জাতীয় আয়ের ৭০ শতাংশই আসছে ১০টি দেশ থেকে

নিউজ ডেস্ক:  দেশের রফতানি খাত থেকে বছরে আয় হয় ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের বেশি। গুটিকয়েক পণ্য ও অল্প কিছুসংখ্যক বাজারকে পুঁজি করেই এত বিপুল রফতানি আয় হয় বাংলাদেশের। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের রফতানি আয়ের ৭০ শতাংশই আসে মাত্র ১০টি দেশ থেকে।

জানা গেছে, পণ্য ও গন্তব্যের এ বৈচিত্র্যহীনতা কাটিয়ে উঠতে চান শিল্পোদ্যোক্তারা। সরকারের তরফ থেকেও রয়েছে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা। রফতানি খাতকে বৈচিত্র্যময় করে তুলতে নতুন বাজার অনুসন্ধান ও সেসব বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উত্পাদনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন রফতানিকারকরা। তবে এসব বাজার অনুসন্ধান ও সম্প্রসারণসহ টিকে থাকার লড়াইয়ে খুব একটা ভালো করতে পারছেন না তারা। ফলে এখনো আয়ের ৭০ শতাংশই আসছে নির্দিষ্ট ১০টি দেশ থেকে।

ইপিবির তথ্যমতে, বাংলাদেশী পণ্যের প্রধান রফতানি গন্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে— যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা, নেদারল্যান্ডস, জাপান, চীন, বেলজিয়াম, পোল্যান্ড, ডেনমার্ক, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, সেন্ট বার্থলেমাই, তুরস্ক, সুইডেন, রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সদ্য সমাপ্ত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা, নেদারল্যান্ডস, জাপান ও চীন— এ ১০টি দেশ থেকে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ২ হাজার ৪৩৫ কোটি ৮৯ লাখ ৯০ হাজার ডলার। এ সময়ে রফতানি খাতের মোট আয় ছিল ৩ হাজার ৪৮৩ কোটি ৫০ লাখ ৯০ হাজার ডলার। এ হিসাবে মোট রফতানি আয়ের ৬৯ দশমিক ৯৪ শতাংশই এসেছে উল্লিখিত ১০টি দেশ থেকে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান বিজয় ভট্টাচার্য বলেন, রফতানি খাতে বৈচিত্র্য আনার মূল কাজটি করবেন রফতানিকারকরা। নতুন বাজারে উদ্ভাবনী বিপণন কৌশল ও চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পণ্য উত্পাদনের মাধ্যমে তারা এ কাজে সফল হতে পারেন। রফতানি উন্নয়নের সংস্থা হিসেবে আমাদের যা কিছু করণীয়, তা আমরা করছি।

দেখা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছর শেষে শত কোটি ডলার বা তার বেশি রফতানি আয় হয়, বাংলাদেশে এমন বাজার ছিল ১০টি। এ তালিকা থেকে বেলজিয়াম ছিটকে পড়ায় সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বাংলাদেশের শত কোটি ডলারের বাজারের সংখ্যা নয়টিতে নেমে এসেছে। পাশাপাশি এসব বাজারের মধ্যে কয়েকটি দেশ থেকে আয়ও কমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের রফতানি আয় কমেছে ৬ শতাংশ, যুক্তরাজ্য থেকে কমেছে ৬ দশমিক ৩১ শতাংশ ও কানাডা থেকে কমেছে ৩ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুটিকয়েক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশের রফতানি খাতের দুর্বলতাই প্রকাশ করছে। পাশাপাশি রফতানি পণ্যেও বৈচিত্র্যের অভাব রয়েছে। আলোচ্য বাজারগুলোয় রফতানিকৃত প্রধান পণ্যই হলো পোশাক। এ খাতের উদ্যোক্তারা তাদের উত্পাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রগুলো সীমাবদ্ধ করে ফেলেছেন। এতে করে ঝুঁকির মুখোমুখিও হতে হচ্ছে শিল্প মালিকদের। কমপ্লায়েন্সসহ নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে এসব ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। গুটিকয়েক বাজারে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণেই গেল অর্থবছরে আয়ের প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।

তথ্যমতে, বাংলাদেশের রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে পোশাক শিল্প থেকে। এ শিল্পের নিট ও ওভেন দুই ধরনের পণ্যের আয়ে প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক নয়। এর মধ্যে নিট পণ্যে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও ওভেন পণ্যে ২ শতাংশ সংকোচন দেখা গেছে। পাশাপাশি শীর্ষ তিনটি বাজারে পোশাক পণ্যের রফতানি আয়ও কমেছে।

বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের পণ্যের অন্যতম গন্তব্য ইউরোপ। সেখানে ইউরোর অবমূল্যায়ন হয়েছে। মার্কিন নির্বাচনও ক্রয়াদেশে প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া ব্রেক্সিটের প্রভাবও পড়তে শুরু করেছে। এদিকে ডলারের বিপরীতে টাকা শক্তিশালী হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রধান বাজারগুলোর নানামুখী পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের চাহিদায়। আবার এ বাজারগুলোর কমপ্লায়েন্স মানদণ্ডেও পরিবর্তন আসছে। কিন্তু পোশাকের মূল্য বাড়ছে না। এ অবস্থায় নতুন বাজার তৈরি, সম্প্রসারণ ও টিকে থাকার বিষয়টি এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

রফতানি আয়ে অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি পোশাক খাতের প্রধান ক্রেতা দেশগুলো কমপ্লায়েন্সের নামে নতুন ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরিতে ব্যস্ত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো বেশ কিছুদিন ধরে কারখানার নিরাপত্তার জন্য নিজস্ব বিভিন্ন পণ্য উপস্থাপন করে আসছে। এসব নিরাপত্তার পণ্য স্থাপনে পোশাক কারখানা মালিকদের ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শিল্প বিশ্লেষকরা বলছেন, রফতানি আয়ে অবদান বেশি রাখছে এমন দেশগুলো কর্মপরিবেশ ও শ্রম নিরাপত্তা নিয়ে বেশি সচেতন হবে, সেটাই স্বাভাবিক। কমপ্লায়েন্ট বা মানে উত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়গুলোয় উদ্যোক্তাদের দুর্বলতা থাকলে তা দূরীকরণে এসব দেশেরই বেশি সচেষ্ট হওয়ার কথা। পোশাকসহ টেকসই রফতানি খাত তৈরিতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তদের কমপ্লায়েন্ট কারখানা তৈরিতে আরো উদ্যোগী হতে হবে। আর তা শুধু দুয়েকটি দেশের জন্য নয়। বরং রফতানি বাজারের নিরাপদ বহুমুখীকরণের জন্য কমপ্লায়েন্ট ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটাতে হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দেশের রফতানি খাতের প্রধান দুর্বলতা হলো পণ্য ও বাজারে বৈচিত্র্য না থাকা। আর তা কাটিয়ে উঠতে সহযোগিতা করছে ক্রেতাসহ উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের সহযোগিতা নেয়ার পাশাপাশি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের উচিত হবে নিজ অবস্থান শক্তিশালী করা। পণ্যের গন্তব্য বহুমুখীকরণ আরো ত্বরান্বিত করতেই সার্বিক নিরাপত্তার মান উন্নত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।