সাহসের সঙ্গে প্রগতিশীল চিন্তাও জরুরি

আবুল কাসেম ফজলুল হক: কখনো কখনো মনে হয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাব বাংলাদেশে এখন খুব অনুভূত হচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে, মনে হয় এই অভাববোধ ততই বাড়ছে। তবে এ নিয়ে ভাসা ভাসা কথাবার্তা ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো আলোচনা নেই। কোনো অসন্তোষ নেই। ক্ষোভ নেই। এটাও ঠিক যে, আজকের বাংলাদেশে ক্ষমতাসীনদের ছাড়া বাকি সবাই সম্পূর্ণ মনোবলহারা। প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতাসীন দল ছাড়া দেশে আর কোনো রাজনৈতিক দলও নেই। গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় নিয়েই বা এ দেশে আজকাল আলোচনা হয়? যারা ভাবুক ও কর্মী বলে পরিচিত, তাদের কি কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা আছে? কী রকম ভাবুক তারা? কী রকম কর্মী? বিশিষ্ট নাগরিক বলে তারা আত্মপরিচয় দেন।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নানা উদ্দেশ্যে নানাজন চায়। সব চাওয়াই যে সমর্থনযোগ্য, তা নয়। যারা সৃষ্টিশীল, প্রগতিশীল, সর্বজনীন কল্যাণে নিবেদিত, যারা প্রকৃতিকে অবলম্বন করে উন্নত নতুন কিছু অনুসন্ধান করেন কিংবা গড়ে তুলতে চান, যারা উদ্ভাবক, আবিষ্কারক, স্রষ্টা, আমি তাদেরই চিন্তা, মতপ্রকাশ ও কাজ করার স্বাধীনতা বা সুযোগের কথা বলছি। এ ক্ষেত্রেও ভন্ড ও প্রতারক আছে। তাদের নিয়ে সমস্যা আছে।

প্রসঙ্গত বার্ট্রান্ড রাসেলের একটি উক্তি মনে পড়ছে। বাংলা করলে কথাটা দাঁড়ায় : ‘যারা নতুনের উদ্ভাবক ও প্রবর্তক, তাদের অস্তিত্ব রক্ষা ও কাজ করে যাওয়াতেই যত বিপদ। প্রত্যেক জেনারেশনই বিশ্বাস করে, এই অসুবিধা অতীতের ব্যাপার; কিন্তু প্রত্যেক জেনারেশনই কেবল অতীতের নবপ্রবর্তকদের প্রতিই সহনশীল। যারা সমকালীন, তারা একইভাবে নির্যাতিত। সমকালীনদের বেলায় সহনশীলতার নীতি অনুসৃত হয়েছে, এমন কথা প্রায় কখনো শোনা যায় না।

ক্ষমতাসীনদের যখন অত্যাচারী হয়ে উঠতে দেখি, তখন আঠারো শতকের ফরাসি দার্শনিক রুশের উক্তি স্মরণ হয় :

যে দাসত্বের কথা রুশো এখানে বলেছেন, তা উপলব্ধি করার সামর্থ্য ক্ষমতাসীন ধারার লোকদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। উন্নত চিন্তা থাকলে, উন্নত চিন্তার চর্চা থাকলে, উন্নত মত থাকলে তো মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন। বাংলাদেশে আজ প্রকৃত জাতীয় উন্নতির আকাক্সক্ষা কোথায়? অবশ্য ক্ষমতা ও সম্পত্তি অর্জনের জন্য ব্যক্তিপর্যায়ে উচ্চাকাক্সক্ষা ও তৎপরতার অন্ত নেই। আত্মহত্যা, হত্যা, গুপ্তহত্যা, সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ইত্যাদিকে অপরাধতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব ও মনস্তত্ত্ব, রাজনৈতিক বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক অবস্থাও ইতিহাসের দিক দিয়ে বিচার করতে হবে।

পুলিশ ও আইন-আদালত কাজ করবে; কিন্তু কেবল তাদের দিয়েই সমস্যার সমাধান আশা করা সম্পূর্ণ ভুল। চিন্তা ও কর্মের যেসব ধারা চলছে, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা টক শোতে ও উপসম্পাদকীয়তে যেসব কথা ক্রমাগত বলছেন এবং লিখছেন তাতে কাজ হচ্ছে না। পক্ষপাতমূলক সত্যবিমুখ বাগাড়ম্বরে সমস্যা বাড়ে। পক্ষ অবলম্বন করতে হবে সত্যের, ন্যায়, সর্বজনীন কল্যাণ ও সুন্দরের। গান্ধির মতবাদ বিবেচনা দাবি করে : সত্যাগ্রহ, অহিংসা, সর্বোদয়, অন্যায়কারীদের সঙ্গে অসহযোগ। অবশ্য গান্ধি এ কথাও বলেছেন : ‘আমার অহিংসায় হিংসারও স্থান আছে। তবে তা কেবল প্রয়োজনের ক্ষেত্রে। কাপুরুষতার চেয়ে হিংসা শতগুণে ভালো।’

প্রথমেই বাংলাদেশে চিন্তার স্বাধীনতার যে অভাববোধের কথা বলেছি, একটু বুঝতে চাইলেই বোঝা যাবে তা খুব মামুলি, দুর্বল, কার্যকারিতাহীন। ফেসবুকে, অনলাইনে কি প্রচারিত হচ্ছে অসাধারণ মূল্যবান কোনো চিন্তা? যুক্তরাষ্ট্র কথিত আরব বসন্তের পেছনে ব্লগার্স অ্যান্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল? প্রশ্ন হলো, কথিত আরব বসন্তের পরিণতি কী হয়েছে। তা থেকে বিশ্ববাসীর শিক্ষণীয় কী আছে? বাংলাদেশের ব্লগার্স অ্যান্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টস ফোরামের গণজাগরণ মঞ্চের ভূমিকাও জনস্বার্থের দিক দিয়ে গুরুতর বিবেচনা দাবি করে।

দেশটাকে, দুনিয়াটাকে বদলাতে হবে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থাকে সুস্থ, স্বাভাবিক ও প্রগতিশীল করে তুলতে হবে। তার জন্য চিন্তা দরকার, চিন্তার স্বাধীনতা দরকারÑ মত দরকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দরকার। সে রকম চিন্তার তো সন্ধান পাই না।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জটিল সব সমস্যা, যেগুলোর কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এক নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটিয়ে নতুন আর এক নিয়ন্ত্রণে যেতেই হয়। এর কোনো বিকল্প নেই। দেখতে হয় কোন নিয়ন্ত্রণ কম অসুবিধাজনক। সরকার অপরিহার্য। সরকারি নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত স্বাধীনতা সম্ভব নয়। আইন-কানুনের আইনের শাসনের দরকার আছে। যারা যে কোনো মতপ্রকাশের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা আশা করেন কিংবা নিয়ন্ত্রণহীন চিরস্থায়ী স্বাধীনতা কামনা করেন, তারা তা পান না এবং হতাশ হন।

হতাশা তাদের নৈরাজ্য ও আক্রমণাত্মক কার্যকলাপে চালিত করে। ব্যক্তির স্বেচ্ছাচার সমাজের ক্ষতির কারণ হয়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য সম্ভব হয় তখনই, যখন অন্য সবার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতাও স্বীকার করা হয়। অন্যের ক্ষতি করলে, অন্যকে অপমান করলে, অন্যের বিশ্বাসে আঘাত করলে বিপত্তি ঘটে। কার্যক্ষেত্রে আত্মসংযম, পরিমিতিবোধ ও আইন অপরিহার্য। আইনের শাসন ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য দুটোকেই রক্ষা করতে হয়। কোনোটাই নিরঙ্কুশ হতে পারে না।

স্বাধীনতা স্বাতন্ত্র্যের অপব্যবহার করা হলে তার ফল সবার জন্যই ক্ষতিকর হয়। যারা ক্ষমতাধর তারা তাদের ক্ষমতারও শক্তির অপব্যবহার করলে তাতে সবচেয়ে বেশি লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাতে সৃষ্ট গণঅসন্তোষের ফলে সরকারের পতনের শর্ত তৈরি হয়। তা সত্ত্বেও ক্ষমতাসীনরা অনেক সময়েই ব্যক্তিস্বার্থে ও দলীয় স্বার্থে স্বেচ্ছাচারী আচরণ করে থাকে। তবে অত্যাচারী শাসক মাত্রেরই করুণ পরিণতি হয়।

চিন্তার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সমস্যা দেশ-কালের ভিন্নতা অনুযায়ী বিভিন্ন রকম হয়। বাংলাদেশে আজকের সমস্যা অত্যন্ত জটিল। সমাজের প্রতিটি স্তরেই আইনের শাসন ও জননিরাপত্তা অপ্রতুল। গণতন্ত্রের নামে যা কিছু দেখা যায়, তাতে গণতন্ত্রের কোনো পরিচয় পাওয়া যায় না। এটাকে বলা যায় জবরদস্তিতন্ত্র। আজ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারের আমল সম্পর্কেই এ কথা সত্য। রাজনৈতিক দল ও নেতাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক চরিত্র দুর্লভ। গণতন্ত্রের নামে যা কিছু করা হয়, বিভিন্ন দল করে, তার অধিকাংশই নিন্দনীয়।

আধুনিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র না থাকলে ব্যক্তি স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা জাতিসংঘ ঘোষিত মৌলিক সমধিকার কিছুই থাকে না। তাতে কায়েম থাকে কেবল জুলুম-জবরদস্তির সংস্কৃতি। প্রবলদের স্বেচ্ছাচার-স্বৈরাচার দুর্বলদের যারা সংখ্যায় অন্তত নব্বই শতাংশ জীবনকে বিপন্ন করে রাখে। বাংলাদেশে দলীয়করণ ও দলবাজি মৌলিক মানবাধিকারের ওপর প্রবলভাবে কুঠারাঘাত করে।

সিএসও ও এনজিওগুলোও বাংলাদেশে অত্যন্ত ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী। উন্নয়নের নামে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ে বৃহৎ শক্তিবর্গ কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া কিছু ধারণা তারা ক্রমাগত প্রচার করছে। বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থায় এসব ধারণা অল্পই খাপ খায়। নির্দিষ্ট সময়ে বাইরের প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য এনজিও, সিএসও ও সরকারি সংস্থা নানারকম গোঁজামিল ও অসৎ উপায় অবলম্বন করে। এনজিও ও সিএসওগুলোর ভূমিকা বাংলাদেশে স্বাভাবিক জাতীয় বিকাশ ও রাষ্ট্র গঠনের পরিপন্থি।

তারা সরকারের ওপর অনুচিত চাপ সৃষ্টি করে সরকারকে স্বাভাবিক হতে দেয় না। রাজনীতিকে তারা উন্নয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখে এবং সেই মর্মে প্রচার চালায়। তারা সরকারকে চাপে ফেলে দুর্বল রাখতে চায়, সর্বোপরি তারা নিজেদের সংগঠনে চিন্তার স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের সুযোগ কঠোরভাবে বন্ধ রাখে। জাতির গোটা চিন্তা-ভাবনাকে তারা প্রচারকার্যের দ্বারা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল ইত্যাদির নিঃশর্ত সমর্থনে সক্রিয় রাখে। চিন্তার স্বাধীনতা তারা অনুমোদন করে না।

প্রগতিশীল উন্নত কোনো মত কার্যকরভাবে প্রকাশ করার মতো কোনো পত্রিকা কিংবা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই। বাংলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানও দলীয়করণের শিকার। পরিবেশের প্রতিকূলতা এত বেশি যে, কোথাও নতুন চিন্তা ও প্রগতিপ্রয়াণ খুঁজে পাওয়া যায় না। কেবল চিন্তার স্বাধীনতারই অভাব নয়, সাহসেরও নিদারুণ অভাব। সাহস হলো সেই মানবিক গুণ যা অন্যসব মানবিক গুণকে রক্ষা করে। সমাজে সাহসের অভাব দেখা দিলে অচিরেই সব রকম মানবিক গুণাবলিরও অভাব প্রকটিত হয়।

শিক্ষাব্যবস্থা শিশুমনের স্বাধীন বিকাশকে অনুমোদন করে না। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠসূচি, পাঠক্রম, পাঠ্যপুস্তক, পরীক্ষা পদ্ধতি অত্যন্ত খারাপ। অনেক কিছুই বাইর থেকে চাপিয়ে দেওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভ্যন্তরে শিক্ষকদের ‘গবেষণা’ আছে। কিন্তু সেসব গবেষণায় গবেষকের স্বাধীনতা নেই। প্রকৃতপক্ষে সেগুলো কোনো গবেষণা নয়। তরুণ শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করেই বাংলাদেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশে চলে যাচ্ছে এবং সেগুলোতে নাগরিকত্ব নিচ্ছে।

বাংলাদেশে গভীর চিন্তা সুস্থ-স্বাভাবিক চিন্তা একেবারে নেই, তা নয়। টক শো আর উপসম্পাদকীয়নির্ভর না থেকে বইয়ের জগতে দৃষ্টি দেওয়া দরকার, ঐতিহ্যের সঙ্গে গত ছয়তাল্লিশ বছরের মধ্যে প্রকাশিত প্রকৃত ভালো বইগুলো খুঁজে বের করা দরকার। সেগুলো নিয়ে ‘বইপড়া’ আন্দোলন চালানো দরকার, ভালো অর্থে সমালোচনার বিকাশ ঘটানো দরকার, সমাজে ভালো চিন্তার চাহিদা থাকলেই ভালো চিন্তা বিকশিত হতে পারে।

চিন্তার স্বাধীনতার জন্য অপেক্ষা করে থাকলে, কেবল চিন্তার স্বার্থহীনতার দাবি তুললে কোনো সুফল হবে না। সাহসের সঙ্গে প্রগতিশীল নতুন চিন্তা চালিয়ে যেতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষতা, মৌলবাদ, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, জঙ্গিবাদ ইত্যাদি নিয়ে উত্তেজনাকর আলোচনা এত হয়েছে যে, সে ধারায় আলোচনা আর না করা ভালো। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ নিয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনা খুব দরকার। তা ছাড়া জীবন-জগৎ, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা বিষয়ের অভাব নেই। উন্নত জীবনের জন্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের কত বিষয় আছে!

আবুল কাসেম ফজলুল হক : বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, প্রাক্তন অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়