হুমায়ুন আজাদের অগ্রন্থিত কবিতা ও গদ্য

পিয়াস মজিদ: হুমায়ুন আজাদ (১৯৪৭-২০০৪) বাংলা ভাষার অন্যতম বহুমাত্রিক কবি-লেখক। তাঁর কবিতা- কথাসাহিত্য- প্রবন্ধ নিবন্ধ- শিশুসাহিত্য ও ভাষা গবেষণা বাংলা সাহিত্যের পরিসরে যোগ করেছে নতুনতর মাত্রা। তবে তাঁর অনেক লেখাই এখন পর্যন্ত অগ্রন্থিত। ১৯৮৮ সালে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক প্রয়াত ফয়েজ আহমদ গ্রেফতার হলে তাঁর মুক্তির দাবিতে হুমায়ুন আজাদ রচিত কেন্দ্রীয় কারাগার শীর্ষক কবিতা এবং প্রয়াত সাহিত্যিক নাজমা জেসমিন চৌধুরী (১৯৪০-১৯৮৯) স্মারক প্রকাশনায় (সৈয়দ আবুল মকসুদ ও মুস্তাফা মজিদ সম্পাদিত, ১৯৯১) অন্তর্ভুক্ত নাজমা জেসমিন চৌধুরী শীর্ষক স্মৃতি ও বিশ্লেষণমূলক নিরূপম গদ্যটি এখন পর্যন্ত অগ্রন্থিত। তাঁর এই অগ্রন্থিত কবিতা ও গদ্যে স্বভাবসুলভ শিল্পিতার পাশাপাশি যোগ হয়েছে মানবিক অঙ্গীকার। বহুমাত্রিক হুমায়ুন আজাদের প্রতি আমাদের বিনীত শ্রদ্ধা।

কেন্দ্রীয় কারাগার
(ফয়েজ আহমদকে)
হুমায়ুন আজাদ

বাংলা, জানো কি তুমি—
তোমার সড়ক এখন বধ্যভূমি
তুমি পড়ে আছো দানবের পদতলে
যেদিকে তাকাই মনে হয় বারবার
সারাদেশ আজ কেন্দ্রীয় কারাগার
দিকে দিকে তাই ক্ষোভের আগুন জ্বলে
রক্তের শিখা আকাশ বাতাস চিরে
দানব দলকে ফেলবেই জানি ঘিরে
দশ দিগন্তে তারই প্রস্তুতি চলে।

****

নাজমা জেসমিন চৌধুরী
হুমায়ুন আজাদ

তাঁর সাথে দেখা হ’লে যে অনুভূতি হতো, তার নাম স্নিগ্ধতা। শহীদ মিনারের উত্তরে তাঁদের মনোরম দীর্ঘ ফ্ল্যাটটিতে যেতাম আমিও;- তিনি যখন এসে বসতেন ড্রয়িংরুমের সোফার কোণে, তখন চারপাশ স্নিগ্ধ হয়ে উঠত। তিনি ড্রয়িংরুমে সব সময় আসতেন না। আসতেন কখনো কখনো; কথা বলতেন খুবই কম, বলতেন নিম্নকণ্ঠে। ওই ড্রয়িংরুমটি হয়ে উঠতে পারত সাহিত্য-শিল্পকলার ড্রয়িংরুম, কারণ তাঁরা দু’জনেই ছিলেন সাহিত্যের, একজন ইংরেজির আরেকজন বাংলার; কিন্তু ওটি হয়ে উঠেছিল সমাজ-রাজনীতির আপন ড্রয়িংরুম। তবে ওই সমাজ-রাজনীতির অবকাঠামোতে ছিল সাহিত্য; ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সাহিত্য ছেড়ে যেতে যেতে জড়িয়ে থাকতেন সাহিত্যে; আর তিনি, ড. নাজমা জেসমিন চৌধুরী, সাহিত্যে থাকতে থাকতে চ’লে যেতেন সমাজ-রাজনীতিতে। ওই ফ্ল্যাটটিতে বাস করত বাংলাদেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বুর্জোয়া পরিবারটি, বাংলাদেশে এমন চমৎকার বুর্জোয়া পরিবার আর মিলবে না। বুর্জোয়া পরিবার আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে যদি সেটি চিন্তায় হয় মার্ক্সীয়। যে পরিবারের বাস্তব-অবাস্তব দু-ই বুর্জোয়া, সেটিকে মনে হয় ঘিনঘিনে, আর যে পরিবারের বাস্তব-অবাস্তব দু’ই মার্ক্সীয়, সেটিকে মনে হয় ভীতিকর। আকর্ষণীয় হচ্ছে সে- পরিবার, যার বাস্তবটি বুর্জোয়া আর অবাস্তবটি বা স্বপ্নটি মার্ক্সীয়। চৌধুরী পরিবারটি ছিল তাই; আর ওই পরিবারের স্নিগ্ধতা ছিলেন ড. নাজমা জেসমিন চৌধুরী, যিনি আজ নেই। কর্কশ পৃথিবী স্নিগ্ধতা বেশি দিন সহ্য করে না।

তবে তাঁর বাইরের স্নিগ্ধতার ভেতরে লুকিয়ে ছিল অগ্নি। তাঁর আচরণে আগুনের কোনো আভাস মিলত না, তাঁর লেখায়ও ছিল না লেলিহানতা; কিন্তু তাঁর লেখা ভেতর থেকে পোড়াত প্রথাকে, প্রথাগত সমাজকে। তিনি বহুমুখী ছিলেন : নাটক লিখেছেন, গল্প-উপন্যাস লিখেছেন, লিখেছেন প্রবন্ধ এবং গবেষণা করেছেন। তিনি নাটক লিখেছেন এবং কবিতা লেখেননি, এটা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। নাটক লেখা ও কবিতা না লেখা বোঝায় যে প্রথাগত নারী ছিলেন না তিনি বা তিনি নারীপুরুষের কৃত্রিম শ্রেণীকরণকেই অস্বীকার করেছিলেন। নাটকে নারী থাকে, তবে থাকে অভিনেত্রীরূপে- আকর্ষণীয় পুতুলরূপে, নারী সাধারণত নাট্যকার বা নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে না; আর নারী, আমাদের সমাজে, কিছু লিখলে লেখে কবিতাই। এতেই প্রকাশ পায় ড. নাজমা জেসমিন চৌধুরীর চরিত্র, তিনি নারী ছিলেন কিন্তু প্রথাগত নারী ছিলেন না; আবার ছিলেন না তিনি সম্পূর্ণ প্রথাবিরোধী। প্রথা ও বিদ্রোহের মধ্যে স্নিগ্ধ আপস করলে যার বিকাশ ঘটে, তাই ছিলেন তিনি। তিনি কি নারীবাদী ছিলেন? তিনি নারীবাদী ছিলেন, তবে প্রকাশ্যে বিদ্রোহে লিপ্ত হননি; তিনি তাঁর নারী চরিত্রগুলোকে পুরুষ ক’রে তোলার জন্য ব্যগ্র ছিলেন না, কিন্তু অটল ছিলেন তাঁদের মানুষরূপে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।

তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীল ও জ্ঞানমনষ্ক; তবে সৃষ্টিশীলতার এলাকাটি ছিল তাঁর গৌণ এলাকা, জ্ঞানই ছিল তাঁর মুখ্য এলাকা। তাঁর নাটক বা উপন্যাসের নাম ভুলে যাবে বাঙালি, কিন্তু একটি জ্ঞানমনষ্ক বই ড. নাজমা জেসমিন চৌধুরীকে অনেক দিন বাঁচিয়ে রাখবে : বইটি বাংলা উপন্যাস ও রাজনীতি। বাংলাদেশে সমালোচকের অভাব, নারীরা তো সমালোচনাকে ভয়ই পায়। আমাদের নারীরা যখন সমালোচনা জাতীয় কিছু লেখেন, তখন তাতে সমালোচককে ঢেকে ফেলে বড় হয়ে ওঠে নারীটি, কিন্তু ড. নাজমা জেসমিন চৌধুরী এ বইটি লিখেছেন গবেষক- সমালোচকরূপে, নারীরূপে নয়। তিনি এমন একটি বই লিখে গেছেন, যা তাঁকে জীবিতদের সঙ্গী ক’রে রাখবে অন্তত আরও পাঁচ দশক। এটি পিএইচডি অভিসন্দর্ভ ; কিন্তু এটি পেরিয়ে গেছে আমাদের অঞ্চলের সন্দর্ভের মলিন সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশে কয়েক দশক ধ’রে উৎপাদিত হচ্ছে মর্মস্পর্শী পিএইচডি সন্দর্ভমালা, যেগুলো লেখার জন্য মেধা তো লাগেই না, ভালোভাবে লেখাপড়া জানাও লাগে না। ওই গবেষণাপঙ্কস্তূপের মধ্যে ড. নাজমা জেসমিন চৌধুরীর বইটি পদ্মের মতো। বইটিতে প্রভাব পড়ছে ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর : ড. চৌধুরী যে- ধরনের সমাজতাত্ত্বিক সাহিত্য সমালোচনা লিখে যাচ্ছেন কয়েক দশক ধ’রে, কিন্তু নিজে যা কোনো ব্যাপক সম্পূর্ণ গ্রন্থে এখন প্রয়োগ করতে উৎসাহ বোধ করেননি, তা করেছেন ড. নাজমা জেসমিন চৌধুরী। ড. চৌধুরী তত্ত্ব, আর ড. নাজমা জেসমিন চৌধুরী বাস্তবায়ন। ড. চৌধুরী হয়তো কখনো এমন একটি সম্পূর্ণ বই লিখে উঠতে পারবেন না, কিন্তু যিনি লিখতে পেরেছেন তিনি চ’লে গেছেন। দুঃখ তিনি এতো তাড়াতাড়ি চ’লে গেছেন।

সংগ্রহ ও ভূমিকা : পিয়াস মজিদ