মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজরিত বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ

সুমন্ত গুপ্ত:   পথের দু’পাশের সৌন্দর্য অসাধারণ, সঙ্গে আছে নানা পাখির ডাক। এক ঘণ্টায় পৌছে যাই ছাতক বাজার। ছাতক পাবলিক খেয়াঘাট থেকে বাঁশতলা যাওয়ার পথটির প্রাকৃতিক শোভা ভারি সুন্দর! লিখেছেন সুমন্ত গুপ্ত ।

সিলেটের দোয়ারাবাজার উপজেলার উত্তরে ভারতের চেরাপুঞ্জি, মেঘালয় রাজ্য। পূর্বে ছাতক উপজেলা, দক্ষিণ ও পশ্চিমে সুনামগঞ্জ জেলা। সুনামগঞ্জ থেকে দোয়ারাবাজারের দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। সিলেট থেকে ৫০ কিলোমিটার উত্তরে দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদ। দোয়ারাবাজার সুরমা নদীর উত্তর পারে হওয়ায় সড়কপথে সরাসরি যোগাযোগ নেই। ভারত সীমান্তের কাছে হওয়ায় খুব শীতও পড়ে এখানে। ১৯৮৪ সালে সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হয়েছিল এই দোয়ারাবাজার উপজেলা। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এ উপজেলায় রয়েছে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে ১১টি সেক্টরের মধ্যে একমাত্র এ উপজেলার সেক্টরই ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে।

সর্বাধিক মুক্তিযোদ্ধার বসবাসও এ উপজেলায়। এখানে তৈরি হয়েছে দৃষ্টিনন্দন বাঁশতলা শহীদ স্মৃতিসৌধ এবং বাঁশতলা মুক্তিযোদ্ধাদের কবরস্থান। ভ্রমণপিপাসু বন্ধুদের কাছ থেকে প্রায় সময় বাঁশতলা শহীদ স্মৃতিসৌধ নাম শুনেছি। কিন্তু ব্যাটে-বলে না হওয়ার ফলে যাওয়া হয়ে উঠছিল না। আমার আবার পরিকল্পনা করে কোথাও যাওয়া হয় কম। ঘড়ির কাঁটায় তখন ভোর ৫টা সূয্যি মামা তার আলোয় আলোকিত করেনি পৃথিবী। কিন্তু মোবাইল তার নির্দেশমতো ডাকাডাকি শুরু করে দিল। টিং টিং টিং খুব বিরক্তিকর শব্দ, মোবাইলের দোষ নেই, দোষটা আমারই।

সারা সপ্তাহ অফিস করে শুক্রবার এলে ঘুম আরও জেঁকে বসে। তাই এই ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার আয়োজন মাত্র। মোবাইলের টিং টিং শেষ না হতেই মা শুরু করলেন ডাকাডাকি। শেষ পর্যন্ত ঘুম থেকে উঠতেই হলো। আমাদের চার চাকার মহাজন কথামতো সাতসকালে এসে উপস্থিত। সূর্যদেবের নাম নিতে নিতে আমরা যাত্রা শুরু করলাম। দিনের শুরু হচ্ছে, সঙ্গে মানব কোলাহল। সেই কোলাহল পেরিয়ে অচেনা নিস্তব্ধ-নিঝুম পথে চলতে সময় লাগে না। আমরা এগিয়ে চলেছি গন্তব্য বাঁশতলা শহীদ স্মৃতিসৌধের দিকে। দুরন্ত গতিতে এগিয়ে চলেছে আমাদের চার চাকার গাড়ি। মেঘ আর পাহাড়ের হাতছানি। এখানে পথের দু’পাশের সৌন্দর্য অসাধারণ, সঙ্গে আছে নানা পাখির ডাক। এক ঘণ্টায় পৌছে যাই ছাতক বাজার। ছাতক পাবলিক খেয়াঘাট থেকে বাঁশতলা যাওয়ার পথটির প্রাকৃতিক শোভা ভারি সুন্দর! বাঁশতলা পেঁৗছে মন আনন্দে ভরে উঠল।

ভারত সীমান্তঘেঁষা বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ এখন আমাদের একেবারে চোখের সামনে। শীতের দিন হলেও আকাশ কুয়াশাচ্ছন্ন নয়, আকাশে সূর্য উঠেছে। ঝকঝকে নীলাকাশ যাকে বলে। আর হাত বাড়ানো দূরত্বে পাহাড়। স্মৃতিসৌধে পেঁৗছানোর আগেই মুগ্ধ হতে হয়। সে মুগ্ধতা এনে দেয় সেখানকার স্লুইসগেট। চেলাই খালের ওপর নির্মিত সে স্লুইসগেট দেখার পর পা আর আগে বাড়তে চায় না। এর পরেও সামনে এগিয়ে যেতে হয়। আকাশতলে পাহাড় আর স্মৃতিসৌধ ভাবতে ভাবতে মুখ থেকে বের হয়ে আসে ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই। আর পাহাড়ে হেলান দিয়ে স্মৃতিসৌধ।’ চলতি পথে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হন সহকর্মী মুসা ভাই। মুসা ভাই বললেন, ডাউক সড়ক থেকে সুনামগঞ্জ এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহ সীমান্তবর্তী অঞ্চল নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পাঁচ নম্বর সেক্টর। পাঁচ নম্বর সেক্টরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমান্ডার ছিলেন মেজর মীর শওকত আলী। পাঁচ নম্বর সেক্টরের সাবসেক্টর ছিল সুনামগঞ্জ জেলার বাঁশতলা।

সেখানকার কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন হেলাল উদ্দিন। পাহাড়বেষ্টিত বাঁশতলা এলাকা এবং তার আশপাশে মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হন, তাদের সমাহিত করা হয় বাঁশতলার এ নির্জনে। সেই স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য নির্মাণ করা হয় বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ। আমরা দাঁড়িয়ে আছি বাঁশতলা স্মৃতিসৌধে। চারপাশেই গাছগাছালি আর পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ এক অন্যরকম পরিবেশ তৈরি করেছে। স্মৃতিসৌধের চারপাশের সৌন্দর্য পলকহীন চোখে উপভোগ করছি প্রকৃতির অকৃপণ দান। স্মৃতিসৌধের পেছনে তাকালে বোঝা যায় দূরে পাহাড়গুলো আকাশ ছুঁয়েছে। যেন পাহাড়ে উঠতে পারলেই আকাশ হাতের মুঠোয়। ওপরে নীলাকাশ, নিচে থৈ থৈ জলরাশি, স্বচ্ছ আর নীল।

স্মৃতিসৌধের বাম পাশের রাস্তা দিয়ে কিছুটা হেঁটে দেখতে পেলাম সবুজ ছায়ায় মুক্তিযুদ্ধে নাম না জানা ১৪ জন শহীদের সমাধি। কোলাহলমুক্ত পরিবেশে আমাদের প্রিয়জনরা ঘুমিয়ে আছেন। দূর থেকে দেখলে মনে হয় শহীদের সারি সারি সমাধিতে আকাশছোঁয়া বৃক্ষ যেন এক একটি প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে সবুজ পাহাড়ের গায়ে শতাব্দী প্রাচীন পাথরের কারুকাজ। পাহাড়ের একপাশে ঘন কালো মেঘের অন্ধকার। অন্য পাশে কাঠফাটা রোদ। এ যেন প্রকৃতির এক লীলাখেলা। স্মৃতিসৌধ আর পাহাড়কে বিদায় জানিয়ে আমরা ১০ মিনিট হেঁটে টিলার ওপর পাহাড়ি গ্রামে চলে এলাম। সেখানে প্রায় ৩৬টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পরিবারের বসবাস। যেদিকে চোখ যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়।

একটি পাহাড় যেন অন্যটির সঙ্গে আলিঙ্গন করছে। এরপর আমরা গেলাম চেলাই খালের ওপর স্লুইসগেট বা ব্যারাজ দেখতে। আকাশের সঙ্গে যেন মিতালি করেছে জলের ধারা_ দূর থেকে দেখতে অসাধারণ লাগছিল। কিন্তু ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সময় এগিয়ে চলেছে। আমাদের শহরে ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে এলো। আমি নীলাকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমাদের গাড়ি ছুটছে শাঁ শাঁ করে। পেছনে ফেলে আসি একরাশ স্মৃতি। আমরা শহীদদের ভুলিনি। আমাদের চিন্তায় ও প্রতিজ্ঞায় তারা বেঁচে থাকবেন চিরকাল।

জেনে নিন

বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ যেতে হলে আপনাকে যেতে হবে সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার বাঁশতলায়। সুনামগঞ্জ জেলা সদর থেকে বাঁশতলা যাওয়া যাবে। আবার ছাতক উপজেলা থেকেও বাঁশতলা যাওয়া যায়। দিন-রাত ঢাকা-সিলেট-সুনামগঞ্জ রুটে বাস চলাচল করে। সুবিধামতো সময়ে হানিফ, ইউনিক কিংবা শ্যামলী পরিবহনের বাসে চেপে বসলেই হবে। আমরা সিলেট-ছাতক-দোয়ারাবাজার হয়ে বাঁশতলা গিয়েছিলাম। সন্ধ্যার বাসে যাত্রা করলে রাত ১২টার মধ্যে সিলেট পৌছে রাতটুকু বিশ্রাম নিয়ে পরদিন বাঁশতলা।

সকালে আম্বরখানা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আপনাকে ছাতক আসতে হবে। ভাড়া মাথাপিছু ৮০ থেকে ১০০ টাকা। এবার ছাতক বাজার থেকে সুরমা নদী পার হয়ে আবার সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চেপে সরাসরি বাঁশতলা। তা ছাড়া মাইক্রোবাসে করেও যেতে পারবেন বাঁশতলা স্মৃতিসৌধে। গাড়ির জন্য_ ০১৬১৭৬৭৪৩১০, ০১৭৩৫০২৪২০৫।