গৌরবময় ৬৪ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ড. মো. আমিরুল ইসলাম:  ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় এ বছর ৬৪ বছরে পদার্পণ করলো। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ও গণতান্ত্রিক চিন্তা এবং আন্দোলনে অগ্রণী ছিল। কলম্বো প্ল্যানের অনুমোদনক্রমে দৃষ্টিনন্দন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নকশা প্রণয়ন করেন অস্ট্রেলিয়ার লে. কর্ণেল জি সোয়ানি টমাস এমএ, তাকে সহযোগিতা করেন স্থপতি জন এ জিমানেক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে বলতে গেলে এর প্রতীকটি মনোযোগ আকর্ষণ করে। এই প্রতীক একই সাথে দেশপ্রেম, ঐতিহ্য, উন্মুক্ত জ্ঞান এবং বৈশ্বিকতার প্রকাশও।

এর মোটিফ এবং রং-এর তাত্পর্য বিশে­্লষণ করলে পরস্ফুিটিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য এবং প্রাসঙ্গিকতা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীকে রয়েছে একটি বৃত্ত, একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ এবং গ্রন্থের মাঝখানে একটি আকাশদৃষ্টি শাপলা ফুল। গ্রন্থটি রক্তলাল ও সোনালি রং বিশিষ্ট দুটি বহিঃরেখা দ্বারা আবৃত। বৃত্ত বিশ্বের প্রতীক, গ্রন্থ জ্ঞানের প্রতীক, শাপলা ফুল সৌন্দর্য, পবিত্রতা ও জাতীয় প্রতীক। শাপলা ফুল সূর্য অর্থেও প্রাণ ও শক্তির উত্স। বৃত্ত ও মূল গ্রন্থের রং কোবাল্ট ব্লু। তা আকাশ, নদী ও উদারতার রং। বাইরের রক্তলাল রং আমাদের জাতীয় পতাকার লাল বৃত্তের প্রতীকের সাথে একাকার হয়ে আমাদের মুক্তি সংগ্রাম ও স্বাধীনতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, মধ্যরেখার সোনালি রং সোনার মতোই মূল্যবান শিক্ষার গুণগত মূল্যের কথা বলে দেয়। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরবর্তী সময়ে রূপায়িত আমাদের স্বাধীনতা এবং জাতীয় ঐতিহ্যের সাথে মিশে থাকা এই প্রতীকের মূল নকশা আঁকেন শিল্পী গোলাম সারওয়ার। কিছুটা পরিবর্তনের মাধ্যমে এটিকে চূড়ান্ত রূপ দেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন এবং শিল্পী হাশেম খান।

১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা অনেক আগে থেকে শুরু হয়। ১৯১৭ সালের স্যাডলার কমিশনের রিপোর্টে রাজশাহীতে শিক্ষা কার্যক্রমের ব্যাপক প্রসার এবং উপযোগিতার প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হলেও উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা এবং উদ্যোগের অভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি সরকারের কাছে গৃহীত না হওয়ায় এ অঞ্চলের নেতৃবৃন্দ হতাশ হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিন পর ১৯৫০ সালের ১৮ অক্টোবর রাজশাহী মেডিক্যাল স্কুলের ছাত্র ভর্তির সিলেকশন কমিটির সভায় রাজশাহী কলেজের তত্কালীন অধ্যক্ষ ড. ইতরাত হোসেন জুবেরী রাজশাহীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা প্রথম উচ্চারণ করেন। ওই বছরের ১৫ নভেম্বর রাজশাহী কলেজের কমনরুমে বর্ধিত এক সভায় সর্বসম্মতিক্রমে রাজশাহীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব পাস হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ৬৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠিত হয়। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য, আইনজীবী এবং রাজশাহী পৌরসভার চেয়ারম্যান মাদার বখশের উপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দেন-দরবার করার দায়ভার অর্পণ করা হয়।

১৯৫১ সালে মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন রাজশাহী আগমন করলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়। তিনি নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্রুতি দেন এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিক্ষাবিদ ড. জুবেরীকে বিশেষ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োজিত করেন। ১৯৫১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সভাপতি আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে রাজশাহী ঈদগাহ মাঠের এক জনসভায় মাদার বখশ ঘোষণা করেন যে রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা না হলে তিনি আইন সভা থেকে পদত্যাগ করবেন এবং উত্তরবঙ্গকে স্বতন্ত্র প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা দিবেন। তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী ঘোষণা করে গ্রেফতার করার সাতদিন পরে মুক্তি দেওয়া হয়। ড. জুবেরী কর্তৃক প্রস্তুতকৃত বিল ১৯৫২ সালের ১ নভেম্বর সংসদে উত্থাপিত হয়। ১৯৫৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী শহরের ভুবনমোহন পার্কের এক জনসভায় রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোরালো দাবি করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে মাদার বখশ, একরামুল হক, আবু হোসেন প্রমুখ ১৯৫৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের বাসভবন বর্ধমান হাউসে (বর্তমানে বাংলা একাডেমী) সাক্ষাত্ করেন। ৩১ মার্চ ১৯৫৩ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাস হয়, ১৬ জুন প্রাদেশিক গভর্নরের সম্মতি লাভ করে। উক্ত বছরের ছয় জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৩-৫৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে ১৬১ জন শিক্ষার্থী নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়।

শুরুতে বাংলা, দর্শন, ইতিহাস, ইংরেজি, অর্থনীতি, গণিত, ভূগোল ও আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৬২ সাল থেকে সম্মান কোর্স চালু করা হয়। অস্থায়ীভাবে শহরের বিভিন্ন বাড়িতে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যালয়সমূহ স্থাপিত হয়। পদ্মা তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক বড়োকুঠির উপরতলায় উপাচার্যের বাসভবন এবং নিচতলায় উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারের কার্যালয় স্থাপন করা হয়। রাজশাহী কলেজ ভবনে (কলেজের ক্লাস শুরুর আগেই) সকাল সাতটা থেকে সাড়ে নয়টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস চলতে থাকে। কলেজিয়েট স্কুলের ফুলার হোস্টেলকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে রূপান্তরিত করা হয়। শহরের বিভিন্ন বাড়িতে গড়ে উঠে ছাত্রাবাস। বড়োকুঠি পাড়ার লালকুঠি ভবনে স্থাপিত হয় ছাত্রীনিবাস। শহরের বিবি হিন্দু একাডেমিতে প্রতিষ্ঠা করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার, শিক্ষক লাউঞ্জ এবং চিকিত্সা কেন্দ্র। বড়োকুঠি পাড়ার মাতৃধাম ভবনে কলেজ পরিদর্শকের কার্যালয় এবং বাসস্থান, ঘোড়ামারা ডাকঘরের কাছে কুঞ্জমোহন মৈত্রের জমিদার বাড়ির একাংশে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় স্থাপিত হয়। ১৯৫৮ সাল থেকে বর্তমান ক্যাম্পাসে ভবনসমূহ ও রাস্তাঘাট নির্মাণ শুরু হয়। ১৯৬৪ সালে প্রয়োজনীয় বিভাগ ও দপ্তরসমূহ বর্তমান ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়। মতিহারের সবুজ চত্বরে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়তন ৩০৩.৮০ হেক্টর। বর্তমানে ১০টি অনুষদের অধীনে ৫০টি বিভাগ, ৫টি ইনস্টিটিউট, অধিভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ৫৮, একাডেমিক ভবন ১২, হল ১৭ এবং গবেষকদের জন্যে ডরমেটরি রয়েছে ৩টি। বর্তমান শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩৭ হাজার। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালির মনে যে মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা সঞ্চিত হয় এবং তত্কালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খানের পেটোয়া বাহিনীর হাতে ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহার নির্মম মৃত্যুর মধ্য দিয়েই তা যেন গতি লাভ করে এবং স্বাধীনতার পথে অগ্রসর হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দার, অধ্যাপক হবিবুর রহমান এবং অধ্যাপক মীর আবদুল কাইয়ুম, ৯ জন ছাত্র, পাঁচজন সহায়ক কর্মচারী এবং ১০ জন সাধারণ কর্মচারীসহ ২৭ জন শহীদ হন। কালের পরিক্রমায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা লাভের পর তাদের যোগ্যতা ও মেধা দিয়ে কর্মজীবনে দেশে ও বিদেশে আর্থ-সামাজিক, শিল্প-সাহিত্য, শিক্ষা-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে পথিকৃত্ হিসেবে গৌরবান্বিত করে চলেছেন।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী।

e-mail: pkkanak@ru.ac.bd