রাশিয়া কি অর্থনীতিতেও অপ্রতিরোধ্য?

শফিকুর রহমান রয়েল: প্রায় আড়াই বছরের আর্থিক সংকোচনের পর স্থিতিশীলতার কিছু ইঙ্গিত অর্জন করেছে রাশিয়া। যদিও চলতি বছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ১ শতাংশে পৌঁছুনোর প্রতাশ্যা করা হচ্ছে, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার ভয় কিন্তু ঠিকই বিদ্যমান, যেটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দেশটিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া অধিগ্রহণের পর থেকে। পশ্চিমা অবরোধ মোকাবিলা করছে ঠিকই; কিন্তু তা শুধু কাগজে-কলমেই। অবরোধ বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ার রাশিয়ার অর্থনীতিতে এর প্রভাব বলতে গেলে পড়ছে না বললেই চলে।

পররাষ্ট্র নীতির আশাবাদ, সুখস্বাচ্ছন্দ্য ও মৃদু অভ্যন্তরীণ চাপের রসায়নে পুতিন সরকার বলতে গেলে আয়েশেই দিন পার করছে এবং নিকট ভবিষ্যতে চাপে পড়ার কোনো প্রকার সম্ভাবনাও নেই। সারমর্ম তুলে ধরতে হলে, ক্রিমিয়া ইস্যুতে ভ্লাদিমির পুতিনকে বিপদে পড়ার সমূহ সম্ভাবনার মুখে ঠেলে দেওয়ার যে চেষ্টা করেছিল দেশি ও বিদেশি বিরোধী পক্ষ, তা ভেস্তে গেছে।

ঠিক লিওনিদ ব্রেজনেভের সময়ের মতো পররাষ্ট্র নীতি ঢেকে দিয়েছে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে। অর্থনীতি ও রাজনীতির অবস্থা বিবেচনায় তখনকার চেয়ে বরং এখন ভালো অবস্থায় রয়েছে রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রেমলিনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার অভিপ্রায়ের কথা জানিয়ে দিয়েছেন পরিষ্কার ভাষায় এবং গত মাসে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দুই দেশের সর্বোচ্চ দুই নেতার একত্রে বসার কথা ছিল। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলও রাশিয়ার পক্ষে গেছে।

রাশিয়ার নিজের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে আগামী বছরের ২৮ জুনে। এতে নতুন কিছু ঘটার সম্ভাবনাও নেই। অর্থাত্ পুতিনই প্রেসিডেন্ট থাকছেন আর যথারীতি প্রধানমন্ত্রীর পদে দিমিত্রি মেদভেদেভ। রাশানদের অধিকাংশেরই এমন ধারণা। আরামপ্রিয় মাস্কোভিটরাতো ধরতে গলে পুতিন বলতেই পাগল।

এর আগে মস্কোর অবকাঠামোকে এতটা উন্নত কখনোই দেখা যায়নি। চোখ ধাঁধিয়ে যায় সামপ্রতিক সমপ্রসারিত মস্কোর মেট্রো ব্যবস্থা দেখলে। একেতো একেবারেই আধুনিক, তার ওপর ঝকঝকে-তকতকে। দেশের বিমানবন্দরগুলো আরো সুন্দর ও দক্ষ হয়ে উঠেছে। গাড়ি পার্কিংয়ে যে বিশৃঙ্খলা বিরাজমান ছিল, তাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। দ্রুত ও সস্তা গাড়ি-ভাগাভাগি ব্যবস্থার বর্ধিতকরণে পার্ক করার প্রয়োজনীয়তাকেই কমিয়ে আনা হয়েছে। নাগরিকরা ঝলমলে ও বিলাসবহুল শপিং মলগুলো পরিদর্শনে যেতে পারে অনায়াসে এবং দৃশ্যত যে কোনো কাঙ্ক্ষিত খাদ্য (পশ্চিমা মাখন ছাড়া) কিনতে পারে খুচরো দোকানগুলো থেকে।

সবকিছুর পরেও এমন অনেক রাশিয়ান অবশ্যই রয়েছে, যারা দেশের বর্তমান সার্বিক অবস্থা নিয়ে মোটেও সন্তুষ্ট নয়। অন্য অনেক বিষয় থাকলেও শক্তিশালী ফেডেরাল সিকিউরিটি সার্ভিস (এফএসআই) নিয়ে সমালোচনার লোকের অভাব নেই। ফ্রিডম হাউজ মানবাধিকারের প্রশ্নে রাশিয়ার স্কোরকে সম্ভাব্য সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে দিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে গাইডার ফোরামে নিপীড়নের ছায়ামূর্তিটা ভিন্ন ছিল। রাশান প্রেসিডেন্সিয়াল একাডেমি অফ ন্যাশনাল ইকোনোমি এন্ড পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশানের ব্যানারে প্রতিবছর তিন দিনের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় রাশিয়ায়, বরিস ইয়েলেিসন যুগের সংস্কারক ইয়েগর রাইডারের নামানুসারে যার নাম দেওয়া হয়েছে রাইডার ফোরাম। রাশিয়ার অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে এতে আলোচনা করতে সরকারের প্রতিনিধিরা ছাড়াও অংশ নেন দেশ-বিদেশের সমাজবিজ্ঞানীরা।

গত গাইডার ফোরামে সরকারি মন্ত্রীদের আয়েশি, উদার ও প্রতিযোগিতার মনোভাবসম্পন্ন মনে হলেও রাশিয়ার মূল সমস্যাবলী নিয়ে একগুঁয়ে বক্তব্য পরিহারের বিষয়ে সচেতন ছিলেন- সম্পত্তির প্রকৃত অধিকারের অনুপস্থিতি, আইনের শাসন ও গণতন্ত্র। সাবেক অর্থমন্ত্রী অ্যালেক্সি কুদরিন কিছু কথা অবশ্য বলেছিল, তবে তা অত্যন্ত ভদ্রভাবে। বিধিনিষেধহীন অধিকাংশ আলোচনায় দেশের সুকার্যকর সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে বক্তারা সরব ছিলেন। প্রায় সবার মুখ থেকেই বেরিয়ে আসে, রাশিয়ার বৃহত্ অর্থনৈতিক সংস্থাপনের নৌকাটা এতটাই ভালো অবস্থানে রয়েছে যে, সেটি সহসাই ফুটো হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই।