১২ মার্কেটের মালিকানা হারাচ্ছে রেলওয়ে

নিউজ ডেস্ক: রাজধানীর অন্তত ১২টি মার্কেটের মালিকানা হারাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সেই সঙ্গে বেহাত হয়ে যাচ্ছে শত কোটি টাকার জমি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা শহরে ১২টি মার্কেটে অন্তত ১২ একর জমি রয়েছে। হাটবাজারের নামে প্রথমে এসব মার্কেট চলে যায় সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায়। তবে শর্তানুযায়ী আয়ের একটা অংশ রেলের পাওয়ার কথা ছিল। সে হিসাবে পাওনা ২৩ কোটি টাকাও আদায় করতে পারছে না রেল কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া মার্কেটসংলগ্ন জমির বাকি অংশও চলে গেছে প্রভাবশালীদের দখলে। এর পেছনে আছে রাজনৈতিক প্রশ্রয়। দখল নিতে ভেঙে ফেলা হয়েছে আগের স্থাপনা। গড়ে উঠেছে নতুন দালানকোঠা। এগুলোর কোনো জমি এখন রেলের নিয়ন্ত্রণে নেই।

যে জমিতে এসব স্থাপনা গড়ে উঠেছে, কাগজপত্রে তার মালিকানা বাংলাদেশ রেলওয়ের। কিন্তু নিজের জমি দখলে বাধা দেয়নি রেল। এখন মামলা-মোকদ্দমার কারণে পরিস্থিতি এতই জটিল হয়েছে রেলও আর শত কোটি টাকা মূল্যমানের জমি উদ্ধারের আশা করতে পারছে না। বরং এসব মূল্যবান জমি কাগজে-কলমে লিখে দেওয়ার জন্য রেলকে চাপ দেওয়া হচ্ছে। সব মিলে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে থাকা এক ডজন মার্কেটের কাগজের মালিকানাও হারানোর পথে রেল। অবশ্য এ নিয়ে আজ বুধবার আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা আহ্বান করা হয়েছে।

রেল সূত্র জানিয়েছে, ১৯৮৪ সালের ১০ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ সভায় ঢাকার রেলওয়ে হাটবাজার (মার্কেট) ঢাকা সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৫ সালের ২৪ জানুয়ারি এবং ২৯ জানুয়ারিতে সাতটি নকশার মাধ্যমে উভয়পক্ষের যৌথ স্বাক্ষরে ১২টি মার্কেটের ৯.১৯ একর জমি শুধু ব্যবস্থাপনার জন্য হস্তান্তর করা হয়।

এ বিষয়ে রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন বলেন, মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত ছিল হাটবাজার সিটি করপোরেশনে হস্তান্তর করতে। রেলের জমির সঙ্গে হাটবাজারের কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ তখন রেলের জমিও হাটবাজার হিসেবে নিয়ে নেয় করপোরেশন। এটি বিধিসম্মত হয়নি। এমনকি অনেকে দলিলও করে ফেলে। নির্মিত হয় স্থাপনা। এভাবে বেহাত হয়ে যাচ্ছিল মূল্যবান জমি। এখন এসব জমি উদ্ধার করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট রেল কর্মকর্তারা জানান, রেলের জমির মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ হকার্স মার্কেট (০.৩৪ একর), বঙ্গবাজার ও গুলিস্তান হকার্স মার্কেট (০.৪৯ একর), আদর্শ মহানগরী হকার্স মার্কেট (০.৬৭ একর), জনতা, সোহরাওয়ার্দী, মালেক শাহ, শেরেবাংলা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হকার্স মার্কেট (২.৭৫ একর), আনন্দ বাজার হকার্স মার্কেট (৩.৯৭ একর) এবং খিলগাঁও বাজার (০.৯৭ একর)। আরও ৩.৬৬ একর রেলভূমি অবৈধভাবে দখল করে মার্কেট নির্মাণ করে সিটি করপোরেশন। সেগুলো হচ্ছে গুলিস্তান ও বঙ্গবাজার হকার্স মার্কেট (১.৪০ একর), আদর্শ মহানগর হকার্স মার্কেট (০.৪৫ একর) এবং কাপ্তানবাজার এলাকায় হোসেন সোহরাওয়ার্দী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মালেক শাহ ও শেরেবাংলা হকার্স মার্কেট (১.৮১ একর)।

এ মার্কেটগুলো স্থানান্তরের বিষয়ে ১৯৮৪ সালের ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় কয়েকটি সিদ্ধান্ত হয়। তখন বলা হয় রেলভূমিতে অবস্থিত হাটবাজার শুধু ব্যবস্থাপনার জন্য সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করতে হবে। তবে জমির মালিকানা থাকবে রেলওয়ের কাছেই। তা ছাড়া মোট অর্জিত আয়ের ৫ শতাংশ রেলওয়েকে দেবে। আরেকটি বড় সিদ্ধান্ত ছিল, রেলভূমির অবস্থান পরিবর্তন করা যাবে না। অথচ রেলভূমির অবস্থান পরিবর্তন করে কয়েকটি স্থানে বহুতল মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, মালিকানা দাবি করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র জাল কাগজপত্র তৈরির পর রেলওয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আদালতে মামলা করে।

রেলের ভূসম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, এসব মামলা নিষ্পত্তিতে পদক্ষেপ নেয়নি সিটি করপোরেশন। দ্বৈত ব্যবস্থাপনার কারণে এসব জমির মালিকানাই বরং হারাতে বসেছে রেল কর্তৃপক্ষ। এর অন্যতম দৃষ্টান্ত ‘আনন্দ বাজার’। ৩ একর ৯৭ শতাংশ জমিজুড়েই গড়ে উঠেছে পাকা ভবন। বঙ্গবাজারের বিপরীতে বহুতল ইসলামিয়া মার্কেট। তার পাশেই হোমিও প্লাজা নামের আরেকটি ছয়তলা মার্কেট। এর পাশে ও পেছনে আরও সাততলা মার্কেট। মার্কেটের পশ্চিমে অসংখ্য ছোট ছোট ঘর, তার মাঝে কয়েকটি বহুতল ভবন। বাড়িঘরের পর হলো আনন্দ বাজার। সেখানে বহুতল ভবনগুলো নির্মিত হয়েছে রাজউক ও সিটি করপোরেশনের অনুমোদন নিয়েই। জমির মালিকানা নিয়ে মামলা থাকলেও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগও আছে সব ভবনেই।

আশির দশকে এ জামিতে সিটি বাস টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দেয় সিটি করপোরেশন। পরিবহন নেতারা এখনো জমিটি চাইছেন সিটি টার্মিনাল নির্মাণ করার জন্য। তা হলে গুলিস্তান ও ফুলবাড়িয়া এলাকায় বাস রেখে সড়কে আটকে রাখতে হবে না। আর স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, চারটি মার্কেটে প্রায় এক হাজার দোকান রয়েছে। এগুলো থেকে মাসে প্রায় কোটি টাকা ভাড়া আসে। এর একাংশ যায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের পকেটে।

এদিকে জমি হস্তান্তরের পর ঢাকা সিটি করপোরেশন ১৯৯৩ সালের ৩১ জুলাই শুধু এক কিস্তিতে ২ লাখ ৬৭ হাজার ২০ টাকা রেলওয়েকে পরিশোধ করে। এর পর আর টাকা পরিশোধ করা হয়নি। সব মিলে এখন পাওনা ২৩ কোটি টাকারও বেশি বলে দাবি করছে রেল কর্তৃপক্ষ। এ সংক্রান্ত নথিতে দেখা গেছে, ২০১২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত পাওনা ১১ কোটি ২০ লাখ ২৩ হাজার ৯৪৭ টাকা। এর পর থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৭০ টাকা হারের ওপর ৫ শতাংশ হিসাবে পাওনা ৭০ লাখ ৫ হাজার ৫৩৭ টাকা। আর একই সময়ে ৭০ টাকা হারে অবৈধ দখলীয় জমির পাওনা (বর্গফুট হিসাবে) ৫ কোটি ৫৮ লাখ ৩৬০ টাকা। নির্ধারিত সময়ে পাওনা পরিশোধ না করায় ২০ শতাংশ জরিমানা, ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত পাওনা এবং মিলনায়তন ও রেলওয়ের বাসাভাড়ি ভাঙার ক্ষতিপূরণ বাবদ পাওনা মিলে দাঁড়িয়েছে ২৩ কোটি ২৩ লাখ ১ হাজার ৭৪৩ টাকা।

সম্প্রতি ঢাকা পরিবহন কর্তৃপক্ষের কাছে (ডিটিসিএ) এক চিঠিতে জানায়, সংঘবদ্ধ জালিয়াতকারী চক্র ও ভূমিদস্যুরা জমিটিতে ৩২টি অবৈধ বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে। এর মধ্যে পাঁচটি সাততলা, সাতটি ছয়তলা, পাঁচটি ছয়তলা, পাঁচটি চারতলা ভবন। দখল পোক্ত করতে নির্মাণ করা হয়েছে দুইটি মসজিদ ও দুইটি মাদ্রাসা। পাকা এবং আধাপাকা ঘর আছে আরও ৫০০। জমির মালিকানা নিয়ে বিভিন্ন আদালতে মামলা চলছে পাঁচটি। দখলদাররা জমির মালিকানা দাবি করে এসব মামলা দায়ের করেছে।

অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, জমির দখল হাতছাড়া হওয়ার পেছনে দায় এড়াতে পারে না রেলওয়ে। ২০১০ সালে তিন দশমিক ৯৭ একর জমির ১ একর ১০ শতাংশ ‘আনন্দ বাজার বণিক সমিতি’ নামের একটি সংগঠনকে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য ইজারা দেয়। জমিতে ‘আনন্দ বাজার রেলওয়ে সুপার মার্কেট’ নির্মাণের কথা ছিল সমিতির। বাকি ২ দশমিক ৮৭ একর জমিতে রেলের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণের সুপারিশ করেছে রেল মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। রেলের কাছ থেকে ইজারা নিলেও সমিতির নতুন নেতৃত্ব দখলদারদের পক্ষ নিয়েছে। তাদের ভাষ্য, জমিটি রেলের নয়।

রেলের নথি থেকে জানা যায়, মৃত সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি ঢাকার রমনা মৌজার ১৩৫ থেকে ১৩৯ দাগের ৩ দশমিক ৯৭ একর জমির মালিকানা দাবি করে মামলা করেন। ওই মামলায় সুপ্রিমকোর্ট সিভিল রিভিশন (মামলা নম্বর ৫২০/২০০৮ এবং ৫২২/২০০৮) জমির মালিকানা রেলকে বুঝিয়ে দিতে বলেন। কিন্তু রায় পক্ষে পেলেও জমির দখল পায়নি রেল। বরং সৈয়দ সিরাজুল ইসলামের উত্তরসূরিরা ৩২৯টি দোকানের ভাড়া আদায় করছেন। আর আনন্দ বাজারের পশ্চিম প্রান্তে প্রায় দুই বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ কার্যালয়। এ কার্যালয়টিও রেলের জমিতে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে।

স্থানীয় প্রবীণ নেতা আইয়ুব আলী জানান, ফুলবাড়িয়া স্টেশন পরিত্যক্ত ঘোষণার পর থেকেই শুরু হয় জমি দখল। যার ‘শক্তি’ ছিল সে-ই দখল করেছে। তবে প্রশাসনের আন্তরিকতা আর রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্দেশ পাওয়া গেলে জমি উদ্ধার খুব কঠিন কাজ নয়।