাহিনীর সদস্যদের কেউ কেউ ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ায় ভবলীলা সংবরণ করেছে বাংলার মাটিতে। বাংলার প্রত্যন্ত এলাকায় নিধনযজ্ঞে যাওয়ার আগে তাই তাদের মশা থেকে আত্মরক্ষার সবক দেওয়া হতো। বন্দুক-স্টেনগান দিয়ে বাঙালিকে মারা যায়, মশা ওসবের পরোয়া করে না।

সব মশা অবশ্য ঘাতক নয়। অধিকাংশ মশাই ফাজিল অথবা রসিক প্রকৃতির। কিছু কিছু মশা নির্বিষ। এমনিতেই কামড়ে আনন্দ পায়। কোনো কোনো মশা কানের কাছে ভন ভন করে মজা পায়। যাহোক, কে বিষধর আর কে নির্দোষ, সেটা মশার গায়ে লেখা থাকে না। সুতরাং ভয় সব মশাকেই।

বাঙালির মহত্তম সৃষ্টিশীল প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ ভয় করতেন দুটো প্রজাতিকে, এক. ছিদ্রান্বেষী সমালোচক, দুই. মশা। কলকাতায় তাঁর মনের প্রশান্তি নষ্ট করতেন নিন্দুকেরা আর বোলপুরে তাঁর শান্তি নষ্ট করত বীরভূমের মশা। ধূপের ধোঁয়ায় মশা দূর হওয়া তো দূরের কথা, বোধ হয় তার ঘ্রাণ মশারা উপভোগই করত। তবে মশার কাছে আত্মসমর্পণের পাত্র তিনি ছিলেন না। কিছুদিনের জন্য শান্তিনিকেতনে শিক্ষালাভ করতে এসেছিলেন রসিক লেখক খুশবন্ত সিং। একদিন তিনি কবিগুরুর ঘরে উঁকি দিয়ে দেখেন তাজ্জব কাণ্ড। ঘরজুড়ে এক মশারি। তার ভেতরে কবি হাঁটাহাঁটি বা লেখালেখি করছেন।

মশা বুদ্ধিতে কবিগুরুর সঙ্গে পেরে ওঠেনি। তখন সে লক্ষ্যবস্তু করে বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামকে। নজরুল মশা না তাড়িয়ে ব্রিটিশ তাড়াতে চেয়েছেন। কারণ, তাঁর ধারণা ছিল, মশা ভারতবাসীর রক্ত যতটা শোষণ করে, ব্রিটিশরা করে তার চেয়ে ঢের বেশি। তিনি বলেছেন, তাঁর ‘চির উন্নত মম শির’। তিনি কারও কাছে মাথা নত করার পাত্র নন। নজরুল মশার কাছেও নত হননি, কিন্তু মশার কারণে শয্যাশায়ী হয়েছেন। ১৯২৬-২৭ সালে মশার কারণে বিদ্রোহী কবি বছরখানেকের বেশি মারাত্মক ম্যালেরিয়ায় ভুগেছেন। অশেষ প্রাণশক্তির কারণে তিনি বেঁচে উঠলেও ওই মশার বিষ তাঁর শরীরে থেকে যেতে পারে এবং ১৫ বছর পর তাঁর জীবনে যে বিপর্যয় নেমে আসে, তার পেছনে সেই মশার ভূমিকা নেই—সে ব্যাপারে চিকিৎসকেরা সন্দেহমুক্ত নন।

শোষণ শব্দটি মশার জীবন থেকে মানুষ শিখেছে। মশা মানবসমাজের জন্য ক্ষতিকর হলেও তার মধ্যে সাম্যবাদী চেতনা রয়েছে। ধনী-দরিদ্র, ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-পেশা এবং লিঙ্গনির্বিশেষে সবাই তার কাছে সমান। মশা সরকারি দল আর বিরোধী দল বাছবিচার করে না। মশা যদি শুধু বিরোধী দলের লোকদের কামড়াত, তাহলে মশা নিয়ে বাংলাদেশে কেউ টুঁ–শব্দটিও করত না।

বঙ্গীয় মশা বুদ্ধিমান বাঙালির কর্মতৎপরতা দেখে মৃদু হাসছে। তাকে নিয়ে শুধু প্রথাগত পত্রিকায় প্রতিবেদন নয়, লিখিত হচ্ছে জ্ঞানগর্ভ অথবা প্রতিবাদী কলাম, হচ্ছে টিভি টক শো, গোলটেবিল, মানববন্ধন, প্রতিবাদী সমাবেশ। টক শোতে দেখা যায়, স্টুডিওতে বক্তব্য দেওয়ার সময় বক্তা এক হাত নাড়ছেন শ্রোতার উদ্দেশে, আরেক হাতে তাড়াচ্ছেন মুখের সামনে থেকে মশা। মশাবিরোধী গোলটেবিল বা আলোচনা সভায় ঢুকে পড়ছে মশা। সেখানে বক্তা-শ্রোতা খেয়াল রাখছেন পায়ের দিকে। মশার বিরুদ্ধে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানুষ করছে মানববন্ধন।

জাপানের নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক সময়োপযোগী এক গবেষণা করেছেন মশা নিয়ে। অপরাধীকে ধরিয়ে দেবে বা শনাক্ত করবে মশা। সব আলামত লুকিয়ে ফেলল হত্যাকারী। ঘটনার কোনো সাক্ষী নেই। আঙুল বা পায়ের ছাপও নেই। একটা চুল পর্যন্ত পড়ে নেই। খুনির পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব নয়। সে রকম অবস্থায় একটা মশা যদি ঘটনাস্থলে সেই খুনিকে কামড়ায়, সেই মশাটি তাকে আদালতে দোষী সাব্যস্ত করার পথ করে দিতে পারে। তবে সেটা জাপানে বা অন্য দেশে সম্ভব। বাঙালি খুনিরা এরপর থেকে খুন করতে যাওয়ার সময় অস্ত্র এবং অ্যারোসল নিয়ে যাবে না, তার নিশ্চয়তা কী?

পুনশ্চ: বাংলাদেশে এখন প্রাণিজগতে মশাই সবচেয়ে বিখ্যাত। কারণ, চিকুনগুনিয়া। এই নবাগত ব্যাধির প্রাদুর্ভাব ঘটার পর মশার ব্যাপারে মানুষের কী করণীয়, তা কাউকে বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।

সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।