ঈদ আনন্দ এখন বিনোদন কেন্দ্র ঘিরে

নিউজ ডেস্ক:  ঈদ পরবর্তী আনন্দ উপভোগে নগরবাসী ছুটছে শিশুপার্ক, চিড়িয়াখানা ও জাদুঘরে।

গত কয়েকদিনে প্রায় ৬ লাখের মতো নগরবাসীর সমাগম হয়েছে এসব বিনোদন কেন্দ্রে। ঈদের পর প্রথম শুক্রবার হিসেবে আজ ঈদ উদ্দীপনা যেন ভিন্নমাত্রা পেয়েছে এসব স্থানে।

ঈদ শেষ হয়েছে আজ চার দিন। এরই মধ্যে রাজধানীতে ফিরতে শুরু করেছে ঢাকার বাইরে ঈদ করতে যাওয়া কর্মজীবীরা। গত কয়েকদিনে ঢাকায় ঈদ করা নগরবাসী বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে উদ্দীপনায় মেতে ছিল। গত দুদিনে রাজধানীতে ফেরা মানুষগুলোও ছুটছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের দিন থেকে আজ শুক্রবার পর্যন্ত ৪ লাখের বেশি দর্শনার্থী ভিড় করেছে এসব স্থানে।

ব্যস্ত নগরজীবনের এই অবসরে সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থী ভিড় করেছে চিড়িয়াখানা ও শিশু পার্কে। এ ছাড়া জাতীয় জাদুঘর, ফ্যান্টাসি কিংডম, নন্দন পার্কসহ সব বিনোদন কেন্দ্র উৎসব প্রিয় বাঙালির পদচারনায় মুখর রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদ আনন্দে সবচেয়ে বেশি সমাগম হয় ঢাকা চিড়িয়াখানায়। এটি দেশের সবচেয়ে বড় পশু-পাখির রাজ্য। মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত প্রায় ৭৫ হেক্টর বিশাল এলাকাজুড়ে অবস্থিত এই অভয়াশ্রমে প্রায় ১৩৮ প্রজাতির ২ হাজার ৬২২টি প্রাণী ও পাখি রয়েছে। ঈদের ছুটিতে বহু মানুষ কৌতূহল নিয়ে এসব পশু পাখি দেখছেন। প্রতিদিনের মতোই সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকছে চিড়িয়াখানা।

চিড়িয়াখানার কিউরেটর এস এম নজরুল ইসলাম রাইজিংবিডিকে বলেন, ঈদ উপলক্ষে ঢাকাবাসীর একটি বড় স্রোত নামে চিড়িয়াখানায়। ঈদের দিন রাজধানীর সড়ক ফাঁকা থাকলেও মিরপুরে যানজট ছিল শুধুমাত্র চিড়িয়াখানার জন্য। ঈদের দিন এখানে দর্শনার্থী ছিল ১ লাখ ৫৩ হাজারের বেশি। দ্বিতীয় দিন ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার দর্শনার্থী।

চিড়িয়াখানার রেকর্ড থেকে জানা যায়, গত বছর ঈদের দিন শুক্রবার দর্শনার্থী ছিল ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি। দ্বিতীয় দিন শুক্রবার ছিল ১ লাখ ২০ হাজার দর্শনার্থী। শনিবার ১ লাখ ১০ লাখের কিছু বেশি মানুষ টিকিট কেটে প্রবেশ করেছে চিড়িয়াখানায়।

এবার ঈদের দিন থেকেই গতবারের তুলনায় বেশি মানুষ আসছে চিড়িয়াখানায়। চিড়িয়াখানার কিউরেটর ধারণা করেন, আজ শুক্রবার ২ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে সাধারণ দর্শনার্থীর সংখ্যা।

কিউরেটর এস এম নজরুল ইসলাম আশা প্রকাশ করেন, আগামী বছরগুলোতে চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীর সংখ্যা আরো বাড়বে। জাপান সরকারের জাপানের ‘গ্র্যান্ট অ্যাসিস্ট্যান্স ফর কালচারাল গ্রাসরুটস প্রজেক্টস’-এর অধীনে দেশটির অনুদানে এখানে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ফলে উন্নত অডিও-ভিজ্যুয়াল সুবিধা ব্যবহার করে জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী এবং পরিবেশ সম্পর্কিত বিষয়ে চিড়িয়াখানার দর্শনার্থী, শিক্ষার্থীরা ও গবেষকেরা উপকৃত হবে। দর্শনার্থীদের সংখ্যাও আরো বাড়বে।

চিড়িয়াখানার পর জনস্রোত থাকে শিশু পার্কের দিকে। আগত দর্শনার্থীদের মতে, শিশু পার্ক রাজধানীর একেবারে মধ্যখানে অবস্থিত, যাতায়াতে সুবিধা, খরচও কম। তা ছাড়া পরিবারের আনন্দ উদযাপিত হয় শিশুদের ঘিরেই। তাই সহজেই নগরবাসী আসছেন ঈদ উপলক্ষে।

শিশু পার্কের কর্মকর্তারা জানান, ঈদের প্রথম দিন থেকেই ভিড় করে আছে শিশু কিশোরেরা। মাত্র ১০টি রাইডে চড়তে আসছে শত শত শিশু।

নিয়ম অনুযায়ী, শিশু পার্ক সর্বসাধারণের জন্য অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত সোম থেকে শনিবার দুপুর ১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে এবং এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সোম থেকে শনিবার দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে, আর প্রতি বুধবার শুধুমাত্র গরিব শিশুদের জন্য খোলা থাকে। রোববার শিশু পার্ক বন্ধ থাকে। কিন্তু ঈদ উপলক্ষে সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকছে পার্ক।

শিশুপার্কে মোট ১০টি রাইড। রোমাঞ্চ চক্র, আনন্দ ঘূর্ণি, উড়ন্ত বিমান, উড়ন্ত নভোযান, ঝুলন্ত চেয়ার, লম্ফঝম্ফ, ব্যাটারি কার, এফ সিক্স জঙ্গি বিমান, রেলগাড়ি ও বিস্ময় চক্র নামের রাইডগুলো গত কয়েকদিনে কানায় কানায় পূর্ণ।

শিশু পার্ক পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নুরুজ্জামান রাইজিংবিডিকে বলেন, ঈদের দিন সোমবার এখানে প্রায় ৪৯ হাজার দর্শনার্থী প্রবেশ করেছে। দ্বিতীয় দিনে মঙ্গলবার ছিল প্রায় ৫৩ হাজার দর্শনার্থী। ঈদের প্রথম দু’দিনে লাখ ছাড়িয়ে গেছে দর্শনার্থীর সংখ্যা।

গত দুদিনে কিছুটা কম ছিল দর্শনার্থী, কিন্তু আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ১৫ হাজারের কাছাকাছি দর্শনার্থী এসেছে পার্কে। সারা দিনে এই সংখ্যা ৫০ হাজার অতিক্রম করতে পারে ধারণা করছেন এই কর্মকর্তা।

তিনি আরো জানান, গত বছরের তুলনায় এবার দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। গত বছর হলি আর্টিজানে হামলার কারণে মানুষ কিছুটা ঘরমুখো ছিল। কিন্তু এ বছর মানুষের মধ্যে উচ্ছ্বাস ফিরে এসেছে।

২০১৬ সালের ঈদ পরবর্তী দুদিনের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, গত বছর ঈদুল ফিতর ছিল বৃহস্পতিবার। সেদিন ৪৩ হাজার দর্শনার্থী প্রবেশ করে শিশু পার্কে। দ্বিতীয় দিনে শুক্রবার ছিল ৪৮ হাজার দর্শনার্থী। এবার দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে কয়েক হাজার।

শিশু পার্কের পাশেই শাহবাগে অবস্থিত জাতীয় জাদুঘরেও দর্শনার্থীদের সমাগম চোখে পড়ার মতো। এখানে মূলত স্কুল-কলেজে পড়ুয়া দর্শনার্থীদের সংখ্যা বেশি। গত চারদিনে এখানে আগত দর্শনার্থীর পরিসংখ্যানটি জানাতে পারেননি কর্মকর্তারা। রোববার নাগাদ এই রেকর্ড জানা যেতে পারে জানিয়ে কর্মকর্তারা বলেন, চারদিনে লাখের কাছাকাছি দর্শনার্থী এসেছে এখানে।

শ্যামলীর শিশু মেলা এখন পরিচালিত হচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীনে। কিন্তু শিশু কিশোরদের হৈ-হুল্লোড় গত বছরের তুলনায় একটুও কমেনি, বরং বেড়েছে। এখানে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্যারাট্রুপার, ভাইকিং বোট, রেসিং বাইকসহ বেশ কয়েকটা রাইড।

পুরনো ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনা লালবাগ কেল্লায়ও উপচে পড়া ভিড়। বিশেষ করে আশপাশ এলাকার মানুষ এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। রমনা, সোহরাওয়ার্দীসহ রাজধানীর পার্কগুলোতেও ভিড় করছেন নগরবাসী।

ঢাকার অদূরে অবস্থিত থিমপার্কগুলোতেও এখন ঢাকাবাসীর পদচারণা তুঙ্গে। আধুনিক এসব বিনোদন কেন্দ্রেও ঢল নেমেছে দর্শনার্থীদের। আশুলিয়ার ফ্যান্টাসি কিংডমের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকছে ফ্যান্টাসি কিংডম। এখানে বেশ কিছু আকর্ষণীয় রাইড আছে, যেগুলোর প্রতি দর্শনার্থীদের আগ্রহ বেশি। এগুলো হচ্ছে- ওয়েভপুল, লেজি রিভার, টিউব স্লাইড, ওয়াটারপুল।

ঈদের ছুটিতে অনেকেই ছুটে যাচ্ছেন সাভারের নন্দন পার্কে। পার্কের কর্মকর্তা আহমেদ জুবায়েদ জানান, ঈদের দিন সকাল থেকেই খোলা আছে পার্ক। এখানে একটি অংশ ওয়াটার ওয়ার্ল্ড। অন্যটি ড্রাই পার্ক। সর্বত্রই ঈদের আনন্দ। আর ঈদের পরদিন থেকে এখানে রয়েছে লাইভ মিউজিক, ডিজে, ড্যান্স শো। এসবে সাড়া মিলছে গত বছরের তুলনায় বেশি।

ফ্যান্টাসি কিংডমের পাশেই হেরিটেজ পার্ক। এখানে বেশি কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনার রেপ্লিকা রয়েছে। তবুও নিদর্শনগুলো আগ্রহ নিয়ে দেখছেন দর্শনার্থীরা। অনেকেই আবার জায়ান্ট ফেরিস হুইল, পাইরেট শিপ, ড্রাই স্লাইড, কফি কাপ, ব্যাটারি কার, ফ্যামিলি ট্রেনসহ বিভিন্ন রাইডে চড়ছেন।