আমাদের সন্তান আমাদের দায়

রিফাত মুনীর ইতি:   ছেলেটা বেয়াড়া হয়ে উঠেছে। লেখাপড়ায় মন নেই, কারও কথা শুনছে না। প্রতিদিন নিত্যনতুন আবদার। আর সামলাতে পারছি না, কী করি?- এমনই অভিযোগ নিয়ে প্রতিদিন অন্তরে-বাইরে জর্জরিত হচ্ছি আমি, আমরা, এক কথায় দেশের সাধারণ অভিভাবকরা। কিন্তু কেন? যে প্রিয়তম সন্তানদের সুখ ও সর্বোত্তম সেবার কথা ভেবে আমাদের ঘুম নেই, সে কেন আমার, আপনার, আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে?

তার আগে পাঠক আসুন দেখি, আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি, যার আবহে বেড়ে উঠছে প্রজন্ম। একটা অস্থির সময় পার করছে যুবসমাজ। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, বেড়েছে চাহিদা। আজকের অভিভাবক হিমশিম খাচ্ছেন শিশুদের লালন-পালনে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর টিউশন ফি বাড়ছে, বাড়ছে কোচিং সেন্টারগুলোর বাড়তি ব্যয়, প্রযুক্তি ব্যবহারের যৌক্তিকতা দেখাতে হচ্ছে না। আজকের অভিভাবক নিজের হাজারো সমস্যা উপেক্ষা করে তথাকথিত সামাজিক স্ট্যাটাস বজায় রাখতে শিশুদের হাতে তুলে দিচ্ছেন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সব উপকরণ। আর শিশুটি বেড়ে উঠছে এক ধরনের প্রয়োজন ও চাহিদার বিভাজন অক্ষম পরিবেশে। দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রযুক্তির অপব্যবহার কোমলমতি শিশু-কিশোরদের অপরাধপ্রবণ করে তুলেছে। বিকৃত, কুরুচিপূর্ণ মানসিকতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে। যেহেতু অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণহীন, তাই মুক্ত পরিবেশে আমার, আপনার, আমাদের সন্তানরা তা ব্যবহার করা শিখে গেছে।

আসুন দেখি একটা পরিবারের চিত্র। আমরা যতই মুখে ভালো ভালো বুলি আওড়াই না কেন, বাস্তবে সন্তান লালন-পালনে তার ছিটেফোঁটাও ব্যবহার করি না। একটি শিশু বেড়ে ওঠে তার বাবা-মাসহ পরিবারের আর পাঁচজন সদস্যকে দেখে। যে বাবা আজ ঘরে তার স্ত্রীকে সম্মান দেন না, প্রতিপদে সন্দেহের তীরে বিদ্ধ করেন, সেই সন্তান সম্মান কী জিনিস তা আদৌ উপলব্ধি করতে পারবে কি? পারিবারিক পর্যায়ে একটি শিশুকে নৈতিকতা শিক্ষার প্রথম ধাপ সততা শেখানো। কিন্তু আমার, আপনার, আমাদের উপার্জিত অর্থ যে কষ্টার্জিত, তা বোঝাতে ব্যর্থ হয়েই তো চাহিদার আকাশচুম্বী অট্টালিকায় অজান্তে চড়ে বসতে দিচ্ছি সন্তানদের। যখন যা চাচ্ছে তা মুখের সামনে হাজির না করতে পারলে অভিভাবকদেরই শান্তি নেই, সন্তানের দোষ দেব কী? একটু খেয়াল করে দেখুন, পরিবারের নারী সদস্যদের অবস্থান। লোভ, পরশ্রীকাতরতা, হিংসা আর বাহ্যিক লোক দেখানো প্রদর্শনীতে এরা সবসময় এগিয়ে। প্রয়োজনহীন বিলাসী দ্রব্য কেনার উৎসব যখন আমি বা আপনি, আমাদের সন্তানদের সামনে করি, তখন সে কি আদৌ আমাদের আয়ের উৎস নিয়ে ভাবার সময় পায়? কিংবা তাকে সেই সুযোগ কি আমরা দিই?

আমি, আপনি, আমরা সবাই শুধু মৌখিকভাবে তাদের বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করি। ফলে তারা আমাদের বিশ্বাস করে না। এমন কিছু আমাদের কাছে লুকিয়ে রাখে, যা পরে প্রকাশ পেলে ভয়ঙ্কর মনে হয় আমাদের কাছে। নিজেদের তৈরি করা যে দূরত্বের দেয়াল, তা দূর করার জন্য ব্যক্তিগত অহমিকা, ইগো আর নিজের গাম্ভীর্যের খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসতে হবে- এটা সবাই জানি, বুঝি; অথচ বাস্তবে তার প্রয়োগ কোথায়?

এভাবেই আস্তে আস্তে আমরা হারিয়ে ফেলি আমাদের শিশুদের। আমাদের অজান্তেই এসব সন্তানের মাঝে বেড়ে ওঠে ঐশী। এরাই প্রশিক্ষণ নিয়ে নানা জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিবার সমাজ দেশের জন্য কলঙ্কময় এক কাহিনীর রচয়িতা হয়ে যায়।

কিন্তু সময় ফুরিয়ে যায়নি। এখনও আপনার, আমার, আমাদের সন্তানদের আসুন ঢেকে নিই মানবিক চাদরে; সুস্থ, সুন্দর, মননশীলতা চর্চার মাধ্যমে প্রজন্ম বেড়ে উঠুক অপার সৌন্দর্য ভাবনার নিরঙ্কুশ স্বাধীনতায়।