বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা: বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার অবদান

সালমা আক্তার নিশু:  বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাস সুপ্রাচীন। কালের বির্বতনে বাংলা ভাষা আজ বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত । প্রাচীকালে, মধ্যযুগে ও ব্রিটিশ আমলে প্রাথমিক শিক্ষা স্বল্প পরিসরে বিত্তবান পরিবারের মধ্যে চালু ছিল । তখন শিশুরা পাঠশালা, মক্তব অথবা গুরুগৃহে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করত। প্রাথমিক শিক্ষা লাভ ব্যক্তি বিশেষের ইচ্ছা বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অর্ন্তভুক্ত ছিল না। অত:পর ইংরেজ শাসন আমলে প্রাথমিক শিক্ষা ধারার কিছুটা পরিবর্তন হয়। বিভিন্ন সরকারি দলিল ও মিশনারিদের তথ্য মতে অক্ষন্ড বাংলা প্রদেশে ৮০ হাজার প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল।

তারপর ১৯৪৭ সালের ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে ভারত , পাকিস্তান রাষ্টের সৃষ্টি হয় । পূর্ব বাংলা পূর্ব পাকিস্তান নামে পাকিস্তানের অর্ন্তভুক্ত হয়। তখন পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ২৯৬৩৩ । যা ১৯৭০ এসে আরও কমে সংখ্যা দাড়ায় ২৯০২৯ টিতে । পাকিস্তান আমলে প্রাথমিক শিক্ষা রাষ্ট্রীয় তত্তাবধানে থাকলেও অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল বেসরকারি। শিক্ষকের বেতন অত্যন্ত কম ছিল। প্রাথমিক শিক্ষায় ছিল সরকারের অবহেলা।

অত:পর ১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ ৯মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে প্রাথমিক শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ছাত্রদের মাঝে বই, খাতা, পেনসিলসহ বিভিন্ন উপকরন বিতরন করা হতো । বিদেশী বিস্কুট, ছাতু, দুধসহ বিভিন্ন খাদ্য উপকরন ছাত্রদের মাঝে বিতরন করা হতো । সারাদেশে গড়ে তোলা হয় অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান । বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছায় ১৯৭৪ সালে গঠিত ড. কুদরাত-এ-খোদা শিক্ষা কমিশনে প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮ বছর করার সুপারিশ করেন।

কিন্তু ১৯৭৫-এ ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ডের মাধ্যমে বঙ্গন্ধুকে স্বপরিবারে নৃসংসভাবে হত্যা করায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার সকল পদক্ষেপ মুখ থুবড়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রাথমিক শিক্ষায় স্হবিরতা নেমে আসে। ড. কুদরাত-এ-খোদা শিক্ষা কমিশন আলোর মুখ দেখেনি। এরপর দীর্ঘ সময় প্রাথমিক শিক্ষাসহ শিক্ষা ব্যবস্হাকে নিয়ে চলে বিভিন্ন পরীক্ষা নীরিক্ষা। এ সময় বাস্তব সন্মত কোন উদ্যোগ চোখে পড়ে না ।

১৯৯৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতা গ্রহন করার পর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা শিক্ষা ক্ষাতকে সবচেয়ে গুরূত্ব দিয়ে বাজেট প্রনয়ন করেন । অবহেলিত প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্হায় শুরু হয় প্রানের সন্চার । প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে বেশ কিছুু গুরুত্বপূর্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয় । অতঃপর ২০০৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন করেন। তিনি জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এর আলোকে একটি আধুনিক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্ন জাতি গঠনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নপূরণে ‘ভিশন ২০২১’ শীর্ষক লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। এই ‘ভিশন ২০২১’-এ দেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

শুধু তাই নয় ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে একটি উন্নত দেশে পরিণত করার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। আর সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই, বঙ্গবন্ধুর ধারাবাহিকতায় ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালে আরও ২৬১৯৩ টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করে প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে আরও একটি মাইলফলক স্থাপন করেছেন। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এর আলোকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করেন।

২০১৪ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের জীবনমান ও প্রশাসনিক উন্নয়নে প্রধান শিক্ষক পদটিকে দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার পদমর্যাদায় উন্নীত করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুগের চাহিদা মিটিয়েছেন। এ সবই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বংলা বির্নিমাণে সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতাকরণে সহায়ক হবে। ইতোমধ্যে ভর্তির হার শতভাগে উন্নীত হয়েছে। ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে।

একীভূত শিক্ষা ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করে সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। ২০১১ সাল হতে প্রাথমিক স্তরের পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম অনুযায়ী প্রায় দুই কোটি শিক্ষার্থীর হাতে চাররঙ, আকর্ষণীয়, সম্পূর্ণ নতুন পাঠ্য পুস্তক বিনামূল্যে শিক্ষা বছরের প্রথম দিনেই ‘বই উৎসব’ এর মাধ্যমে তুলে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ, পুনঃনির্মাণ, সংস্কার, নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা, স্যানিটেশন ও ওয়াশবক্স স্থাপনসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যাপক পদক্ষেপ নিয়েছে।

সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণে এক লাখের বেশি নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের মাধ্যমে ৩৪তম বিসিএস উত্তীর্নদের মধ্য হতে ৮৯৮ জনকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। আধুনিক ও বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য প্রাথমিক শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আইসিটি বেইজড প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পর্যায়ক্রমে ল্যাপটপ প্রদান, ইন্টারনেট সংযোগ ও মাল্টিমিডিয়া চালু করে আইসিটি বেইজড শ্রেণিকক্ষ চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে প্রাথমিক শিক্ষকেরা নিজেরাই ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি করে শ্রেণি পাঠদান করতে পারছেন।

সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণে ২০১৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় দেড় বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা ইন প্রাইমারি এডুকেশন (ডিপিএড) কোর্স চালু করা হয়েছে। শ্রেষ্ঠ শিক্ষক কর্মকর্তাদের প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রদান, বৈদেশিক প্রশিক্ষণ ও ভ্রমণের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে তাদের কর্মকর্তাদের স্বীকৃতি প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাই ও মূল্যায়নের জন্য দেশব্যাপী ২০০৯ সাল হতে অভিন্ন প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে পঞ্চম শ্রেণির প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা গ্রহণ করা হচ্ছে।

শিক্ষার্থীর মেধা বিকাশের সাথে সাথে তার শারীরিক ও মানসিক উৎকর্ষ সাধনে ও নেতৃত্ব বিকাশে শেখ হাসিনা সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এগুলোর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ উপবৃত্তি প্রদান, মিড ড মিল চালুকণ, স্টুডেন্ট কাউন্সিল গঠন, কাব-স্কাউট দল গঠন, ক্ষুদে ডাক্তার দল গঠন, প্রাক্তন শিক্ষার্থী অ্যালামনাই এসোসিয়েশন গঠন, বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ড কাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট উল্লেখযোগ্য।

২০১৪ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা সংক্রান্ত অধিবেশনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুনির্দিষ্টভাবে বলেছেন- ‘মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষক’ এবং বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে বলেছেন- ‘অস্ত্র নয়, শিক্ষায় বিনিয়োগ করুন।’ জাতিসংঘে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যে সরকারের যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রতিফলিত হয়েছে তা আমাদের দেশের শিক্ষা ও শিক্ষকদের মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। প্রাথমিক শিক্ষায় ছেলে-মেয়ের ভর্তির আনুপাতিক হারের ক্ষেত্রে মেয়ে শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ৫০ ভাগ উন্নীত হওয়ায় জেন্ডার সমতা অর্জিত হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার সমতা বৃদ্ধির জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইউনেস্কো পুরস্কার ‘শান্তি বৃক্ষ’ লাভ করেছেন, যা জাতির জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়।

২০৩০ সালের মধ্যে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ অর্জনে বাংলাদেশ বদ্ধ পরিকর। এর অন্যতম লক্ষ্য শিক্ষায় ন্যায্যতা ও একীভূততা অর্জনের পাশাপাশি জীবনব্যাপী শিক্ষা নিশ্চিত করা আবশ্যক। সে লক্ষ্যে বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার কাজ করে যাচ্ছেন।

প্রাথমিক শিক্ষা বাংলাদেশের অতিগুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার ক্ষেত্র। নিরক্ষরতা দূরীকরনে বর্তমান সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ। দেশের প্রতিটি নাগরিককে সুশিক্ষিত হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। এ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, এসএমসি, পিটিএ, জনপ্রতিনিধি, এলাকাবাসীসহ সমাজের প্রতিটি নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত হবে। শীঘ্রই বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে উন্নত টেকসই রাষ্ট্রের মর্যাদা পাবে। আজকের শিশুরা তাদের ত্যাগ-তিতিক্ষা, অধ্যবসায় ও দেশপ্রেমের অনির্বান শিখা প্রজ্জলিত করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করবে।

লেখক: সালমা আক্তার নিশু
প্রধান শিক্ষকা,করিমখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।