চট্টগ্রাম যানজট নিরসনে টার্মিনাল গড়ার সিদ্ধান্ত

রনজিত কুমার শীল, চট্টগ্রাম:  চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. জিল্লুর রহমান চৌধুরী বলেছেন, চট্টগ্রামে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নসহ যানজট নিরসনে সরকারীভাবে ট্রাক ও বাস টার্মিনাল গড়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রথমে জায়গা নির্ধারণ করবো এবং কিভাবে টার্মিনাল করা যায় তা সিটি কর্পোরেশনে ও সিডিএসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হবে। পাশাপাশি রাস্তার উপর ও ফুটপাতে যত্রতত্রভাবে গড়ে উঠা অবৈধ বাজার ও স্থাপনাগুলো উঠেছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। আজ রোববার সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

হিজড়াদের পুনর্বাসন বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। চট্টগ্রামে ও প্রায় ৪’শ হিজড়া রয়েছে। তাদের জন্য কিছু জায়গা পাওয়া গিয়েছে। আয় বর্ধক প্রকল্পসহ তাদেরকে পুনর্বাসন করতে চাই। হিজড়ারা পুনর্বাসিত হলে তারা আর সাধারণ জনগণের কাছে গিয়ে বিরূপ আচরণ করবে না। তাদের অত্যাচারও উৎপাত হ্রাস পাবে।

২০১৮ সালে মধ্যে দেশকে ভিক্ষুকমুক্ত করার প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার আলোকে ডিসি বলেন, চট্টগ্রামকে ভিক্ষুক মুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতোপূর্বে ২০ জনকে ভিক্ষুক মুক্ত করা হয়েছে। চলতি মাসের মধ্যে আরো ২০০ জনকে ভিক্ষুক মুক্ত করবো। ৫০ জন ভিক্ষুককে পুনর্বাসন করার জন্য ডোনার (অনুদান দাতা) পাওয়া গেছে। জেলাকে ভিক্ষুক মুক্ত করতে বেশ কিছু টাকার প্রয়োজন। ৩০ থেকে ৪০ লক্ষ টাকা সংগ্রহের পথে। হয়তো আরো ১০ লক্ষ টাকা বেশি সংগ্রহ হবে। প্রধানমন্ত্রীও হয়তো কিছু অনুদান দিতে পারেন। সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বিত উদ্যোগে ভিক্ষুকদের ছবি ও ঠিকানাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে চট্টগ্রামকে ভিক্ষুক মুক্ত করবো ইনশাল্লাহ।

পাহাড় ধসে যান-মালের ক্ষতির কথা উল্লেখ করে জিল্লুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত বন্যা ও পাহাড় ধ্বসে চট্টগ্রামে ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। পার্বত্য এলাকাগুলোতে ও প্রায় দেড়’শ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। চট্টগ্রাম নগরী এবং জেলায় পাহাড়ের নিচে ও পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধভাবে বসবাসকারীদের অনেককে ইতোমধ্যে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। যারা এখনো সেখানে অবস্থান করছেন তাদেরকে উচ্ছেদ করা হবে। যে কেউ হোক না কেন কাউকেই পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করতে দেয়া হবে না।

ডিসি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ১০টি অগ্রাধিকার প্রাপ্ত বিশেষ উদ্যোগ যথাক্রমে- সরকারের একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, আশ্রয়ন প্রকল্প, ডিজিটাল বাংলাদেশ, শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি, নারীর ক্ষমতায়ন, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, কমিউনিটি ক্লিনিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, বিনিয়োগ বিকাশ এবং পরিবেশ সুরক্ষা বাস্তবায়ন করতে সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে।

জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) নুরেআলম মিনা বলেন, চট্টগ্রাম জেলায় পুলিশের লোকবল সংকট থাকা সত্তে¡ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটামুটি ভালো রয়েছে। বার্মা থেকে টেকনাফ হয়ে সড়ক পথে ইয়াবা পাচার ও অনেকটা কমে এসেছে। বার্মা-টেকনাফ সীমান্তে বর্ডার গার্ড ও আর্মিসহ সেখানে দায়িত্বরত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আন্তরিকভাবে উদ্যোগ না নেয়ায় কারণে সড়ক ও সমুদ্রপথে ইয়াবা পাচার বন্ধ হচ্ছে না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিসহ সকলের সহযোগিতা পেলে ইয়াবা ও নানান ধরনের মাদক রোধ করা সম্ভব হবে।

ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও যানজট বিষয়ে তিনি বলেন, ২০০৬ সালে হাইওয়ে পুলিশ গঠিত হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম- কক্সবাজার মহাসড়ক, চট্টগ্রাম-হাটহাজারী-খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম-হাটহাজারী-রাঙ্গামাটি সড়কে যানজটসহ অন্যান্য বিষয়গুলো দেখার দায়িত্ব হাইওয়ে পুলিশের। অন্যান্য সড়কগুলোর দায়িত্ব জেলা পুলিশের। অথচ রাস্তায় ডিউটি করাকালীন সময়ে অনেকস্থানে ট্রাফিক পুলিশের পায়খানা-প্রস্রাব করারও কোন জায়গা থাকে না।

এরপরেও জেলা ও ট্রাফিক পুলিশ হাইওয়েসহ সর্বত্র যথাযথ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। রাস্তার উপর অবৈধ বাজার, ফুটপাতের স্থাপনাগুলো সরানো গেলে যানজট কমে আসবে। এ লক্ষ্যে সকলের আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, চিকনগুনিয়া ও ডেঙ্গু বিষয়ে সকলকে সচেতন থাকতে হবে। বাসা-বাড়ি, অফিস-আদালত ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের চারপাশ সবসময় পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

জেলা ট্রাক- কভার্ডভ্যান মালিক গ্রæপের সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান বলেন, আসন্ন ঈদ-উল আযহা পূর্বে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার উপর যত্রতত্র কোরবানির পশুর হাট বসে। এতে করে একদিকে যানজট ও অন্যদিকে জনভোগান্তি বাড়ে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া আহŸান জানান তিনি।

জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. জিল্লুর রহমান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় মাল্টিমিডয়ার মাধ্যমে গত জুন মাসের খাতওয়ারী অপরাধ চিত্র, সভার সিদ্ধান্ত ও অগ্রগতি তুলে ধরেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. মমিনুর রশিদ।

সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জেলা পুলিশ সুপার নুরেআলম মিনা, সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সীতাকুÐ সার্কেল) মো. রেজাউর রহমান, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. সাহাবউদ্দিন, মহানগর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. মোজাফফর আহম্মদ, জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এডভোকেট একেএম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল জব্বার চৌধুরী (চন্দনাইশ), মোজাফফর আহমদ (পটিয়া), মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম (বাঁশখালী), মুহাম্মদ আলী শাহ (রাঙ্গুনিয়া), তৌহিদুল হক চৌধুরী (আনোয়ারা), মাহবুবুল আলম চৌধুরী (হাটহাজারী)।

এম তৌহিদুল আলম (ফটিকছড়ি), চেম্বারের পরিচালক অহীদ সিরাজ চৌধুরী স্বপন, জেলা ট্রাক- কভার্ডভ্যান মালিক গ্রæপের সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার দীপক কুমার রায় (ফটিকছড়ি), নাজমুল ইসলাম ভ‚ঁইয়া (সীতাকুÐ), গৌতম বাড়ৈ, লুৎফর রহমান (চন্দনাইশ), মোহাম্মদ উল্ল্যাহ (সাতকানিয়া), মোহাম্মদ কামাল হোসেন (রাঙ্গুনিয়া), আফিয়া আক্তার (বোয়ালখালী), আক্তার উননেছা শিউলি (হাটহাজারী), হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নিতাই প্রসাদ ঘোষ, বিকেএমইএ প্রতিনিধি শওকত ওসমান, পৌর মেয়র মো. নিজাম উদ্দিন (বারৈয়াহাট), হাজী আবুল কালাম আবু (বোয়ালখালী) ও মো. গিয়াস উদ্দিন (মিরসরাই) প্রমুখ। সভায় বিভিন্ন উপজেলার চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, পুলিশ কর্মকর্তা ও সরকারের বিভিন্ন স্তরের কর্মরত কর্মকর্তাসহ আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।