সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদের আলোকে নির্বাচিত স্বশাসিত শক্তিশালী জেলা সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন জরুরী: আ ব ম মোস্তফা আমীন

নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশের সংবিধানের ১৬ অনুচ্ছেদে নগর ও গ্রামাঞ্চলের জীবন যাত্রার মানের বৈষম্য দূর করার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করা হলেও তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে বর্ণিত “(ক) প্রশাসন ও সরকারী কর্মচারীদের কার্য, (খ) জনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং (গ) জনসাধারণের কার্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সর্ম্পকিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন” সংক্রান্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত না হওয়ায় গ্রাম-শহর, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর হওয়ার পরিবর্তে অসহনীয় মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশের সকল ক্ষমতা ঢাকায় কেন্দ্রীভূত হবার কারণে ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থানকারী ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে একটি সুবিধাভোগী লুটেরা দুর্বৃত্তায়িত সিন্ডিকেট চক্র গড়ে উঠেছে। এ চক্র শেয়ার বাজার লুট করে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে; ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদেরকে, যাদের বেশীর ভাগই যুবক, পথে বসিয়েছে। ব্যাংক থেকে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করছে। বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন যে, উন্নয়ন বাজেটের ৬০% লুটপাট হচ্ছে।

সরকারী ব্যাংকগুলো জনগণের অর্থ লুটপাটের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। জনগণের উপর অন্যায়ভাবে করের বোঝা চাপিয়ে এসব ব্যাংকের মূলধন যোগান দেয়া হচ্ছে। প্রতিদিন সংবাদপত্রে জায়গা-জমি রেজিস্ট্রেশন, মিউটেশন, কৃষক পর্যায়ে ধান-চাল সংগ্রহ, সার বিতরণ, যানবাহন রেজিষ্ট্রেশন, ফিটনেস, শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ, বিভিন্ন চাকুরীতে নিয়োগ ও বদলীতে দলীয়করণ ও দুর্নীতি, গ্রেপ্তার বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, ছাত্রাবাসে সিট বাণিজ্য, হাট-বাজার ও ব্যবসায়ীদের উপর চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, কোন কাজ না করে বিল উত্তোলন, নির্মান কাজে রডের পরিবর্তে বাঁশের ব্যবহারসহ সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হচ্ছে।

ব্রিটিশ আমলে আমরা বিজাতীয় ইংরেজ, পাকিস্তানী আমলে পাঞ্জাবীদের দ্বারা শোষিত হয়েছি। এখন দেশের মানুষ দেশীয় বিজাতীয়দের (শোষকদের কোন জাত হয় না) দ্বারা শোষিত হচ্ছে। ১০ বছর আগে যারা ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যর্থ ছিল এখন তারা হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছে। লুটপাটের কারণে সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া শিশুটির কাঁধেও অনৈতিকভাবে ৪০ হাজার টাকার ঋণের বোঝা চাপান হচ্ছে।

কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষকে শোষণ করার প্রক্রিয়াকে পুঁজিবাদীরা জায়েজ করতে এ কথা বলে যে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে শোষণের মাধ্যমেই পুঁজির বিকাশ সম্ভব। শোষণ থেকে পাওয়া পুঁজি শিল্প কারখানায় বিনিয়োগ হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, মানুষের আয় বৃদ্ধি পায়, ক্রয় ক্ষমতা বাড়ে, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বিস্তৃত হয়, দেশের সার্বিক উন্নয়ন ঘটে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে যে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে শুধুমাত্র এলসির মাধ্যমে ৭৩ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। ২০১৩ সালে যা ছিল ৭৬ হাজার কোটি টাকা।

ধারণা করা হয় যে বর্তমানে অর্থ পাচারের পরিমাণ বেড়েছে। এলসি ছাড়াও চোরাকারবার, হুন্ডি ও অন্যান্য পথে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হবার কথা। পুঁজিবাদীদের পুঁজি বিকাশের তত্ত¡ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কাজে লাগেনি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সীমাহীন লুটপাট ও শোষণ থেকে পাওয়া সম্পদ বিদেশে পাচার হচ্ছে। তারা দেশে কোন শিল্প কারখানা গড়ে তোলেনি, কোন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়নি। এরা কানাডা, মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশে বিলাশবহুল জীবন যাপন করছে এবং প্রবাসীদের ভাষায় “বেগম পাড়া” গড়ে তুলছে। সুইস ব্যাংকে টাকার পাহাড় বানাচ্ছে।

গণতন্ত্র মানে হচ্ছে এক ধরনের উৎসব। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরনের মাধ্যমেই এ উৎসব উদযাপন নিশ্চিত করা হয়। পৃথিবীর প্রত্যেক দেশেই কর আরোপ ও আদায়, উন্নয়ন কর্মসূচী প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন (কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বনায়ন, গবাদি পশু, মৎস) আইন শৃঙ্খলা (পুলিশ) রক্ষার দায়িতপ্রাপ্ত শক্তিশালী নির্বাচিত স্বশাসিত স্থানীয় সরকার কাজ করে। বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন নামে যথা প্রদেশ, স্টেট, সিটি সরকার, আঞ্চলিক সরকার, কাউন্টি সরকার কাজ করে। বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে সকল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এককেন্দ্রীক সরকারের কুক্ষিগত।

স্বাধীনতার পর থেকে যারা দেশ পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত তারা সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে অর্পিত নির্দেশনার আওতায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে ব্যর্থ হয়েছে। গ্রাম সরকার, উপজেলা ও জেলা পরিষদ গঠনের লক্ষ্য ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের হাত সম্প্রসারিত করা, কোন অর্থেই স্বশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করা নয়।

বহু রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের শোষণমুক্তি ঘটেনি। উৎপাদনে, পরিবহনে, বিতরণে চাঁদাবাজদের সিন্ডিকেট নিরষ্কুশ হবার কারণে কৃষক তার কৃষি উপকরণ ন্যায্য মূল্যে পাচ্ছে না, উৎপাদিত পণ্যের দাম পাচ্ছেনা। কৃষক, শ্রমিক ও নি¤œ আয়ের পরিবারের সিংহভাগ মানুষ এখনও প্রয়োজনীয় পুষ্টি (দৈনিক ১টা ডিম, ১ গøাস দুধ, ৬০ গ্রাম মাছ মাংস, ৩০ গ্রাম ডাল, ৫০ গ্রাম আলু, ৩০ গ্রাম চিনি, ৩০ গ্রাম মাখন চর্বি, ৩০ গ্রাম বাদাম, ১০০ গ্রাম ফল, ২০০ গ্রাম শাকসবজী, ৩০০ গ্রাম চাল আটা) থেকে বঞ্চিত। জাতি হিসেবে বর্তমান পরিস্থিতি অবশ্যই বেদনা ও কলঙ্কের।

বাংলাদেশের কৃষক, শ্রমিক, নিম্নবিত্তের রক্ত শোষণকারী ঢাকায় গড়ে উঠা লুটেরা চক্র থেকে মুক্তি পেতে হলে অনতিবিলম্বে সংবিধানের ৫৯, ৬০ অনুচ্ছেদের আলোকে প্রত্যেক জেলায় জনগণের নিকট প্রতিনিয়ত জবাবদিহিতায় বাধ্য নির্বাচিত জেলা সরকার প্রতিষ্ঠা জরুরী। এককেন্দ্রীক ক্ষমতা নির্ভর মাফিয়া চক্রের বিলোপ না ঘটানো গেলে দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাও সম্ভব হবেনা।

শাসন ব্যবস্থার এককেন্দ্রীকতার কারণে ঢাকা পৃথিবীর অন্যতম ঘণবসতিপূর্ণ বাসের অযোগ্য শহরে পরিণত হয়েছে। শুধুমাত্র ঢাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করায় জেলা পর্যায়ে কোন উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সম্প্রসারিত হয়নি। জনগণকে ঢাকামূখী হতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা সার্বিক সুষম উন্নয়নের পরিপন্থি।

জেলা সরকারের রূপরেখা
১) মূখ্য সেবক, ২) শিক্ষা সেবক, ৩) কৃষি সেবক, ৪) স্বাস্থ্য সেবক, ৫) যোগাযোগ সেবক, ৬) পানি সম্পদ সেবক, ৭) বন সম্পদ সেবক, ৮) জনসংখ্যা পরিকল্পনা সেবক, ৯) পশু সম্পদ সেবক, ১০) মৎস ও হাস মুরগী সেবক, ১১) পূর্তকর্ম ও গৃহায়ন সেবক, ১২) সমবায় সেবক, ১৩) শিল্প সেবক, ১৪) ভূমি প্রশাসন সেবক, ১৫) শালিস সমন্বয় সেবক, ১৬) কেন্দ্রীয় সরকার সমন্বয়ক সেবক, ১৭) আইন শৃঙ্খলা সেবক।

জেলা মূখ্য সেবক ও অন্যান্য বিভাগীয় সেবক ছাড়াও উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও ওয়ার্ড কাউন্সিলারগণ সমন্বয়ে নির্বাচিত জেলা সরকার গঠিত হবে।

১) যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারতের প্রাদেশিক/স্টেট/সিটি/আঞ্চলিক সরকার যে সব কর আদায় করে এবং সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকারের জনসংখ্যা, আয়তন, কর আদায় ও উন্নয়নের স্তর বিবেচনায় কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক আদায়কৃত করের হিস্যা পায়, আমাদের জেলা সরকার একই পদ্ধতিতে তা পাবে এবং ব্যয় করবে। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ছাড়া জেলা সরকার প্রাদেশিক/স্টেট/সিটি/আঞ্চলিক সরকারের আদলে পরিচালিত হবে।

২) জনগণের সরাসরি ভোটে জেলা সরকার নির্বাচিত হবে এবং প্রত্যেক বছর আস্থা ভোট হবে। (রিকল পদ্ধতি)

৩) কোন জেলা সরকার সাম্প্রদায়িক আচরণ করলে, জঙ্গীবাদকে প্রশ্রয় দিলে, দুর্নীতিতে লিপ্ত হলে, বাংলাদেশের স্বার্থ বিরোধী কার্যে অংশ নিলে অথবা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি হয় এমন কাজ করলে জাতীয় সংসদ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট জেলা সরকারকে বাতিল করতে পারবে, তবে শর্ত থাকে যে বাতিল হবার ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত সরকার গঠন করতে হবে।

করণীয়

১) স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব ও একতিয়ার একটি স্বয়ং-সম্পূর্ণ আইনে নির্ধারণ করে দিতে হবে এবং পূর্নাঙ্গ বিধি ও নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
২) সংসদ সদস্যগণ আইন প্রণয়ন ও সংসদীয় কমিটিতে দায়িত্ব পালন ছাড়া কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে কোন প্রকার উন্নয়ন, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হতে পারবেন না মর্মে একটি আইন পাশ করতে হবে।

কর্ম-কৌশল

নির্বাচিত স্বশাাসিত জেলা সরকার প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে তৃণমূল পর্যায়ে কার্যকর জনমত সৃষ্টি করতে হবে।

কেন্দ্রীয় নির্বাহী সরকারের কর্মপরিধি
১। রাষ্ট্রের অন্য দুটি স্তম্ভ তথা সংসদ ও বিচার বিভাগকে প্রয়োজনীয় সমর্থন প্রদান, বিভিন্ন কমিশন তথা নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, কম্পট্রোলার ও অডিটর জেনারেল অফিস, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, শিক্ষা কমিশন, স্বাস্থ্য কমিশনসহ বিভিন্ন কমিশনকে সহায়তা করা, ২) প্রতিরক্ষা, ৩) পররাষ্ট্র, ৪) পরিকল্পনা, ৫) মুদ্রা ও কর ব্যবস্থাপনা, ৬) প্রাকৃতিক সম্পদ, ৭) বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, ৮) রেলওয়ে, হাইওয়ে ও ওয়াটার ওয়েজ, ৯) শিল্প বাণিজ্য, ১০) কেন্দ্রীয় প্রশাসন, ১১) বিভিন্ন কমিশন ছাড়া জাতীয় প্রতিষ্ঠান, বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান, আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ১২) আন্তঃজেলা সমন্বয়।

বাংলাদেশের এক একটি জেলায় সাধারণভাবে ২০ থেকে ৩০ লক্ষ লোক বাস করে। পৃথিবীর বেশীরভাগ দেশের জনসংখ্যাও এর কাছাকাছি। দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও সুষ্ঠু পরিসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে আমাদের জেলাগুলোর আয়তন ও জনসংখ্যা একটি আদর্শিক প্রশাসনিক স্তর হবে। নিকট অতীতে রাশিয়ান ফেডারেশনের ইউএসএসআর থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় সোভিয়েত রাশিয়া বিলুপ্ত হওয়া এবং সিকিমের স্বাধীনতা বিপন্ন হবার অভিজ্ঞতার আলোকে আইন প্রনয়নের ক্ষমতাসম্পন্ন প্রদেশ গঠন ভূ-প্রকৃতি বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতি হবে।