শূন্য এ বুকে পাখি

নাজমীন মুর্তজা:

আজ শ্রাবণের বাতাস বুকে এ কোন্ সুরে গায়
আজ বরষা নামল সারা আকাশ পায়।

অনেকদিন পর মানে ব্যান্ডেজ বাঁধা ক্ষত স্থানের রক্ত চন্দন জমে ফুলে উঠেছে। সময়ের শিরিষ গাছের শীর্ষে, রাতজাগা সাপ ফণায় তা শুষে নিলো। কিন্তু আমার মনের অমাবস্যা তবু সারারাত অনিঃশেষ পড়ে থাকলো জীবন ভর।

মানুষের মন হত্যার কোথাও সাক্ষী থাকে না, সাবুত থাকে না, শুধু লিখিত নালিশ হয়ে ঝরে পড়ে শূন্য আদালতে, বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মহামান্য বিচারক, আজ আমি স্মৃতি থেকে একান্ত চতুষ্পদী শোনাব। জীবনের কিছু কিছু বোধ আছে স্রেফ শারীরিক, কিছু প্রেম কামে ও আদরে আর কিছু অস্থিমাংসের অনুভূতির বোধ, প্রজ্ঞার সাথে গা ঘঁষাঘঁষি করে জীবন কাটিয়ে দেওয়ার। ঠিক এমনি একখণ্ড ঘটনা, সময়টা আশির দশকের হবে। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। পাশাপাশি আমি যে অঞ্চলে বেড়ে উঠেছিলাম স্থানীয় এলাকার একটা স্কুল প্রতিষ্ঠাতেও ভূমিকা রেখেছিলাম বলে, দায়ের ভূমিকা রাখতে হলো বিনা বেতনে শিক্ষকতা করে। তবে শিক্ষকতা করছিলাম অনেক আগে থেকে সেটা মনে হয় সত্তরের দশক থেকে হবে। আর এই শিক্ষকতার জন্য নিজ ক্যারিয়ারের বেশ কয়েক বছর পিছনে পড়ে গেছে।

যে সময়ে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছিলাম সে সময়ে যাতায়াত ব্যবস্থা খুব খারাপ ছিল। নৌকা, সাঁকো, পায়ে হেঁটে বাইসাইকেলে করে ৬০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হতো। সে সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী যথেষ্ট থাকলেও কোনও মতে চলে তেমন শিক্ষক হয়তো ছিল, কিন্তু ভালো বা তার চেয়েও ভালো শিক্ষকের বড় অভাব, তাই কষ্ট করে হলেও এতটা পথের ক্লান্তি মাড়িয়ে আমি কাজটা মনের আনন্দে করতাম কিছুটা সুপ্ত বাসনার ফুল ফোটাবার প্রয়াসও হতে পারে, আত্ম প্রশংসা না করেও বলতে পারি, আমি সে সময়ে ভীষণ জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলাম। মনে মনে ভাবতাম, এই আলো ভোর হলে মানুষের দিবাকর হবে। আমি একদিন অনেক বড় শিক্ষক হবো।

সেই বিদ্যালয়ে যেতে দু’পাশে প্রাচীন জনপদ আর মাঝখানে সাঁকো। দুটো নদী একসাথে এখানে এসে মিলেছে, হালদা ও গজারিয়া। হালদার উত্তর পাড়ে বাজার, দক্ষিণ পাড়ে বন বিভাগের অফিস, …বাজারের শেষ পশ্চিম প্রান্তে, গজারিয়ার পূর্ব প্রান্তে আমার স্কুল। আমার শিশুকাল থেকে মেট্রিক পর্যন্ত আমি বাজারেই বসবাস করেছি। সেখানে আমার পৈতৃক সম্পত্তি আছে, দোকানপাট, জমির মাঠ, গাছের বাগান, পুকুর পাড়ে অবশ্য এখন আর থাকা হয়ে ওঠেনি। কিছুটা দূরে আমাদের নতুন আবাসন হয়েছিল। কিন্তু বাজারের সাথে নাড়ির সম্পর্ক কখনও কাটেনি। আজ অবধি নদীতে আলিঝালি মাছের খেলা, সাঁকো, বনের গন্ধ, জনপদ, বাজারের হুম হুম জনতার সোরগোল আমাকে হারিয়ে নিয়ে যায়। আমারে দেওয়ানা করে। যেমন করেছিল আমার স্কুলের এক ছাত্রী।

একদিন এক মেয়ের হোমওয়ার্কের খাতা খুলে দেখি আগের দুই পৃষ্ঠায় সে শুধু আমার নাম লিখে ভরে রেখেছে। আমি বুঝলেও না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে গেলেও সে সময়ে মনের অ্যানটেনা মনেই বাঁকা হয়ে থাকল। যেন ইলেকট্রিক তারে ঝুলে থাকল ভালো লাগার দাঁড়কাক। দিন কেটে যায় দিনের নিয়মে, বার্ষিক পরীক্ষার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমাকে বড় দায়িত্ব নিতে হলো। নেপথ্যে থেকে একটা নাটক নির্দেশনা দিচ্ছিলাম। আমি আমার কাজে বিভোর। রিহার্সেল চলছে পুরোদমে। পরের দিনে আমার বন্ধু বুলবুল বলল, ‘তুমি কি খেয়াল করেছ, একটি মেয়ে সারারাত একনাগাড়ে তোমার দিকে তাকিয়ে ছিল। মেয়েটি কিন্তু ভীষণ সুন্দরী। সে কিন্তু আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয় হয়। বাজারের পাশেই বাড়ি। বন বিভাগের অফিসারের বোন। আমাদের স্কুলে ভর্তি হয়েছে।’

আমার চোখে তখন পুচ্ছ নাচানো ময়ূর ভেসে উঠছে, আমি মনে মনে আনমনা হয়ে যাচ্ছি, জানি না কি ভাবছি। আমার ঘোর কাটিয়ে বুলবুল বলল, ‘বন্ধু ব্যাপার কি?’ আমার মাথায় তখন ঘুরতি লাটিমের মতো তার মুখ ঘুরছে। বুলবুলের ছোঁয়ায় ক্রিং ক্রিং সম্বিত ফোন বেজেছিল। বন্ধু আমার বলছেই তো বলছেই মেয়েটির গুণ। পরে জেনেছিলাম যে ভালো আবৃত্তি করত। ভালো আঁকত, মেধাবী যথেষ্ট। গ্রামের আর দশটা মেয়ে থেকে আলাদা, আড়ষ্টতা ছিল না, সবসময় প্রাণবন্ত। সুন্দরী এককথায় না বলা গেলেও অনেকের তুলনায় আকর্ষণীয়। আমার দিকে তাকিয়ে ছিল এই একটি কথা মনকে খুব দোলা দিয়ে গেল। সে যেন ঢুকে গেল আমার মস্তিষ্কের গহ্বরে। সুড়সুড় করে হেঁটে হৃদয়ের গন্তব্যে চলে এলো। সে রাতে স্বপ্নে সে আসলো।

রাত্তিরে তার নেকাব তুলে দেখি
রঙের ধনু আঁকা চোখের তলে
শুধাই মেয়ে কোথায় ফেলে আঁখি
দৃষ্টি মেলে কোন্ কোন্ সাধনার বলে।

তারপর কেটে গেল দিন কতক। হঠাৎ সে, আহ, আমি তো তার নাম বলিনি, তার নাম ‘দিয়া’। দিয়া আমাকে দাওয়াত দিতে এসে, আমি যাব কি যাব না আমতা আমতা করতেই সে অনুভূতিতে কড়া নাড়িয়ে বলল, ‘বুঝছি স্যার, আমরা গরিব সেজন্যই যাবেন না তো!’ প্রথম কতক ডাক এড়াতে পারলেও শেষ পর্যন্ত আর পারিনি। মনে যেটা কাজ করছিল, দিয়াদের বাসায় গেলে লোকচক্ষুর সামনে দিয়েই যেতে হবে। গোপনে যাওয়া সম্ভব নয়। মন বলল, একবার গেলে কি হয়! মন বলল, যা। গেলাম। বিশেষ বিশাল আয়োজন। দেখে মনে হলো আমি কোনও ছোটখাটো অনুষ্ঠানে এসে পড়িনি তো! কথা বলার পর বুঝলাম সে এখন ছাত্রী নয়, নই আমি স্যার, হবু বরের সাথে চ্যাটিং করছে। তার পুরো নাম ‘সাদিকা মাহবুব দিয়া’। দিয়া নামটা তার নিজের দেয়া। তার মুখে শুনলাম তার নাম। কিছুটা অবাক হলাম। সে বুঝিয়ে বলল, ‘তাদের দেওয়া নাম, তোমার নাম ও আমার দেওয়া নাম নিয়ে আমি অনন্যা।’ কিছুটা বোকার মতো তাকিয়ে থাকলাম। সে বুঝিয়ে দিলো, ‘বাবা-মা নাম রেখেছে সাদিকা, আর তোমার নাম মাহবুব সেটা জুড়ে দিয়েছি আর দিয়া নামটা আমার। আমি নিজেকে দিয়েছি।’ মাথা ঝাঁকিয়ে মনে মনে বললাম, ‘জ্বি রাজকন্যা। জ্বি মাননীয় ম্যাডাম।’ পরে অনেকগুলো কারণে আমার মাহবুব নামটা মুছে ফেলতে হয়েছে।

হঠাৎ করে তার নামের ব্যাখ্যা শুনতে শুনতে যতবেশি আগ্রহী ততবেশি আশঙ্কাগ্রস্ত হয়ে গেলাম। তাকে কিছুতেই স্ত্রী অবধি ভাবতে পারছিলাম না। বয়সের ব্যবধান অনেক। তাছাড়া ছাত্র মানুষ, বিনা বেতনের মাস্টারি, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াই। তাদের মতামত ছাড়া কিছু হবার নয়। যতই লাফাই না কেন। তাছাড়া চট্টগ্রামের কালচারে বাইরের মেয়ে বিয়ে করা দৃষ্টিকটূ। কিন্তু আমি তাকে বারণ করব সেটাও ভাবতে পারছিলাম না। মৌনতা মাঝে মাঝে বিপাকে ফেলে। আত্মার ডাক কিন্তু আত্মা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আমি একটা এমনি পুরুষ, কেটে যাচ্ছে জীবন, তখন আমার নৌকা ফুটো, কিন্তু নদীতেই জল নেই। সরলভাবে কিছু দেবার নেই তাকে আমার। এদিকে গাছেন নতুন পাতা গজিয়ে ওঠার মতো, বেগুনি আর সালোক সংশ্লেষণে প্রেমের রঙে লাল হয়ে যাবার দশা। আমার মাঝেই তার জীবনবিন্দু বাঁধা।

আমার ছোটভাই দিয়ার ক্লাসমেট। তাকে নিয়ে হঠাৎ একদিন আমাদের বাসায় এসে হাজির। ভাগ্যিস সেদিন বাসায় ছিলাম না। বাসায় ফিরে মায়ের মুখে তার প্রশংসা শুনি। মনে মনে পুলকিত হই। মাকে কিছুটা বোকা বোকা লাগল। ভাবলাম, মা এত বোকা, কিছুই বোঝে না। হাসলাম। বিশ্ববিদ্যালয় আর বাড়ি করেই কেটে যাচ্ছিল। একদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরছি, রাস্তা ভীষণ খারাপ তাই হেঁটে আসতে হয়েছিল মাইল পাঁচেক। তখন রাত। দিয়াদের বাসার পাশ দিয়ে রাস্তা। ভাবলাম দেখা হলে ভালো, যাই না একটু দেখে। অনেক দিন চোখের লুকোচুরি দেখি না। তাকে মনে মনে ফিল করতে শুরু করেছি।

তার বাসায় ঢুকেই জানলাম তার মা এসেছে। সে বলল, ‘মা তোমাকে দেখতে চায়।’ আমি শরীর খারাপ বলে কেটে পড়ি। অন্যদিন আসব বলে তাকে মানিয়ে নিলাম। তাদের আঙিনায় একটা কাপড় শুকানো দড়ির খুঁটিতে ঠেস দিয়ে দাঁড়াতেই সে চারদিক দেখে দৌড়ে আমার বুকের ভেতরে মুখ লুকালো। অদ্ভুত তার রেশমী চুলের গন্ধ। যেন টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনের মডেল। সে বিড়বিড় করে:
‘দেখলে সে নিজের ছদ্মবেশ
বলল, আমি গাঁয়ের ফেরিওয়ালী
সন্ধ্যাবেলা প্রেমের অভিসারী
সূর্য যখন বসেন সন্ধ্যাবেলা।’

এই কবিতাটা আবৃত্তি করছিল। ওর মাথাটা আমার বুকে শক্ত করে চেপে ধরলাম। হৃদপিণ্ডটা যে তবলা বাজাচ্ছে আনন্দের। একদিকে রোমাঞ্চ অন্যদিকে তাকে প্রতারণার ভয়। বিয়ে করবার মতো সময়-সুযোগ নেই, কিন্তু তাকে ঠকাবো ততটা শক্তও নই। মনে মনে দূরত্ব রচনা করলাম। যতটা কাছে আসলাম সেই সন্ধ্যায়, হাতের ভেতরে হাত, ঠোঁটের ছোঁয়া, তার অশ্রু বুক পকেটে ভরে ফিরলাম। অতিশয় ভালো লাগায় হাড় জিরজিরে গায়ে বল কোনোটাই ছিল না। একই রকম দিয়ার বা তার চেয়েও বেশি। হয়তো একটা চুমু আবার, জাপটে ধরার উছিলায় জীবনের সাড়ে তিন মিনিট যে অবলীলায় জীবনের নাটক হয়ে গেল। আমাকে কানে কানে বলে যাবার জন্য শুধু আমার জন্য।

আমি সলাজ শামুক, ও মাগুর মাছের ঝোল, দু’টোই খেতে বসে গেছি। নিজেকে সামলে নিয়ে দূরে থাকতে চেষ্টা করলাম। তার সাথে দেখা, কথা কিছু নেই। পড়াশোনায় মন দিলাম। হঠাৎ একদিন জ্বর এলো আর প্রাইভেট পার্টে… ইনজেকশন। …ডাক্তার পরামর্শ দিলেন হোস্টেল ছেড়ে বাসায় ফিরতে। একঘরে টানা তিনদিন আইসোলেট হয়ে থাকতে। কাউকে ঢুকতে দেওয়া বা বাইরে যাওয়া নিষেধ। প্রতিবেলা ৩২টি ট্যাবলেট আর ক্যাপসুল দিনে তিন বেলা। বাসায় এসে ঘর থেকে কোথাও বের হচ্ছি না।

শীতকাল, দিয়ার সাথে দেখা হয়েছে মাসাধিক কাল বা তারও বেশি। ২-৩ মাসও হতে পারে। আবেগ একটু ঝিমুতে শুরু করেছে। কিন্তু বাসায় আসার পর থেকে উসখুস করছে চোখ মন তাকে দেখবার জন্য। এমন বিশ্রী অসুখ, তা সম্ভব নয়। আমি বাসায় এসে ঘরবন্দি, স্কুলে যাচ্ছি না সেটা সে জেনে গেছে। সে নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। কিন্তু কি করে আমার কাছে আসবে সে, সেই চিন্তা তাকে ব্যস্তিব্যস্ত করে দিলো।

এক রাতে সে ফন্দি আঁটলো মনে মনে। পুরুষের পোশাক পরে, মাথায় গামছা বেঁধে রাত ১১টায় তার বাসা থেকে বের হয়ে নদী পাড় হয়ে বাজারের বন্ধ দোকানপাট পেরিয়ে আমাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। কয়েকদিন পর ঈদ। বাজারে দু-একটা দর্জির দোকানে তখনও কাজ চলছিল। বাজার থেকে আমাদের বাড়ির পথটা একেবারে জনশূন্য, ডানে-বামে, সামনে প্রায় এক-দেড় মাইল জনশূন্য। শুধু বিশাল একটা বিল, তার মাঝ দিয়ে রাস্তা। বাজার পেরিয়ে মাঝপথে রাস্তার পাশে কেউ জলাশয়ে মাছ ধরছিল। পাশের কোনও গ্রামের ছেলে হবে হয়তো। তারা দেখল হারিকেন হাতে কে যেন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। ডেকে কোনও সাড়া পায়নি। কাছে এসে দেখল পুরুষের বেশে মেয়ে, ফরেস্ট অফিসারের সুন্দরী বোন। আদম জেগে উঠল। কে জানত কার ডাকে কে ছুটে আসছিল। কোন সে খুশবু ছিল তার চুলে। তারা তখন তার শরীরের সিকিম অথবা হিমালয় তাদের মুঠোয় ভেঙে ফেলল। তার তলপেট থেকে ছদ্মবেশী পোশাক খুলে অভ্যন্তরে মাইন পুঁতে রাখল। তার চিৎকারে গলার মাফলার সেদিন ত্যানা ত্যানা হয়েছে। ষোলো আনা টইটম্বুর শরীর তার, এখন খচ্চরের নখে বন্দি। গোলাপি মার্বেলের মতো ডিগবাজি খাচ্ছিল তার ডাগর চোখ, কানতে কানতে তার গালের টোল স্পষ্ট হয়েছে, শকুনের মতো তাতে ঠোঁট বসিয়েছে তারা। ইস্।

এমন ঘটনার কোনও আলামতই আমার কানে আসেনি। চার-পাঁচ দিন পর যখন স্কুলে গেলাম, তখন ছুটি হয়ে গেছে। আমার এক আত্মীয় সে-ও টিচার। সে বলল, ‘তুমি কি কিছুই শোননি? কিছুই জানো না?’ আমি হতবাক! কি ঘটেছে? সে বলল, ‘এক জায়গায় থাকতে, একটু আড়ালে চলাফেরা করতে।’ খুব অবাক হলাম মনে মনে। সন্ধ্যায় দেখা করলাম তার সাথে। শুনলাম দিয়ার বখাটের হাতে দুর্ঘটনার শিকারের কথা। সারারাত তার সাথে অমানবিক অত্যাচার করেছে, ভোররাতে তাকে নদীর ওপারে পৌঁছিয়ে বদমাশ ছেলেরা চম্পট দিয়েছে। বাজারে এই ঘটনা রটে গেছে, সবাই জানে। পরামর্শ দিলো বন্ধু আমার, আমি বাজার এড়িয়ে চলতে লাগলাম। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। দিয়াকে বাসায় যখন পাওয়া যাচ্ছিল না, না পেয়ে খোঁজাখুঁজিতে জানে সে আমাদের বাসায় এসেছিল, কিন্তু ভোরে দিয়াকে পেয়ে সবাই মুহ্যমান। কিন্তু দিয়া নিজমুখে কোনও ঘটনা-দুর্ঘটনা স্বীকার করেনি।

মনটা অস্থির অসহায় অবস্থায় আমি চলতে পারছিলাম না। ওর এক বান্ধবীর সাহায্যে ওর সাথে দেখা হলো। তার চোখ ঘোলা, দৃষ্টি ফ্যালফ্যালে, উদভ্রান্ত, কিছুই স্বীকার করল না, শুধু অন্য একটা মানুষের সাথে কথা বলে এলাম। মানি প্লান্টের ডাঁটা যেন শুকিয়ে গেছে। পদ্য আউড়ে যাওয়ার গলাটা ভেঙে গেছে। মনে মনে খুব প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠলাম। মনে হলো, কি করে মিলবে দেখা খচ্চরদের, জিন্দা কবর দেবো।

বহু চেষ্টা করেও পুলিশ খচ্চরদের ধরতে পারেনি। পরদিন ভাবলাম- কি করবো, কি করা উচিত। দেখা হওয়া দরকার। কাল দেখা করবো। আমার দুঃখ জাগানিয়া দিয়ার সাথে। শুনলাম তাকে জোর করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে খুব কাঁদছিল, বিলাপ করে।

আমি অপরাধীর মতো কিছুদিন বাড়িতে কাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাই। কি ঘটেছিল তারপর আজও আমার জানা নেই। এরপর সিভিল সার্ভিসে পরীক্ষা দিয়ে চাকরিতে লেগে গেলাম। জীবন তার নিয়মে ডালপালা ছড়িয়ে দিলো। কিন্তু এ জীবন প্রশ্নের অন্বেষণের, গতকালও ছিল, আজও আছে। মহাকাল যেমন বয়ে যায় তেমনি বয়ে যাচ্ছি। প্রাত্যহিক দিন যাপনের বেদনা।

দৈনিক শুধু দিয়ে যাচ্ছে বিস্ময়, গতকাল ঠিক গতকালের মতো নয়। সে ছিল আমার সময়ের প্রজাপতি। যে আকাশ তারে করেনি মানা, তবু আকাশের মন তার হয়নি জানা। জীবনের ভার হয়তো তার বইবার স্বাদ গিয়েছিল ঝরে। আমি তো ভরে দিতেই চেয়েছিলাম তার মন শুধু তিমিরে।

জীবনের মহা অবতার জীবনভর স্ত্রীর, কন্যার চোখে দেখেছি দিয়ার ক্রোধে লাল, শুধু লাল প্রতিমা শিল্পের। আমি তাকে শিল্পে কখনও দেখিনি। কত রং কত রূপ যে এঁকেছে বিষাদে অভিমানে। সে হয়তো রক্তের লালে হরিণী। একজন যোদ্ধা যেমন স্টেনগান ভালোবাসে, দিয়া আমি তেমন করে ভালোবাসি তোমাকে।
‘অঙ্গে আমার অঙ্গীকারের বাণী
সারাজীবন বইতে হবে জানি,
দেবো তোমায় আমার দৃষ্টি আঁখি
যে আলোকে নয়ন ভরে রাখি।’

জানি না, জানি না আমার এলোকেশী সর্বনাশী কোন শহরের ঈশান কোণে ফুঁসছে ফুঁসুক। শুধু একটি খবর এখনও বানের জলে ভাসতে ভাসতে গলে যাচ্ছে। আমি মরে যাই। বিবেকের জর্জ সাহেব কি করে ঠেকাই দিয়ার মতো শারীরিক দুঃসংবাদগুলো, রোজ রোজ আমি পত্রিকার পাতায় মুখ লুকাই। আমার চোখের কান নেই। এখনও অপেক্ষা করি একটা সাড়ে তিন মিনিটের জাপটে ধরা চুমু, আমি হাত বুলাবো চোখের নিচের বলিরেখা বরাবর।