যুদ্ধদিনের গল্প ও শহীদুল হক মামা

রাহাত মিনহাজ:  শহীদুল হক মামার সঙ্গে আমার শেষ দেখা সচিবালয়ে। ২০১৬-এর শুরুর দিকে। তখন আমি একটি টেলিভিশন চ্যানেলের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হিসেবে সচিবালয় বিট কাভার করি। সাংবাদিকদের আড্ডাস্থল গাছ তলার পাশ দিয়েই তিনি হেঁটে যাচ্ছিলেন। বিশালদেহী মামা দরাজ কণ্ঠে হাঁক দিলেন সাংবাদিক সাহেব ভালো। কাছে গেলাম। জিজ্ঞাসা করলাম কেমন আছেন, ‘আছি আর কি! সবাই তো বিক্রি হচ্ছে। এসব দেখে আর ভালো লাগে না।’ জিজ্ঞাসা করলাম কী হয়েছে? কিসের কষ্ট আপনার? তখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া নিয়ে নানা জল্পনা চলছে। চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। মামা বলে গেলেন, ‘ওই কাদের মোল্লা! ওর ফাঁসি ঠেকাতে আমাকে কিনতে ওর পোলারা লাখ লাখ ডলার নিয়ে পিছে পিছে ঘুরছে। আমারে সুইডেনে ত্যক্তবিরক্ত করছে। আমার দূরের আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে ট্রাই করছে। আমারে কিনতে পারেনি। শেষের দিকে মিডিয়ায় কাদের মোল্লার পক্ষে বক্তব্য দিতে হেন চেষ্টা নেই যে ওরা করেনি। একজন শহীদুল হক, একজন মুক্তিযোদ্ধাকে তারা কিনতে পারেনি। এখন শুনি অনেকেই বিক্রি হচ্ছেন!।’

উল্লেখ্য, শহীদুল হক মামা মিরপুরের কসাইখ্যাত কাদের মোল্লার মানবতা অপরাধ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন। মামাকে বললাম একাত্তরের গল্পটা একটু বলেন তো। মামা বলে গেলেন, ‘একাত্তরে মিরপুর ছিল মৃত্যুপুরী। আক্তার গুণ্ডা (সশস্ত্র বিহারি দলের পাণ্ডা) ছিল সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। কত বাঙালিকে যে ওর নেতৃত্বে কচুকাটা করা হয়েছে, তার হিসাব নেই। এছাড়া ১৯৭১ সালে মিরপুরে এ রকম অনেক গুণ্ডা ছিল। যাদের হাতে শত শত বাঙালিকে প্রাণ দিতে হয়েছে। যুদ্ধের সময় আমরা ওদের শায়েস্তা করেছি।

অপারেশন চালিয়ে পাক আর্মিদের কাছ থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র পাওয়া বিহারিদের পরাজিত করেছি। কাজটা খুব সহজ ছিল না।’ জিজ্ঞাসা করি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো আক্ষেপ আছে কিনা? দরাজ কণ্ঠে মামা বলে যান, ‘একাত্তরে একটা অপারেশন চালাতে গিয়ে আমাদের এক সহযোদ্ধা পাকিস্তান পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। সেই সহযোদ্ধাকে থানায় নিয়ে গিয়ে এক বাঙালি ওসির তত্ত্বাবধায়নে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। শুধু পিটিয়ে পিটিয়ে, নিদারুণ কষ্ট দিয়ে হত্যা। এই ঘটনাটা ঘটেছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছু আগে। দেশ স্বাধীন হলো।

আমরা স্বাধীন দেশ পেলাম। দেশের সরকার ও প্রশাসন নতুন করে সাজানো শুরু হলো। অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলাম ওই ওসি যার অধীনে থানায় পিটিয়ে পিটিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হত্যা করা হলো, সেই ওসি প্রমোশন পেয়ে পুলিশের এসপি হয়েছেন। এই দুঃখ কই রাখি বলেন। আমরা এটা নিয়ে প্রতিবাদ করেছিলাম। কোনো লাভ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এটাই আমার সবচেয়ে বড় দুঃখ। ওই সহযোদ্ধার আত্মত্যাগের কী মূল্য দিলাম আমরা।’

বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল হক মামা ১৯৭১ সালে ২ নং সেক্টরের অধীনে প্রশিক্ষণ নিয়ে বিহারি অধ্যুষিত মিরপুর মুক্ত করেছিলেন। তার নেতৃত্বে গঠিত মামা বাহিনী ছিল বিহারিদের ত্রাস। দেশ স্বাধীনের পর আশির দশকে সপরিবারে সুইডেন চলে যান তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হলে দেশে আসেন। কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে দায়ের করা রাষ্ট্রপক্ষের মামলায় ট্রাইব্যুনালে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দেন।

বিচার প্রক্রিয়া চলাকালে আসামি পক্ষ তাকে বারবার হেনস্থা করার চেষ্টা করলেও অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে একাত্তরের ঘটনাপ্রবাহ জাতির সামনে তুলে ধরেন। ওই সময় দেশে অবস্থান করে গণজাগরণ মঞ্চের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশ নেয়ার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নতুন প্রজন্মকে শুনিয়েছেন যুদ্ধদিনের গল্প। আজ মামা নেই। ৬৪ বছর বয়সে বিদায় নেন পৃথিবী থেকে। কিন্তু যত দিন বাংলাদেশ আছে, ততদিন এই মামাদের মৃত্যু নেই। মামা আর একাত্তরের শহীদেরা মিশে থাকবেন লাল-সবুজের পতাকায়। আজীবন, অমলিন।

লেখক: শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়