ঈদ বিনোদনের অতীত-বর্তমান

ইকবাল খন্দকার:  ঈদ মানেই বহুমুখী বিনোদন। হোক সেটি অতীত কিংবা বর্তমান। তবে এটি স্বীকার করতেই হবে, বিনোদনের ধরন প্রতিদিনই একটু একটু করে বদলায়। সেই হিসেবে অতীত এবং বর্তমানের ঈদ বিনোদনের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। আর এই স্বাভাবিক ব্যাপারটিই আমরা লক্ষ করছি প্রতিবার, প্রতি ঈদে।

প্রথমেই ফিরে তাকানো যাক অতীতের ঈদ বিনোদনের দিকে। তখন ঘরে ঘরে টেলিভিশন ছিল না। পুরো গ্রামে হয়তো একটা বা দুটো টেলিভিশন ছিল, তাও সাদাকালো। বিদ্যুৎ না থাকায় এগুলো সব সময় যে চলত, তাও নয়। যখন ব্যাটারি থাকত, তখনই কেবল সম্ভব হতো। তবে ঈদের আগে ব্যাটারি চার্জের হিড়িক পড়ে যেত। সবাই তাদের টিভির ব্যাটারি চার্জ করে আনত কেবল ঈদ অনুষ্ঠান দেখার জন্য। এর পর ঈদ আসত, শুরু হতো বাংলাদেশ টেলিভিশনের ঈদ আয়োজন। এই আয়োজনে থাকত দমফাটানো হাসির নাটক, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, ব্যান্ডসংগীতের অনুষ্ঠান, আধুনিক গানের অনুষ্ঠান, নৃত্যানুষ্ঠান আরও কত কি! তবে একটি আয়োজন পুরো আয়োজনকে রাঙিয়ে তুলত বিশেষভাবে, নতুন মাত্রা যোগ করত ঈদ বিনোদনে।

এই আয়োজনের নাম বাংলা সিনেমা। সাদাকালো টিভিতে বাংলা সিনেমা দেখার আনন্দ ছিল বিশাল রুপালি পর্দায় সিনেমা দেখার চেয়েও অধিক আনন্দের। আর এই আনন্দ উপভোগের জন্য হুলুস্থূল লেগে যেত গ্রামজুড়ে। হয়তো টিভির ব্যাটারিতে অল্প চার্জ আছে। ঘণ্টা তিন-চারেক সার্ভিস পাওয়া যেতে পারে। এ অবস্থায় অন্যান্য আয়োজন দেখা থেকে বিরত থাকা হতো শুধু বাংলা সিনেমা দেখার জন্য। এমনও হতো, হয়তো কারো টিভির ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়ে গেছে। টিভির মালিক ইচ্ছুক নন টাকা খরচ করে আবার চার্জ করাতে। এ অবস্থায় দর্শকরা পাঁচ-দশ টাকা করে দিয়ে ব্যাটারি চার্জ করে আনত সিনেমা দেখার জন্য।

যে সময়টায় সিনেমা শুরু হতো, এর আগেই সবাই নিজেদের জরুরি কাজ শেষ করে ফেলত সিনেমাটা নির্বিঘ্নে দেখার জন্য। ঈদ উপলক্ষে বাড়িতে মেহমান এলে তাদের আপ্যায়ন করা হতো সিনেমা শুরুর আগে কিংবা পরে। তবু নির্বিঘ্নে সিনেমা দেখা চাই। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘ছায়াছন্দ’ অনুষ্ঠানের আবেদনও ছিল একইরকম। ঈদের ছায়াছন্দের তো তুলনাই ছিল না। আর এই অনুষ্ঠানে একবার যে গান বাজত, সে গান চলে যেত মুখে মুখে। একই কথা প্রযোজ্য ছিল আধুনিক কিংবা ব্যান্ডগানের ক্ষেত্রেও।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের ঈদ আয়োজনে প্রচারিত আধুনিক আর ব্যান্ডগান সে সময় তো জনপ্রিয়তা পেয়েছেই, সেই জনপ্রিয়তা এখনো ধরে রেখেছে গানগুলো। আর এর একটাই কারণ, তখন মানুষ টিভি দেখত। ঈদ আয়োজনের জন্য অপেক্ষা করত। ঈদ আয়োজনের বিনোদনমূলক নানা আয়োজনের কথা আলোচনা করত নিজেদের মধ্যে। ঈদের নাটক যখন প্রচার হতো, তখন রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যেত। হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার ঘটনা নিয়মিতই ঘটাতেন এসব নাটকের দর্শকরা। টেলিভিশনের পাশাপাশি মানুষকে বিনোদিত করত রেডিও। সিনেমা মুক্তির আগে রেডিওতে প্রচার করা হতো সিনেমার দশ মিনিট ব্যাপ্তির বিজ্ঞাপন।

সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেই ভেসে আসত নাজমুল হুসাইন কিংবা মাজহারুল ইসলামের সেই ভরাট কণ্ঠ ‘হ্যাঁ ভাই, আসিতেছে…’। কোন ঈদে কটা সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে, কোন সিনেমায় কে কে অভিনয় করেছেন, সেটা মানুষ জানতে পারত রেডিও শুনে। আর নাজমুল হুসাইন, মাজহারুল ইসলামরা এমনভাবে সিনেমাগুলো সম্পর্কে বলতেন, দর্শকের আগ্রহ বেড়ে যেত বহুগুণে। ঈদের সিনেমার বিজ্ঞাপন তারা বানাতেন বিশেষ যত্ন নিয়ে। তাই যাদের সিনেমা হলে যাওয়ার সুযোগ হতো না, তারা শুধু রেডিওর বিজ্ঞাপন শুনেই পেয়ে যেতেন বিনোদনের খোরাক।

ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলোর গান বাজত ‘বাণিজ্যিক কার্যক্রম’-এর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। এসব গান শুধু শ্রোতাকে বিনোদিতই করত না, চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে যেত সিনেমা হলেও। কারণ যে গান তাদের কানকে প্রশান্তি দিয়েছে, তাদের বিশ্বাস ছিল সে গান তাদের চোখকেও প্রশান্তি দেবে। আর হতোও তাই। দেখা যেত গান জনপ্রিয় হলে সে গানের সিনেমাও সুপার-ডুপার হিট হয়ে যেত। ঈদ উপলক্ষে গ্রামে গ্রামে আয়োজন করা হতো ফুটবল ম্যাচ, নাটক আর যাত্রাপালার। এসব আয়োজন মানুষকে বিনোদন প্রদানের পাশাপাশি আবদ্ধ করত একই বন্ধনে।

ঈদকার্ডের মাধ্যমে একে অন্যকে শুভেচ্ছা জানানোর বিষয়টি ঠিক বিনোদনের পর্যায়ে না পড়লেও এটি ঈদের আনন্দকে রাঙিয়ে দিত বিশেষ রঙে। এ রঙ বন্ধুত্বের, এ রঙ ভালোবাসার। অতীত থেকে এবার চলে আসা যাক বর্তমানে। বর্তমানে ঈদ অতীতের চেয়েও জমজমাট, আনন্দঘন। কারণ এখন বেশিরভাগ মানুষেরই আয় বেড়েছে, চাইলেই ইচ্ছেমতো কেনাকাটা করতে পারছে, তাই ঈদটাও উদযাপন করছে হেসেখেলে। কিন্তু ঈদ বিনোদন বলতে যা বোঝায়, সেখানে এসেছে বিশাল এক পরিবর্তন। আগে ছিল দেশে একটামাত্র টিভি চ্যানেল। এখন ত্রিশটারও বেশি। তার আছে স্থানীয় ডিশ চ্যানেলগুলো।

সবাই সপ্তাহব্যাপী ঈদ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। কিন্তু কোনো আয়োজনের ওপরই কেন যেন আস্থা রাখতে পারছে না দর্শকরা। তারা সুযোগ পেলেই লাফ মারছেন ভিনদেশি চ্যানেলে। দেশীয় চ্যানেলের ঈদ আয়োজনের চেয়ে ভিনদেশি চ্যানেলের নিয়মিত আয়োজন তথা ‘সিরিয়াল’ তাদের বেশি বিনোদন দিচ্ছে। অবশ্য তাদের এই লাফের পেছনে অতিমাত্রার বিজ্ঞাপনটাও একটা বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। তবে কারণ যা-ই হোক, মানুষের টিভি-বিনোদনের উৎস এখন বদলে গেছে, এটাই মূল কথা। আর রেডিও? এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা তো জানেও না রেডিও দেখতে কেমন থাকে।

তারা রেডিও বলতে বোঝে এফএম রেডিওকে, যা চাইলেই শোনা যায় মোবাইল ফোনে। এখন ঈদে আর আগের মতো সিনেমা মুক্তি পায় না। আগে এক ঈদে আট-দশটা করে সিনেমা মুক্তি পেত। এখন হলে গিয়ে সিনেমা দেখার দর্শক কমে গেছে বলে এক ঈদে মুক্তি পায় সর্বোচ্চ চারটা সিনেমা। তাও ব্যবসাসফল হয় বড়জোর দুটো। আগে সিনেমা জিনিসটা ছিল টিভি দর্শকদের কাছে স্বপ্নের মতো। আর এখন এটি সবচেয়ে সহজলভ্য। কারণ বিটিভি আগে মাসে একটা সিনেমা দেখালেও এখন প্রায় সব চ্যানেলই দৈনিক একটা করে সিনেমা দেখায়। আর কোনো কোনো চ্যানেলে সারাদিনই চলতে থাকে সিনেমা। তাই রুপালি পর্দার মানুষগুলো দর্শকদের কাছে এখন আর স্বপ্নের মানুষ নন।

তাই হলে গিয়ে তাদের দেখতে সেভাবে আগ্রহও বোধ করেন না তারা। ঈদ আনন্দের বড় অংশজুড়ে ছিল যে ঈদকার্ড, সে ঈদকার্ড বিলুপ্ত হয়ে গেছে আরও আগেই। কিছুদিন আগেও মানুষ ঈদের শুভেচ্ছা জানাত মোবাইলে, এসএমএসের মাধ্যমে। এখন সে প্রচলনও চলে গেছে। এখন একজন আরেকজনকে ঈদের শুভেচ্ছা জানায় ফেসবুকের ইনবক্সে। আর রাজনৈতিক ব্যক্তিদের শুভেচ্ছা জানানোর প্রক্রিয়া আটকে গেছে ব্যানার আর পোস্টারে। শুধু শহর নয়, এসব ব্যানার আর পোস্টারে ছেয়ে গেছে গ্রামগঞ্জও। এক ব্যানারে বিশ-পঁচিশ জনের ছবি। মানুষ এসব দেখে বিনোদন (!) পায় বটে। ঈদ উপলক্ষে আগে গ্রামে গ্রামে ঐতিহ্যবাহী গানের আসর বসলেও এখন সেই ধারা থেমে গেছে।

বাউল গান, গাজীর পালা, বিচ্ছেদ গান এসব গানের মাধ্যমে বিনোদিত হওয়ার কথা চিন্তাও করে না বর্তমান প্রজন্ম। কোনো কোনো গ্রামে হয়তো কনসার্টের আয়োজন করা হয়। যেখানে উপস্থিত থাকেন জনপ্রিয় কোনো শিল্পী। এই কনসার্ট পুরো এলাকার মানুষের সংগীতপিপাসা নিবারণ করলেও কোথায় যেন একটা অপূর্ণতা থেকে যায়। যে অপূর্ণতা ছড়িয়ে আছে বর্তমান সময়ের সামগ্রিক ঈদ বিনোদনে। আমরা চাই এই অপূর্ণতা দূর হোক। আমাদের ঈদ বিনোদন পরিপূর্ণ হয়ে উঠুক আগের মতো।

আমরা আবারও দল বেঁধে টেলিভিশনের সামনে বসতে চাই। দেখতে চাই দেশীয় সিনেমা, দেশীয় নাটক, দেশীয় গান। আর ঈদ মৌসুমের বিনোদনকে ধরে রাখতে চাই সারা বছর। হোক সেটি চায়ের কাপের আড্ডায়, আলোচনায় কিংবা নিতান্তই সুখস্মৃতিতে।

ইকবাল খন্দকার : কথাসাহিত্যিক ও টিভি উপস্থাপক

iqbalkhondokar@yahoo.com