জন্মবার্ষিকী: একজন বিদগ্ধ মানুষের সান্নিধ্য

অধ্যাপক অজয় রায়:  যে ক’জন মানুষকে আমি অন্তর থেকে গভীর শ্রদ্ধা করি, যার সুকুমার বৃত্তি, পাণ্ডিত্য, মন ও হৃদয়ের ঔদার্য-মননশীলতায় আমি মুগ্ধ, আপ্লুুত এবং যিনি আমার চিত্তকে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছেন, সেই মানুষটির নাম অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ। ১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের মদদে এ অঞ্চলের কিছু বুদ্ধিজীবী ঘোষণা দিলেন- রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্র-সাহিত্য পাকিস্তানের তাহজিব-তমদ্দুন এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে শুধু অসঙ্গতিপূর্ণই নয়, বরং পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ নামক এক অদ্ভুত ধারণাভিত্তিক আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার বিরোধী। অতএব রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্র-সাহিত্য-কাব্য সর্বতোভাবে বর্জনীয় ও পরিত্যাজ্য।

তৎকালীন সরকারের ইন্ধন ও প্ররোচনায় ওই বুদ্ধিজীবীর দল রবীন্দ্রবিরোধী আন্দোলন শুরু করে। এরই বিপরীতে প্রগতিশীল লোকায়ত ও রবীন্দ্রানুরাগী ব্যক্তিবর্গ প্রগাঢ় এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। অধ্যাপক মুরশিদের কালজয়ী একটি অমর কীর্তির কথা সবিনয়ে জানিয়ে রাখতে চাই এই প্রজন্মের তরুণদের কাছে। ১৯৪৯-১৯৬৬ সাল পর্যন্ত বছরে চার সংখ্যায় প্রকাশিত অনবদ্য বুদ্ধিবৃত্তিক ইংরেজি পত্রিকা ‘নিউ ভ্যালুজ’। তিনি ছিলেন এ পত্রিকার সম্পাদক। ১৭টি বছর এ পত্রিকাটি আমাদের মুক্তবুদ্ধির আন্দোলন, উদার বাঙালি সংস্কৃতি পরিচর্চা, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে লোকায়ত-সেক্যুলার-উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানি যুগে এক বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিল।

অধ্যাপক মুরশিদ তার পত্রিকার উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিম্নোক্ত উক্তি করেছিলেন, ‘এ কাগজের অন্বিষ্ট ছিল একটি সেক্যুলার ডেমোক্রেটিক রাষ্ট্র, যার ভিত্তি হবে দেশের দুটি প্রধান সম্প্রদায়ের যৌথ জাতীয়তা এবং মিলিত উত্তরাধিকার। যে উত্তরাধিকারের ভাষা, ভাষাগত সংস্কৃতি এবং সাহিত্য একে অন্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। হিন্দু-মুসলমানের এ মিলিত উত্তরাধিকার পাকিস্তানের জাতীয়তা থেকে বাদ পড়বে না। নিউ ভ্যালুজ একটি অনবদ্য পত্রিকা। আদর্শগত দিকটি বাদ দিলেও এর সাহিত্যিক মূল্য ছিল অপরিসীম এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটেও এর আবেদন নিঃশেষ হয়ে যায়নি বলে আমি মনে করি।

আমরা কিছু তরুণ শিক্ষক ১৯৬১ সালের বিশ্ববিদ্যালয় কালা-কানুন বাতিলের দাবিতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকারের উচ্চারণ নিয়ে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মুক্তবুদ্ধি ও সৃজনশীলতার পরিবেশ প্রতিষ্ঠার দৃঢ প্রত্যয় নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক এবং প্রকাশ্য ও উন্মুক্ত আন্দোলনে নেমেছিলাম। এই আন্দোলন আমরা সারা পাকিস্তানে ছড়িয়ে দিতে সমর্থ হয়েছিলাম। সারা পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আমাদের সঙ্গে সংহতি ও একাত্মতা প্রকাশ করে আন্দোলনে শরিক হয়।

আমাদের এ আন্দোলন দ্রুত দেশের স্বাধিকার-স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে, আগরতলা ষড়যন্ত্রবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে; এক কথায় ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রবল স্রোতের সঙ্গে একই মোহনায় মিলিত হয়েছিল। আমাদের এই দ্রোহী স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অসীম সাহসিকতা, দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় ও বিশ্বাস নিয়ে, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রধান, ইতিহাসবিদ অধ্যাপক এ বি এম হাবিবুল্লাহ।

তার আশপাশে ছিলেন যোগ্য ও অসীম সাহসী সহকর্মীবৃন্দ- ড. আহমদ শরীফ, ড. সিরাজুল ইসলাম, ড. মোজাফফর আহমেদ ও খান সারওয়ার মুরশিদ। আমার মনে আছে, আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির একটি সাধারণ তলবি সভা ১৯৬৮ সালের অক্টোবর মাসে আহ্বান করতে তৎকালীন সভাপতিকে বাধ্য করেছিলাম- এজেন্ডা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬১ সালের অর্ডার বাতিলের দাবি।

এ উদ্দেশ্যে আমাদের মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের একটি বিকল্প রূপরেখা উত্থাপন করব প্রাথমিক প্রস্তাবনা হিসেবে। এটি উত্থাপন করবেন ড. লতিফ চৌধুরী। আর এটির খসড়া তৈরির দায়িত্ব বর্তেছিল ড. খান সারওয়ার মুরশিদের ওপর এবং আমাকে আর আহসানুল হককে দায়িত্ব দেওয়া হলো ড. খান সারওয়ার মুরশিদকে যথাযথ সাহায্য করা। পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শাসনবিধি পর্যালোচনা করে এবং নিজের ধারণাকে রূপ দিয়ে ড. মুরশিদ ৩-৪ দিন নিরলস পরিশ্রমে একটি চমৎকার প্রস্তাবনা দাঁড় করালেন।

আমার বলতে দ্বিধা নেই, পরবর্তীকালে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাসনবিধির যত ড্রাফট করেছিলাম, তার মূল ভিত্তিই ছিল অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদের তৈরি ওই অনবদ্য প্রস্তাবনাটি, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের-বিধির মূল নির্যাস ও রূপরেখাটি তিনি পরিচ্ছন্ন ও স্পষ্ট করে উত্থাপন করেছিলেন অনুপম রচনাশৈলীতে। আমার ভাবতে ভালো লাগে, সেদিন ওই জ্ঞানী মানুষটিকে রামচন্দ্রের সেতুবন্ধে কাঠবিড়ালীসম সাহায্য করতে পেরেছিলাম বলে।

ক্রমান্বয়ে আমি দেশের গণআন্দোলনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ি, যার চরম উত্তরণ ঘটেছিল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে, যে অধ্যায়টি আমার জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল। অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদের নিবিড় সাহচর্য ও সানি্নধ্য লাভ করেছিলাম। তার পরিবারের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। মিসেস নুরজাহান মুরশিদের সঙ্গে আমার স্বতন্ত্র পরিচয়-বলয় গড়ে উঠেছিল। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের ও মুক্তিযুদ্ধের একজন দক্ষ সংগঠক ও সুলেখিকা। মুরশিদ স্যারের সাহচর্য, সানি্নধ্য ও স্নেহসিক্ত ভালোবাসায় আমি ধন্য ও কৃতজ্ঞ, যা আমাকে আমৃত্যু অনুপ্রাণিত করবে। ১ জুলাই ছিল খান সারওয়ার মুরশিদের ৯৩তম জন্মবার্ষিকী। তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়