বিতর্ক অবসানে সংবিধান সংশোধন করুন: সেলিম

নিউজ ডেস্ক:  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা বলছে আওয়ামী লীগ। এর বিপরীতে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি তুলছে বিএনপি। এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। এই বিতর্কের অবসানে তিনি সংবিধান সংশোধন চান।

সমকালের সঙ্গে আলাপকালে সিপিবি সভাপতি বলেছেন, স্বাভাবিক সময়ের সরকার আর নির্বাচনকালীন সময়ের সরকার— এ দুটি যে ভিন্ন ব্যাপার, তা সুনির্দিষ্ট করে সংবিধানে উল্লেখ করা উচিত। এ জন্য সংবিধান সংশোধন করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে সংবিধানে নতুন কোনো কাঠামো সংযুক্ত করতে হবে না। এটা বড় কোনো সংশোধনীও নয়। এটা করা গেলে অবশ্যই বর্তমান বিতর্কের অবসান হবে।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে বেশ খোলামেলা কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনই সবার লক্ষ্য। এটা নিশ্চিত করার বেলায় নির্বাচনকালীন সরকারের গুরুত্ব যতটা না প্রাসঙ্গিক, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্বাচনকে টাকার খেলা, পেশিশক্তির দাপট, প্রশাসনিক কারসাজি ও সাম্প্রদায়িক ধূম্রজাল থেকে মুক্ত রাখা। সেই সঙ্গে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা প্রবর্তনসহ দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কারও করতে হবে।

কিন্তু এসব বিষয়ে মূল ধারার দুটি রাজনৈতিক দল কোনো কিছুই বলছে না বলে উল্লেখ করেন সিপিবি সভাপতি। তিনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নাম উল্লেখ না করে দল দুটির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, তারা নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে তা নিয়েই বিতর্কে লিপ্ত রয়েছে। এর কারণ, তারা নির্বাচনকালীন সরকারের মাধ্যমে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার বর্তমান রীতি ও সংস্কৃতি বহাল রাখার পক্ষপাতী। সে জন্যই এক পক্ষ বলছে, শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন হতে হবে। আরেক পক্ষ বলছে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিংবা এখন কিছুটা সুর নামিয়ে বলছে, সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে হবে।

কোনো সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ার কথা সংবিধানে নেই উল্লেখ করে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, নির্বাচন হওয়ার কথা নির্বাচন কমিশনের অধীনে। সেখানে নির্বাচনকালীন সরকারের কোনোই ভূমিকা থাকার কথা নয়। এই বিতর্কের সহজ সমাধান, নির্বাচন যেন পরিপূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশনের অধীনে হয়, তা নিশ্চিত করা। সেটাই সংবিধান সংশোধন করে স্পষ্ট করতে হবে। তিনি আরও বলেছেন, একটা দেশে নির্বাচনকালীন সরকারের ভূমিকা আর সম্পূর্ণ মেয়াদকালে ওই একই সরকারের ভূমিকা সম্পূর্ণ আলাদা। স্বাভাবিক সময়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে পরিপূর্ণ নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে। কিন্তু নির্বাচনকালে নির্বাহী ক্ষমতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নির্বাচন কমিশনের হাতে স্থানান্তরিত হওয়ার কথা। এটা সংবিধানে আছে। অথচ সেটা হচ্ছে না।

এ ক্ষেত্রেও সহজ সমাধান রয়েছে বলে মনে করছেন সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। তার দৃষ্টিতে, সব পক্ষই বিষয়টি মেনে নিতে রাজি হলে সমস্যার সহজ সমাধান হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে স্বাভাবিক সময়ের সরকার আর নির্বাচনকালীন সময়ের সরকার, এ দুটি যে ভিন্ন ব্যাপার, তা সংবিধানে সংশোধনী এনে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হলে সমস্যার আরও সুন্দর সমাধান হবে। অবসান হবে বিতর্কের।

সিপিবি সভাপতির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে আগামী সংসদ নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হলে আপনারা কি করবেন? নির্বাচনে অংশ নেবেন? নির্বাচন বর্জন করবেন? নাকি আন্দোলনে যাবেন?’ এর সহজ সরল জবাবও দিয়েছেন সেলিম। তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচনকে আমরা সংগ্রামের অংশ মনে করি। তা ছাড়া নির্বাচন আরও ঘনিয়ে আসুক। আর ওই সময়কার পরিস্থিতিই বলে দেবে, আমাদের কী করতে হবে। এখনই সেটা বলার সময় আসেনি।’

‘যদি আন্দোলন করেন, সেই আন্দোলনে আপনারা বিএনপিকে সঙ্গে নেবেন কি-না’— এ প্রশ্নের জবাবে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, তারা বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে যাবেন না। এ ব্যাপারে যুক্তি দেখিয়ে তিনি বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীসহ সাম্প্রদায়িক অপশক্তি রয়েছে। তাছাড়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে বিকল্প শক্তি গড়ছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি। ‘আপনি কি মনে করেন, সরকার আপনাদের দাবিতে সাড়া দেবে’— এ প্রশ্নের উত্তরে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, দাবি আদায়ে জনমত গড়ে তোলা হবে। সরকারকে বাধ্য করতে হবে। সেই সঙ্গে বিএনপিকেও বাধ্য করতে হবে।

সিপিবি সভাপতি আরও বলেছেন, সরকারি দল আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন হবে। কিন্তু এটাও সংবিধানে নেই। সংবিধানে বলা আছে, নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন হবে। আওয়ামী লীগ নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সংবিধান লঙ্ঘন হচ্ছে। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি দলের নেতারা যেভাবে সরাসরি ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছেন, সেটা নির্বাচনী ফলাফলের ওপর পক্ষপাতমূলক প্রভাব সৃষ্টির অপচেষ্টা। এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

সূত্র: সমকাল