প্রকৃতি: কবি নজরুলের পুষ্পকথা

মোকারম হোসেন: কবি নজরুলের পুষ্পকথা
নজরুল বিদ্রোহী কবিতায় লিখেছেন—

‘আমি দুর্বার

আমি ভেঙে করি সব চুরমার!

আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,…’

কিন্তু তাঁর এই দ্রোহের আড়ালে আছে দরদমাখানো নরম-নিসর্গের আলাপচারিতা। আছে নন্দনকানন থেকে পারিজাতকে পাওয়ার বাসনা। তাই তিনি বইয়ের নামকরণে বেছে নিয়েছেন অনবদ্য পুষ্পরাজি। দোলনচাঁপা, ঝিঙেফুল, ফণীমনসা, রাঙা-জবা, মহুয়া—আরো কত নাম। এসব পুষ্পসৌরভ তাঁর রচনাকে সুরভিত করেছে বার বার। তাঁর রচনাসম্ভারে নানাভাবে পুষ্প-বৃক্ষের প্রসঙ্গ এসেছে। কখনো উপমায়, কখনো সরাসরি। যেমন—নার্গিস কখনো প্রিয়তমা, কখনো ফুল হিসেবে এসেছে। তিনি গেয়েছেন—

‘বুলবুলি নীরব নার্গিস-বনে

ঝরা বন-গোলাপের বিলাপ শোনে’

নার্গিস মূলত ফুলের নাম। আমাদের দেশে গুলনার্গিস নামে একটি কন্দজ ফুল আছে। সেটি নজরুলের সেই নার্গিস নয় বলেই মনে করা হয়। তবে এ উপমহাদেশে নার্গিসের আগমন ও কদর সম্ভবত মোগলদের হাত ধরে। যা পৃথিবীজুড়ে নার্সিসাস নামেই বেশি পরিচিত। জানামতে আমাদের দেশে এ ফুল চাষ হয় না।

তিনি গভীর ভাবনা-বোধ থেকে কোনো রূপসী নারীর পরনে পুষ্পালঙ্কার দেখেছেন, দেখেছেন কানে অর্জুনের ফুল আর গলায় কদমফুলের মালা—

‘অর্জুন মঞ্জরী কর্ণে

গলে নীপ-মালিকা’

অর্জুনকে বলা হয় নিগৃহীত সুন্দর। ওষুধিগুণ থাকায় অর্জুনের বাকল তুলে নেবার কারণে গাছটি শ্রীহীন হয়ে-পড়ায় এমন নামকরণ। অর্জুনের ফল দেখতে কামরাঙ্গার মতো। কবিতায় উল্লিখিত ‘নীপ’ মানে আমাদের বহুল পরিচিত কদম।

বাংলার অবহেলিত বুনোফুলও তাঁর কবিতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তিনি ফুলকে মেখলা সাজিয়ে দেখতেই বেশি আনন্দ পান। বাবলা ফুলের নাকচাবি আর নীল অপরাজিতার শাড়ি তাই উপমায় মূর্ত হয়ে ওঠে।

‘বাবলা ফুলের নাকচাবি তার

গায়ে শাড়ি নীল অপরাজিতার

চলেছি সই অজানিতার

উদাস পরশ পেতে।’

আবার খোঁপায় পরিয়েছেন অবহেলিত ধুতরা ফুল। ধুতরা ফুলের সৌন্দর্যও তিনি উপেক্ষা করতে পারেননি। তিনি গান বেঁধেছেন—

‘কে দিল খোঁপাতে ধুতুরা ফুল লো।

খোঁপা খুলে কেশ হ’ল বাউল লো’

কোনো এক অভিসারের পথে কবি তাঁর প্রিয়তমার জন্য পুষ্পার্ঘ্য কামনা করেছেন। তিনি চেয়েছেন তাঁর মানসপ্রিয়া হেঁটে আসুক পুষ্পবিছানো পথ ধরে।

‘দিও ফুলদল বিছায়ে পথে বধূর আমার

পায়ে পায়ে দলি ঝরা সে ফুলদল

আজি তার অভিসার।’

আমাদের প্রিয় দুটি ফল আম এবং গোলাপজামের প্রসঙ্গও রয়েছে নজরুলের কবিতায়। আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল হলেও জনপ্রিয়তার দিক থেকে সম্ভবত আমই এগিয়ে আছে। গোলাপজামের ফুল যেমন সুদৃশ্য ফলও বেশ স্বাদু এবং সুগন্ধি। আবার আমের বউলও কিন্তু সৌন্দর্য এবং সুবাসে কম যায় না।

‘বউল ঝরে ফলেছে আজ থোলা থোলা আম

রসের পীড়ায় টসটসে বুক ঝরছে গোলাব জাম’

সাতভাই চম্পার পারুল কিন্তু একটি দুর্লভ ফুলের নাম। এই বিখ্যাত এবং দুর্লভ ফুলটি নিয়ে তিনি কাব্য করেছেন। রবীন্দ্রনাথও তাঁর রচনায় পারুলের প্রসঙ্গ এনেছেন অনেকবার।

‘সাতভাই চম্পা জাগরে

কেন বোন পারুল ডাক রে’

নজরুল কিশোরী রাধার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বলেছেন—

‘তুমি অপরাজিতার সুনীল মাধুরী

দু চোখ আনিলে করিয়া কি চুরি?

তোমার নাগকেশরের ফণী- ঘেরা মউ

পান করাল কে কিশোরী?’

উল্লিখিত পঙিক্তমালায় কবি অপরাজিতা এবং নাগেশ্বরের কথা বলেছেন। নীল, সাদা এবং বেগুনি রঙের অপরাজিতা মূলত বর্ষজীবী লতানো গাছ। এর মধ্যে নীলঅপরাজিতাই বিখ্যাত। আর নাগেশ্বর এই অঞ্চলের প্রাচীন ফুল। আমাদের কাব্য-কলা-উপমায় এর প্রসঙ্গ এসেছে বার বার।

খানিক স্পর্শে নুয়েপড়া লজ্জাবতীও কবির দৃষ্টি এড়ায়নি। তিনি লিখেছেন—

‘লজ্জাবতীর লুলিত লতায়

শিহর লাগে পুলক-ব্যথায়

মালিকা সম বধূরে জড়ায়

বালিকা-বধূ সুখ-স্বপনে’

নজরুল অসংখ্য গানে পুষ্প-বৃক্ষের কথা বলেছেন। বলেছেন তাদের রূপ-মাধুরীর কথা। তিনি গেয়েছেন—

‘পরো কুন্তলে, ধরো অঞ্চলে

অমলিন প্রেম-পারিজাত।’

এই পারিজাত মানে মান্দার। স্বর্গীয় ফুল। অন্যত্র তারই ব্যবহার লক্ষ করা যায়—

‘আনো নন্দন হতে পারিজাত কেশর

তীর্থ-সলিল আনো ভরি’ মঙ্গল-হেম-ঝারি’

অশোকের বর্ণাঢ্য রঙের কথা পাওয়া যাবে এখানে—

‘অশোক ফুটেছে যেন পুঞ্জে পুঞ্জে

রং পিয়াসী মন-ভ্রমর গুঞ্জে,

ঢালো আরো ঢালো রং প্রেম-যমুনাতে।’

নজরুল তাঁর লেখনীতে তুলে এনেছেন আমাদের চারপাশের সমস্ত চেনা ফুলগুলো। যেসব ফুলের সঙ্গে আমাদের প্রায় প্রতিদিনই দেখা হয়। যেমন—চামেলি, জুঁই, শিউলি, চাঁপা, মালতী, টগর, বকুল, বেলি, শাপলা, পদ্ম, বৈঁচি, পলাশ, কেয়া, হাসনাহেনা ইত্যাদি। এখানে প্রাসঙ্গিক কিছু পঙিক্ত ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো।

‘চামেলী কদম যূঁথী মুঠি মুঠি ছড়ায়ে

উতল পবন দে অঞ্চল উড়ায়ে।’

চামেলী কাষ্ঠললতার হালকা গড়নের চিরসবুজ গাছ। বেশ দুষ্প্রাপ্য। পাতা বিপ্রতীপভাবে ছোট কাণ্ডের দু দিকে সমান্তরালভাবে বিন্যস্ত। ফুল ফোটে গ্রীষ্ম-বর্ষায়, রঙ সাদা, সুগন্ধি, পাপড়িসংখ্যা ৫ বা ততোধিক। আকারে জুঁই ফুলের চেয়ে বড়। গাছ ছেঁটে ঝোপও বানান যায়। বংশবৃদ্ধি বীজ ও কলমে। মধ্যপ্রাচ্য, ভারত ও মায়ানমারে সহজলভ্য। জুঁই বা যূথী বহুবর্ষজীবী শক্ত লতার গাছ। ফুল সাদা ও সুগন্ধি। আকারে ছোট এবং বেলি ফুলের চেয়ে পাপড়ি কম। বসন্ত থেকে বর্ষা অবধি ছোট থোকায় ধবধবে সাদা ফুল ফোটে। আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টিতে কদম ফোটে। ছোট ডালের আগায় একক কলি আসে গোল হয়ে। ফুল বেশ কোমল ও সুগন্ধি। একটি পূর্ণ মঞ্জরিকে একটি ফুল বলেই মনে হয়, রঙ সাদা-হলুদ মেশানো। গাছ দীর্ঘাকৃতির। পাতা বিরাট ও ডিম্বাকৃতি, শীতে ঝরে যায়। বর্ষার আগে পরেও কদম ফুটতে দেখা যায়।

‘তোমার অশ্রু জলে শিউলি-তলে সিক্ত শরতে,

হিমানীর পরশ বুলাও ঘুম ভেঙে দাও দ্বার যদি রোধি।’

শিউলি বা শেফালি ছোট আকারের গাছ। কচি ডাল চৌকা ধরনের। খসখসে পাতাগুলো ডালের দু পাশে বিপ্রতীপভাবে বিন্যস্ত। ফুল সুগন্ধি, ১ সেন্টিমিটার লম্বা সোনালি লাল বোঁটার আগায় সাদা পাপড়ি। শরত্-সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে ফুল ফোটে, ঝরে পড়ে সূর্য ওঠার আগেই। পাতা ও বাকল বিভিন্ন রোগের মহৌষধ।

‘কে নিবি ফুল কে নিবি ফুল

টগর যূথী বেলা মালতী

চাঁপা গোলাব বকুল।

নার্গিস ইরানী গুল’

টগর চকচকে সবুজ পাতার কোলে দুধ-সাদা ফুল। শীত ছাড়া প্রায় সারা বছরই ফোটে। পাপড়ি ৫টি। ফুলের আকার ৩-৫ সেমি চওড়া, গন্ধহীন। দলনলের আগায় পাপড়ি চ্যাপ্টা। চিরসবুজ ঝোপাল গাছ, দুধকষ ভরা। চাঁপা বা স্বর্ণচাঁপার কাণ্ড সরল, উন্নত, মসৃণ এবং ধূসর। পাতা চ্যাপ্টা, উজ্জ্বল-সবুজ, একান্তরে ঘনবদ্ধ। ফুল একক, ম্লান-হলুদ, রক্তিম কিংবা প্রায় সাদা। সাদা রঙের ফুলও আছে। তীব্র সুগন্ধি। পাপড়িসংখ্যা প্রায় ১৫। গ্রীষ্মের প্রথমভাগ থেকে বর্ষা-শরত্ অবধি ফুল থাকে। ফুল শেষ হলে গুচ্ছবদ্ধ ফল ধরে। কাষ্ঠললতার গাছ। বহুবর্ষজীবী। বয়স্ক অবস্থায় বৃহদাকৃতির। পাতা আয়তাকার, ৮ সেমি লম্বা, বোঁটা ও শিরা লালচে-বেগুনি। বেগুনি শিরার পাতাগুলো বেশ সুদৃশ্য। ফুল সাদা, সুগন্ধি, গড়নের দিক থেকে অনেকটা শিউলি ফুলের মতো, পাপড়ি মোড়ানো। প্রধান প্রস্ফুটনকাল বর্ষা।

‘মধুপ গুঞ্জরে মালতী-বিতানে,

নূপুর-গুঞ্জরণ নাহি শুনি কানে,

মোর মন—মধুবনে মধুপ কানু কই—’

‘বনে মোর ফুটেছে হেনা চামেলি

যূথী বেলি।’

হেনা বা হাসনাহেনা সুগন্ধের জন্য বিখ্যাত। শক্ত লতান ঝোপাল ধরনের গাছ, ডালের গায়ে অজস্র সাদা সাদা তিল। পাতা লম্বাটে, সাড়ে চার সেমি লম্বা ও মসৃণ। বছরে কয়েকবার ফুল ফোটে। বেশি ফোটে গ্রীষ্ম ও বর্ষায়। পাতার গোড়া বা ডালের আগায় ফুলের ছোট ছোট থোকা, সন্ধ্যায় ফোটে। ফুল সবুজাভ সাদা, নলাকার, ২ সেমি লম্বা। পরিপক্ক ফল গোল, মাখনসাদা। বেলি ছোট ঝোপাল ধরনের গাছ। কচি ডাল রোমশ, পাতা একক, ডিম্বাকার, গাঢ়-সবুজ। সাদা রঙের গুচ্ছবদ্ধ সুগন্ধি ফুলগুলো ফোটে গ্রীষ্ম ও বর্ষায়। সুগন্ধের জন্য সারা বিশ্বেই বেশ জনপ্রিয়।

‘(সে) বলেছিল ডাগর হবে টগর-চারা যবে

লুকিয়ে এসে আমার হাতে বৈঁচি-মালা লবে (লো)।

আজ টগর গাছে ফুল ফুটেছে

ফাগুন মাসের চাঁদ উঠেছে,

আঙিনাতে ফুল ছড়িয়ে কাঁদে পলাশ শাখা (লো)’

পলাশ মাঝারি আকারের পাতাঝরা গাছ। কাণ্ড বহু শাখাপ্রশাখায় বিভক্ত, আঁকা-বাঁকা ও গাঁটযুক্ত। পাতার রঙ গাঢ়-সবুজ, যৌগিক ও তিনটি পত্রের সমাহার। শীতে পাতা ঝরে। বসন্তকালে ফুল-কলিরা রক্তিম পাখনা মেলে। ফুলের পরপরই কাঁচা সবুজ রঙের পাতায় ভরে ওঠে ডালপালা। পলাশফুল কাঁকড়ার পাঞ্জার মতো দ্বিধাবিভক্ত। পাঁচটি মুক্ত পাপড়ি, রঙ গাঢ়-কমলা কিংবা হলুদ-সোনালি রঙের।

‘রিমি ঝিম রিমি ঝিম ঐ নামিল দেয়া।

শুনি শিহরে কদম, বিদরে কেয়া

ঝিলে শাপলা কমল

ওই মেলিল দল,

মেঘ-অন্ধ গগন, বন্ধ খেয়া’

কেয়া বর্ষার রানি। ফুলের গন্ধ গভীর ও মাদকতাপূর্ণ, মধু নেই, আছে কাঁটায় ভরা রাশি রাশি লম্বা পাতা। পুরুষ কেয়া সাদা, স্ত্রী কেয়ার রঙ সোনালি। গাছ ১০-১৫ ফুট উঁচু হতে পারে। ফল গুচ্ছবদ্ধ, ছোট, পাকলে হলুদ বা লাল। শাপলা আমাদের জাতীয় ফুল। গাছের গোড়ার অংশ পানির নিচের কাদায় শক্তভাবে শিকড়ে আটকানো থাকে। বড়, গোল বা তাম্বুলাকার, কালচে সবুজ পাতার মধ্যে একটি-দুটি করে ফুল ফোটে। রঙ সাদা এবং মাঝখানে হলুদ পরাগস্তবক। পাপড়িসংখ্যা অনেক, হালকা সুগন্ধি। ফুল ফোটে বর্ষা-হেমন্তে।

ছবি : মোকারম হোসেন