সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

নিউজ ডেস্ক: সিলেট বিভাগে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হচ্ছে। একদিকে সুরমা, কুশিয়ারা, সুনাই প্রভৃতি নদীর পানি বৃদ্ধি, অন্যদিকে হাকালুকি হাওরে অস্বাভাবিকভাবে পানি বেড়ে যাওয়ার কারণে সিলেটের অন্তত ৬টি উপজেলা বন্যাক্রান্ত হয়েছে। এ ছাড়া মৌলভীবাজারের জুড়ী, কুলাউড়া, বড়লেখা ও রাজনগরেও বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে শুরু করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডসূত্র জানিয়েছে, বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

এদিকে বন্যার কারণে সিলেট বিভাগে পাঁচ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেট বিভাগীয় কমিশনার ড. নাজমুন আরা খানম।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সিলেটের ৬ উপজেলায় ১৭৪টি ও মৌলভীবাজারে ১৬৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান বন্ধ রয়েছে। ঈদের ছুটি শেষে গত শনিবার প্রতিষ্ঠান খোলার কথা ছিল। সিলেটের ১৬১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে ১৩টি মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও বন্ধ রয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, উজানে ভারতের মেঘালয় পাহাড়ে টানা বর্ষণের কারণে সিলেটের কুশিয়ারা ও সুরমা নদীর পানি বাড়তে থাকে। বর্তমানে দুটি নদীর সব কটি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে কুশিয়ারা নদীর পানি ঢুকে জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর, গোলাপগঞ্জ ও জকিগঞ্জ উপজেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে। উজানে টানা বর্ষণ হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম জানান, রোববার বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত কুশিয়ারা নদীর পানি অমলশীদ পয়েন্টে ৮৫ সেমি, শেওলা পয়েন্টে ৭৩ সেন্টিমিটার এবং শেরপুর পয়েন্টে ২৪ সেন্টিমিটার বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। একই সময় কানাইঘাটে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। আরও দুদিন পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে কুশিয়ারার পানি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম জানান, সিলেটে ১৬১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

এ ছাড়া মৌলভীবাজার জেলায় ১৬৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্যার কারণে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে জানান প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় উপ-পরিচালক তাহমিনা খাতুন। তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা হয়নি। তবে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

এদিকে সিলেট জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার জানিয়েছেন, এরই মধ্যে সিলেটের ৬ উপজেলায় ৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এ সব আশ্রয়কেন্দ্রে ৮৯টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। বন্যায় ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে ৬ উপজেলায় ইতোমধ্যে ১২৮ মেট্রিক টন চাল ও নগদ প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি উপজেলায় মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

মৌলভীবাজার থেকে চৌধুরী ভাস্কর হোম জানান, বড়লেখা, জুড়ি ও কুলাউড়ার একাংশের বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন লক্ষাধিক মানুষ। অপ্রতুল ত্রাণ ব্যবস্থা এবং গবাদি পশুর খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ায় মানবেতর জীবন যাপন করছে পানিবন্দি মানুষ।

এদিকে হাকালুকির উত্তাল ঢেউয়ে মানুষ ঘরবাড়িতে থাকতে পারছে না। বহু পরিবার জীবনকে বাজি রেখে মাচার ওপর ঠাঁই নিয়েছে। যারা বাড়িঘরে থাকতে পারছে না তারা তাদের গবাদি পশু ও অন্য মালপত্র নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। হাওরে পানিবন্দি মানুষের মাঝে এখনো ত্রাণ পৌঁছেনি বলে অভিযোগ করেছেন দুর্গতরা।

কুলাউড়ার ভুকশিমইল ইউপি চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির জানান, গত এপ্রিলে হাকালুকি হাওরে আকস্মিক বন্যায় তার ইউনিয়নের হাজার হাজার একর বোরো ধান পচে বিনষ্ট হয়। সে বিপদ কাটতে না কাটতে গত সপ্তাহে আবারও বন্যা দেখা দিয়েছে এই হাওরে। এতে হাওর পারের শত শত মানুষের বাড়িঘর তলিয়ে গেছে। কিন্তু সরকারি ত্রাণ একবারেই অপ্রতুল।

জুড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিন্টু চৌধুরী জানান, পাহাড়ি ঢলে জায়ফরনগর ও পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জায়ফরনগর ইউনিয়নে প্রায় ২২টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। সরকারিভাবে সর্বশেষ ৫০ মেট্রিক টন চাল ও ১ লাখ বিশ হাজার টাকা পাওয়া গেছে, ত্রাণ কার্যক্রম চলমান আছে।

বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, এখন পর্যন্ত উপজেলার ৩০টি পরিবার নিরাপদে বিভিন্ন স্কুলে আশ্রয় নিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনো খাবার, স্যালাইন, নগদ ৫০০ টাকা ও বিনামূল্যের ১০ কেজি করে চাল বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ তোফায়েল ইসলাম জানান, বন্যাকবলিত এলাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৯৪ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৭ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।

ওসমানীনগর প্রতিনিধি জানান, বন্যায় সিলেটের ওসমানীনগর ও বালাগঞ্জ উপজেলার শতাধিক বিদ্যালয় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এ সব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী উপস্থিতি একেবারেই কমে গেছে।