করুণাময় গোস্বামী স্যারের চলে যাওয়া

আসজাদুল কিবরিয়া:  করুণাময় গোস্বামী, আমাদের গোস্বামী স্যার, চলে গেলেন শুক্রবার মাঝরাতে। তিনি ছিলেন একজন প্রাণবন্ত, সদা কর্মব্যস্ত ও চিরসবুজ মানুষ। ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হয়েও তাঁর কর্মপরিধির বিস্তার একাধারে বিস্ময়কর ও ঈর্ষণীয়। সংগীতজগতের গভীরে ডুব দিয়েছেন তিনি। তালিম নিয়েছেন উচ্চাঙ্গসংগীতের। দীর্ঘ সময় নিয়ে প্রস্তুত করেছেন সংগীত কোষ। কাজ অর্ধেক হওয়ার পর ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর যাবতীয় বইপত্র ও পাণ্ডুলিপি লুটপাট ও ধ্বংস হয়ে যায়। যুদ্ধ শেষে স্বাধীন দেশে নতুন উদ্যমে শূন্য থেকে কাজ শুরু করেন তিনি। তাঁর অসীম ধৈর্যের কারণে সংগীত কোষ আলোর মুখ দেখে ১৯৮৫ সালে।

সরাসরি ছাত্র না হয়েও তিন দশকের বেশি সময় ধরে গোস্বামী স্যারের সঙ্গে আমার পরিচিতি ও যোগাযোগ। নারায়ণগঞ্জের সুধীজন পাঠাগারের পরিচালকের দায়িত্ব যে বছর তিনি নিলেন, কাকতালীয়ভাবে সে বছর মানে ১৯৮৬ সালে আমি তাঁকে কাছ থেকে প্রথম দেখি। আমি তখন স্কুলছাত্র। তিনি তোলারাম কলেজের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক। পরের বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা

একাডেমির বৃত্তিতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। বিষয়, ‘বাংলা কাব্যগীতির ধারায় কাজী নজরুল ইসলামের স্থান’। নজরুল বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাঁর নামডাক তখন থেকে আরও জোরেশোরে ছড়িয়ে পড়ল।

অধ্যাপনার পাশাপাশি সংগীত ও সাহিত্য নিয়ে নানামুখী গবেষণাকাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত গারল্যান্ড এনসাইক্লোপিডিয়া অব ওয়ার্ল্ড মিউজিকে ‘পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের গান’ শিরোনামে যে সুদীর্ঘ নিবন্ধ, সেটি তাঁরই রচনা।

সুধীজন পাঠাগারে বসে বসে তিনি এই কাজের বড় অংশটি সম্পন্ন করেছিলেন স্পষ্ট মনে আছে। ফোর্ড ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে লোকসাহিত্য উন্নয়ন কেন্দ্র (লোসাউক) থেকে ‘বাংলা গানের শ্রুতি ইতিহাস’ শিরোনামে ১০টি ক্যাসেট নিয়ে একটি সেট প্রকাশিত হয়েছিল। প্রতি ক্যাসেটে বাংলা ও ইংরেজিতে পাঁচ মিনিট করে বিভিন্ন ধরনের বাংলা গানের ধারা সম্পর্কে পরিচিতি ও তারপর ৮ থেকে ১০টি গান অন্তর্ভুক্ত হয়।

গানের ধারা পরিচিতি রচনা ও গান নির্বাচনের কাজটি ছিল গোস্বামী স্যারের করা। এই কাজগুলো হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে, আমি যার প্রত্যক্ষদর্শী।

সুধীজন পাঠাগার থেকে বাংলা ১৪০০ সাল উদ্‌যাপনের জন্য বাংলা সংস্কৃতির শতবর্ষ নামে একটি বই প্রকাশ করা হয়। এটি হলো ১০০ বছরে বাংলায় নাটক, শিক্ষা, সংগীত, গ্রন্থাগার, কবিতা, উপন্যাস, গল্প, বিজ্ঞানচর্চা, প্রকাশনা ও চলচ্চিত্রবিষয়ক বিভিন্ন প্রবন্ধের এক সংকলন। ড. গোস্বামী ছিলেন এর প্রধান সম্পাদক। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, এই প্রকাশনার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছি। তারও আগে আশির দশকের মাঝামাঝি নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার সহযোগিতায় সুধীজন পাঠাগার যে নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস প্রকাশ করে, তার অন্যতম সম্পাদক ও লেখক ছিলেন করুণাময় গোস্বামী।

অনুবাদকর্মেও গোস্বামী স্যার দক্ষতার প্রমাণ রেখেছেন। আফ্রিকার গল্প ও আফ্রিকার কবিতা অনুবাদগ্রন্থ দুটি প্রকাশিত হয়েছিল সেই আশির দশকেই। তবে ড. তারাচাঁদ রায়ের ভারতীয় সংস্কৃতিতে ইসলামের প্রভাব অনুবাদকর্মটি তাঁকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। শিশুদের জন্য লিখেছেন তিনি। লিখেছেন রঙ্গ-রসিকতা-কৌতুক নিয়েও। বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতেও লিখে গেছেন। তাঁর রচিত নজরুলের ইংরেজি জীবনীটি ছোট হলেও সুলিখিত ও বহুল প্রচারিত। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কমবেশি নিয়মিত লিখে গেছেন।

গোস্বামী স্যার অধ্যাপনাজীবনের শেষ পর্যায়ে নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তবে শিক্ষা কার্যক্রম থেকে পুরোপুরি বিযুক্ত হননি। সর্বশেষ ক্যামব্রিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্টাডি সেন্টার ও ক্যামব্রিয়ান কালচারাল একাডেমির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অধ্যক্ষ হিসেবে।

নিজের লেখালেখির জগতে ড. গোস্বামীর সর্বশেষ সংযোজন উপন্যাস। দেশ বিভাগের মর্মান্তিক দিক তথা হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, প্রাণহানি ও রক্তপাত নিয়ে ভারত ভাগের অশ্রুকণা তাঁর প্রথম উপন্যাস, যা মূলত এক দীর্ঘ আখ্যান। এতে তিনি নিজের পারিবারিক জীবনের কিছু কথাও তুলে ধরেছেন।

১৯৪৩ সালের ১১ মার্চ তাঁর জন্ম ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার গোঁসাই চান্দুরা গ্রামে। বাবা রাসবিহারী গোস্বামী ও মা জ্যোৎস্না রানী দেবীর প্রথম সন্তান তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে এমএ পাস করে সেই ১৯৬৪ সালেই যোগ দেন নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজে। মাঝে সাময়িক বদলি ছাড়া প্রায় চার দশক ধরে এখানেই অধ্যাপনা করেছেন। তাঁর সহধর্মিণী শিপ্রা রানী দেবী দর্শনের অধ্যাপক। বড় সন্তান সায়ন্তন গোস্বামী একজন প্রকৌশলী, কানাডায় সপরিবারে প্রবাসী। ছোট সন্তান তিথি গোস্বামী সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী। এরা দুজনই আমার ছোট ভাই-বোনতুল্য, যাদের সুবাদে স্যারের বাসায় যাতায়াত বেড়েছিল।

গোস্বামী স্যার সারা জীবনই অত্যন্ত সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করেছেন। স্যারের সবচেয়ে বড় গুণ তিনি নীরবে কাজ করে যেতেন। প্রচার-প্রচারণা নিয়ে ভাবতেন না। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৬৮। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ একুশে পদকসহ একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন। এ বছরই প্রকাশিত হয়েছে গোস্বামী স্যারের দ্বিতীয় উপন্যাস লাহোরের রহিম খের।

এরপরই কথা প্রসঙ্গে আমাকে জানিয়েছিলেন যে আরেকটি আখ্যান লেখার কাজে হাত দিয়েছেন। অনেকটা লেখা হয়েও গিয়েছিল। আর মৃত্যুর সপ্তাহখানেক আগে আমার সঙ্গে টেলিফোনে শেষ আলাপ। তখন জানালেন যে কিছু অপ্রিয় সত্য বিষয় নিয়ে একটা বই লেখার পরিকল্পনা করে ফেলেছেন।

নজরুলের ওপর পিএইচডি করার সময় কীভাবে কারা তাঁকে নিরুৎসাহিত করেছিল আর কারা তাঁকে উৎসাহিত করেছিল, সে সম্পর্কে লিখবেন। লিখবেন প্রয়াত ও জীবিত কয়েকজন বিশিষ্টজনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও। কিন্তু তাঁর জন্য স্রষ্টার বরাদ্দকৃত সময় যে ফুরিয়ে গিয়েছিল, তিনি বা আমি আমরা কেউই তা বুঝতে পারিনি।

আসজাদুল কিবরিয়া: লেখক ও সাংবাদিক।

asjadulk@gmail.com