রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ইউনেস্কোর আপত্তি প্রত্যাহার

নিউজ ডেস্ক: বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান সুন্দরবনের পাশে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ব্যাপারে আপত্তি প্রত্যাহার করে নিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো। একইসাথে সুন্দরবনকে ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করার প্রস্তাবও বাতিল করা হয়েছে। গত বুধবার পোল্যান্ডের ক্রাকাউ ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪১তম সভায় দীর্ঘ আলোচনার পর এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

তবে দূষণ হ্রাসে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কৌশলগত পরিবেশ নিরুপণের (এসইএ) মাধ্যমে বর্তমান স্থানে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছে কমিটি। এর আগে গত মে মাসে ইউনেস্কো সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা বাতিল করে একে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করে।

বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি আন্ত:মন্ত্রণালয় প্রতিনিধি দল ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির ৪১তম সভায় যোগ দেয়। বুধবার সুন্দরবনের পাশে নির্মানাধীন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর কমিটি বর্তমান স্থানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে অনুমোদন দেয়। একইসাথে সুন্দরবন সুরক্ষায় ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশের গৃহীত পদক্ষেপকে স্বাগত জানায়। কমিটির অনুরোধে সরকার সুন্দরবনসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৌশলগত পরিবেশ নিরুপন করতে রাজি হয়েছে।

সুন্দরবনের ইউনেস্কো হেরিটেজ থেকে ৬৯ কিলোমিটার এবং সুন্দরবনের উত্তর-পশ্চিম প্রান্ত সীমা থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মিত হচ্ছে। ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে ভারতীয় কোম্পানি ভারত হেভি ইলেক্ট্রিক্যালকে (ভেল) গত এপ্রিলে কাজ শুরুর অনুমতি দিয়েছে কেন্দ্রটির মালিক-তদারককারী সংস্থা বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎ কোম্পানি। দুই ইউনিটের কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজ ৪১ মাস এবং দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণকাজ ৪৭ মাসের মধ্যে সম্পন্ন করতে সময়সীমা বেধে দেয়া হয়েছে ভেলকে।

ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ঐতিহ্য সুরক্ষায় সর্বোচ্চ ভারসাম্য নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। প্রকৃতির পুরস্কার হিসেবে সুন্দরবন রক্ষায় বাংলাদেশ পূর্ণ সহযোগিতা করবে।

এদিকে তথ্য আদানপ্রদানে শূণ্যতা ও তথ্যগত বিভ্রান্তির কারণে ইউনেস্কো আগে সুন্দরবনকে ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করেছিল বলে মনে করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। গতকাল তিনি বলেন, পশুর নদীর ড্রেজিংসহ কয়েকটি বিষয়ে ইউনেস্কোর উদ্বেগ ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের গৃহীত পদক্ষেপে তারা আশ্বস্ত হয়েছে। একইসাথে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং পরিচালনার সময় পরিবেশগত প্রতিশ্রুতি মেনে চলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেও কোনো ত্রুটি থাকবে না বলে জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে দেশী-বিদেশী বিরোধীতা যে অযৌক্তিক তাও প্রমাণিত হলো।

সুন্দরবনের পাশে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরোধীতাকারী বিভিন্ন সংগঠনের প্লাটফর্ম সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ডা. আব্দুল মতিন বলেন, ইউনেস্কো সরকারকে কৌশলগত পরিবেশ নিরুপনশেষে (স্ট্রাটেজিক এনভারয়নমেন্টাল অ্যাসেসমেন্ট- এসইএ) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে বলেছে। একইসাথে সম্পূর্ণ পরিবেশগত প্রভাব নিরুপন (ইআইএ) করতে বলা হয়েছে। ‘এসইএ’ করা হলে প্রমাণিত হবে যে সুন্দরবনের এত কাছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা যাবে না। ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে আমরা বৈজ্ঞানিক তথ্য ও ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছি।

জানা যায়, রামপাল প্রকল্পে আপত্তি জানিয়ে ইউনেস্কো ২০১৩, ২০১৪ এবং ২০১৬ তিন দফায় সরকারকে প্রকল্পটি অন্য জায়গায় সরিয়ে নেয়ার সুপারিশ করেছিল। গত বছরের মার্চে সংস্থাটির একটি পর্যবেক্ষক দল সুন্দরবন সফর করেছিল। তখনও তারা প্রকল্পটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল।