৫০০ বছরের ঐতিহ্য বাঘা শাহি মসজিদ

সৌরভ হাবিব ও আবদুল লতিফ মিঞা, রাজশাহী:  প্রায় ৫০০ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধারণ করে আছে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী বাঘা শাহি মসজিদ। সুলতানি আমলে ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে আসা হজরত শাহ মোয়াজ্জিম দানিশমন্দ ওরফে শাহদৌলার (রহ.) সম্মানে ১৫২৩-২৪ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন সুলতান নাসির উদ্দীন নসরত শাহ। ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হলেও টেরাকোটার সৌন্দর্য আর নির্মাণশৈলীর কারণে এখন

মসজিদটি দেশের অন্যতম প্রত্ননিদর্শন হিসেবে পর্যটকদের হৃদয় কাড়ে।

ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, ষোলো শতকের গোড়ার দিকে পদ্মা নদীপথে বাঘায় ইসলাম প্রচার করতে এসেছিলেন হজরত শাহ মোয়াজ্জিম দানিশমন্দ ওরফে শাহদৌলা (রহ.)। তিনি ছিলেন বাগদাদের খলিফা হারুনুর রশিদের বংশধর। এ সাধক আলা

বকশ বরখুরদারের মেয়ে জেবুন্নেছার সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন।

জনশ্রুতি আছে, সুলতান নাসির উদ্দীন নসরত শাহ পদ্মা নদী দিয়ে ঢাকার বিদ্রোহ দমন যাচ্ছিলেন। পথে তার বাহিনীর সবাই পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হন। বাঘায় যাত্রাবিরতি দিয়ে নাসির উদ্দীন দেখেন, বাঘবেষ্টিত একজন সাধক ধ্যানে বসে আছেন। তখন তারা সাধক শাহদৌলার কাছে তাদের অসুখের কথা বলেন। পরে শাহদৌলার দেওয়া ওষুধ খেয়ে তারা সুস্থ হয়ে ওঠেন। এ সময় নাসির উদ্দীন জানতে চান, এ সময় ঢাকায় যাওয়া উচিত হবে কি-না? সাধক তাদের একদিন অপেক্ষা করতে বলেন। এর পর

তিনি জানান, আর ঢাকায় যেতে হবে না। যুদ্ধে তারা জয়লাভ করেছেন। একদিন পর দূত এসে জানান, সত্যিই তারা যুদ্ধে জয়লাভ করেছেন। সুলতান সাধকের প্রতি অভিভূত হন এবং কিছু নিষ্কণ্টক জমি গ্রহণের অনুরোধ জানান। পার্থিব সম্পদের প্রতি নিরাসক্ত সাধক শাহদৌলা তা গ্রহণ করেননি। পরে তার ছেলে আবদুল হামিদ দানিশমন্দকে (রহ.) তা প্রদান করেন। সুলতান তাকে ৪২টি মৌজার ভূমি দান করেন। ১৫২৩-১৫২৪ খ্রিস্টাব্দে সুলতান নাসির উদ্দীন নসরত শাহ হজরত শাহদৌলার সম্মানে বাঘায় অপূর্ব শিল্প সুষমামণ্ডিত মসজিদটি নির্মাণ করেন। দেশের পুরনো ৫০ টাকার নোটে ও ১০ টাকার ডাকটিকিটে এটি স্থান পেয়েছে।

রাজশাহী শহর থেকে ৪৮ কিলোমিটার পূর্বে পদ্মা নদীর তীরে প্রায় ২৫৬ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত দর্শনীয় শাহি মসজিদ। এখানে সুবিশাল দীঘি ও অন্য আউলিয়াদের সমাধি স্থান ও মূল দরগাহ রয়েছে। সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৮-১০ ফুট উঁচু একটি বেদির ওপরে এ মসজিদ তৈরি করা হয়েছে। এর দু’পাশ দিয়ে দুটি বিশাল প্রবেশপথ রয়েছে। ইসলামিক স্থাপত্যরীতিতে তৈরি মসজিদটির দেয়ালে রয়েছে আমগাছ, শাপলা, লতাপাতাসহ ফার্সি খোদাই শিল্পের হাজার রকমের কারুকাজ। মসজিদটিতে রয়েছে পাঁচটি দরজা ও ১০টি গম্বুজ, ভেতরে ছয়টি স্তম্ভ ও চারটি অপূর্ব কারুকাজখচিত মেহেরাব। ৭৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৪২ ফুট প্রস্থ মসজিদের উচ্চতা ২৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। মাঝখানের দরজার ওপরে ফার্সি ভাষায় লেখা একটি শিলালিপি রয়েছে। এর পূর্বদিকে রয়েছে ৫২ বিঘা আয়তনের বিশাল দীঘি। শীতকালে এতে থাকে অতিথি পাখির কলরব। দীঘিতে পদ্মফুলের সৌন্দর্যও মানুষের নজর কাড়ে।

সুদূর বাগদাদ থেকে পাঁচজন সঙ্গীসহ ইসলাম প্রচারের জন্য বাঘায় এসেছিলেন শাহদৌলা। সেখানে কাটিয়েছেন বাকি জীবন। শাহি মসজিদের ভেতরে প্রবেশপথের উত্তর গেটের বাঁদিকে হজরত শাহ মোয়াজ্জিম ওরফে শাহদৌলা (রহ.) ও তার পাঁচ সঙ্গীর মাজার। শাহি মসজিদের উত্তরে খানকাবাড়ির ভেতরে তার ছেলে হজরত শাহ আবদুল হামিদের (রহ.) মাজার রয়েছে।

বাঘা ওয়াকফ এস্টেটের মোতোয়ালি খন্দকার মুনসুরুল ইসলাম জানান, ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে বাঘা শাহি মসজিদটির ছাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে ১৯৭৭-৭৮ সালে তা সংস্কার করা হয়। ১৯৭২ সালে এখানে তৈরি হয়েছে শাহদৌলার নামে বাঘা শাহদৌলা ডিগ্রি কলেজ।

ঐতিহাসিক এ মসজিদ দেখতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বাঘায় আসেন। এ ছাড়া এখানকার প্রাচীন নারী মসজিদ এবং মহলপুকুরের ভগ্নদশাও মানুষকে নিয়ে যায় অতীত ভাবনায়।

দিনাজপুর থেকে মসজিদ দেখতে আসা টেরাকোটাশিল্পী ও এনজিও কর্মী শাহনাজ পারভীন বলেন, ‘মসজিদটিতে দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দিরের মতো টেরাকোটার কারুকাজ আছে। বাঘা মসজিদের ওপরে যে গম্বুজগুলো আছে, তা দেখতে অনেকটা ষাটগম্বুজ মসজিদের মতো। মসজিদের কারুকাজ অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। এত সুন্দরভাব কারুকাজ করা যে, আমরা যারা টেরাকোটার কাজ করি, তাদের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে যেতে পারে।’ রাজশাহীর দর্শনার্থী সোনিয়া তাসনীম ও মুসাদ্দিকুন নাহার বলেন, ‘৫০ টাকার নোটে মসজিদটি দেখার পর থেকেই স্বচক্ষে দেখার ইচ্ছা ছিল। এবার সুযোগ পেয়েই দেখে নিলাম।’

বাঘার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন অনুশীলনের সভাপতি গোলাম তোফাজ্জল কবীর মিলন বলেন, ‘বাঘা মসজিদ শুধু মুসলিম সম্প্রদায়েরই নয়, এটি সারাদেশের মানুষের কাছে একটি আকর্ষণীয় পুরাকীর্তি। মসজিদটি সংস্কার ও সংরক্ষণ করে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখতে সরকারের কাছে দাবি জানাই।’