বাংলাদেশে আঙুর উৎপাদন সম্ভব

নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশে ফল চাষের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলছে। কেননা দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ফল উৎপাদনের অনুকূলে। বাড়ির আঙিনায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, রাস্তার পাশে, পুকুর পাড়, খাস ও পতিত জমিতে ফলদ বৃক্ষ রোপণ করলে প্রতিটি বাড়ি হবে পুষ্টিতে ভরপুর। সৃষ্টি হবে ছোট-বড় ফল বাগানের এবং সমাজে আসবে উন্নয়নের ছোঁয়া। এ ক্ষেত্রে যুবসমাজ আঙুর চাষের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের পথ খুঁজে পেতে পারে।

বাংলাদেশের অনুকূল জলবায়ু বিভিন্ন ধরনের ফল উৎপাদনের জন্য বিশেষ সহায়ক। একই গাছে সারা বছর অথবা বছরে ২-৩ বার ফল ধরে এমন ফলের গাছের সংখ্যা কম। তবে একই গাছে বছরে ২-৩ বার ফল ধরে এমন ফলের মধ্যে আঙুর অন্যতম। ফলে বাংলাদেশে আঙুর চাষের সম্ভাবনার কথা চিন্তা করা হয়।

বাংলাদেশে আঙুর চাষ তেমন একটা হয় না। ফলটি বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে আমদানি করা হয়। অথচ আঙুর উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে এদেশে কখনও কখনও ক্ষুদ্রাকারে গবেষণা বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলেও তার ধারাবাহিকতা পরবর্তীতে লক্ষ্য করা যায়নি। তবে দেশে দু’চারজন সখের বশে আঙুর গাছ রোপণ করেছেন। কিন্তু রোপণের পরবর্তী কার্যক্রমগুলো সুষ্ঠুভাবে অনুসরণ না করায় উৎপাদন সম্ভব হয়নি। আর হলেও তা প্রখর অম্লতার কারণে মুখে দেওয়া সম্ভব হয় না।

আঙুর উৎপাদনে প্রযুক্তিগত অজ্ঞতার কারণেই ফলটি এদেশে প্রসারতা লাভ করেনি। তাছাড়া এদেশের অনেকেরই ধারণা যে, এদেশে বিরাজমান আবহাওয়া ও জলবায়ুর মধ্যে আঙুর উৎপাদন সম্ভব নয়। এই ধারণা নিতান্তই ভুল। কারণ ফলটির ওপর কোনরূপ গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই দু’চারজনের সাধারণ মতামতের ওপর ভিত্তি করে ফলটির প্রসারতায় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণেই আঙুরের ওপর গবেষণার ক্ষেত্রে কেউ বিনিয়োগে আগ্রহী নয়।

বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, তাইওয়ান ও মালয়েশিয়ার জলবায়ু আমাদের দেশের জলবায়ুর চেয়ে খুব একটা ভিন্নতর নয়। তাছাড়া মাটির প্রকৃতি ও গুণগত বৈশিষ্ট্য প্রায় একই রকম। তা সত্ত্বেও ওইসব দেশ আঙুর উৎপাদন করে নিজস্ব চাহিদা পূরণ করে প্রচুর পরিমাণে বিদেশে রফতানি করতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আশাবাদ ব্যক্ত করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

আমাদের দেশের জলবায়ু এবং তাপমাত্রা আঙুর চাষের উপযোগী। আঙুর চাষের জন্য গড় তাপমাত্রা দরকার ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটি উত্তমভাবে বাংলাদেশে বিরাজমান। আঙুর পাকার সময় বৃষ্টি না হলে ভালো। যেহেতু আঙুর জুন মাসে পাকে তাই বৃষ্টি কোন সমস্যা নয়। তবে আগাম বৃষ্টি হলে গাছের গোড়ায় যাতে পানি না জমে এবং শিলাবৃষ্টি ক্ষতি করতে না পারে; সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

বিজ্ঞানভিত্তিক অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশি আবহাওয়ায় সারা বছর ফল ধরে (দু’বার ফল ধরে) এমন ফলের উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং তাদের বাণিজ্যিক চাষের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা জরুরি। একথা মনে রেখে বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমি আঙুর চাষের ওপর একটি গবেষণা প্রকল্প ১৯৯৯-২০০০ সালে হাতে নেয়।

এ কার্যক্রমের আওতায় দেশের প্রান্ত থেকে দেশি-বিদেশি জাত সংগ্রহ করে একাডেমির ২নং নার্সারিতে ২০০০-২০০৩ সাল পর্যন্ত ট্রায়াল দেওয়া হয় এবং আশাব্যঞ্জক জাতগুলো ২০০৪ সালে ১নং নার্সারিতে স্থানান্তর করা হয়। বাগান স্থানান্তরের কারণে ২০০৭ সালে ৩টি, ২০০৮ সালে ৫টি এবং ২০০৯ সালে ৬টি, ২০১০ সালে ৭টি, ২০১১ সালে ৮টি, ২০১২ সালে ১০টি জাত এবং ২০১৩ সালে ১১টি জাতের মোট ৫৫টি গাছের মধ্যে ৪৪টি গাছে ফুল-ফল ধরে এবং অদ্যাবধি চলমান আছে।

শীতকালে আঙুরের পাতা ঝরে যায় এবং গাছ সুপ্তাবস্থায় শীতকাল অতিবাহিত হয়। আবার বসন্তের আগমনে (ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে) নতুন লতাপাতা গজানোর সঙ্গে সঙ্গে মুকুল আসে এবং পরবর্তীতে তা ফলে রূপান্তরিত হয়। জুন মাসের ১ম সপ্তাহে আরডিএ-১১ এবং অন্যান্য জাত ৩য় সপ্তাহের মধ্যে পাকা শেষ হয়।

আঙুর চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী স্থান- যেখানে পরিমিত বৃষ্টি অথচ মাটিতে পানি দাঁড়ায় না। অপরদিকে আবহাওয়া শুষ্ক ও উষ্ণ থাকে। আঙুর পাকার সময় বৃষ্টি হলে আঙুরের গুণাগুণসহ আকৃতি নষ্ট হয়ে যায় এবং আঙুর ফেটে যায়। আঙুরের বড় শত্রু শালিক ও বুলবুলি পাখি। আঙুর না পাকতেই কমপক্ষে ১০% আঙুর পাখি খেয়ে ফেলে এবং বৃষ্টির কারণে পঁচে যায়।

আঙুর গরম রৌদ্রময় আবহাওয়া পছন্দ করে। বিশেষ করে আঙুর পাকার সময় তাপমাত্রা বেশি ও রৌদ্রময় থাকার কারণে আঙুর খুব মিষ্টি হয়েছে। আঙুর সাধারণত আর্দ্র আবহাওয়া পছন্দ করে না এবং ঘন কুয়াশা, তুষারপাত সহ্য করতে পারে না।

গাছে ফুল ফোটার সময় উজ্জ্বল আলো এবং স্বল্প তাপমাত্রা অধিক উৎপাদনের সহায়ক। আঙুর চাষে যেসব সমস্যা পরিলক্ষিত হয়, তারমধ্যে অন্যতম হলো রোগ। যথা- পাউডারি মিলডিউ, ডাউনিমিলডিউ ইত্যাদি। রোগের প্রাদুর্ভাব সাধারণত গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে বেশি দেখা যায়। রোগগুলোর হাত থেকে রক্ষা পেলেই আশানুরূপ উৎপাদন সম্ভব।

আসুন তবে, আঙুর চাষে আমরা এগিয়ে আসি। দেশের বেকারত্ব নিরসনে ভূমিকা রাখুক আঙুর চাষ। এর জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেন।