রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন চ্যালেঞ্জ

নিউজ ডেস্ক: রপ্তানি আয়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয় না। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য রপ্তানি আয় বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে আরো অনেক আগেই। এ জন্য নানা ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে গার্মেন্টস খাতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ব্যাপারে অনেকটাই আশাবাদী ছিলেন সবাই। কিন্তু বাস্তবতা হলো ভিন্ন। গার্মেন্টস খাতে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি হলেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হচ্ছে না।

এটা দেশের অর্থনীতির জন্য এক ধরনের ধাক্কা। দেশের রপ্তানি আয় ক্রমেই নেতিবাচক দিকে ধাবিত হচ্ছে। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরের রপ্তানি আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা অর্জন এখন অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার বলে অভিহিত করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একেবারে শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেলেও বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের প্রত্যাশিত গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০২১ সালের মধ্যে ৬০ বিলিয়ন ডলারের যে রপ্তানি আয়ের রূপকল্প প্রদান করা হয়েছে তা স্রেফ কল্পনাতেই রয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে চলতি অর্থবছরের শেষ ১১ মাসে অর্থাত্ ২০১৬-১৭-এর জুলাই থেকে মে সময়ে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হলেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। এ সময়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ। আয় হয়েছে ৩ হাজার ১৭৯ কোটি ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ কম। আর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৩৩৫ কোটি ডলার।

চলতি জুন মাসে যে পরিমাণ রপ্তানি আয় হবে তা দিয়ে পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ঘাটতি অতিক্রম করা একেবারেই অসম্ভব। কারণ এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য জুন মাসে রপ্তানি আয় করতে হবে ৫২১ কোটি ডলার। অথচ গত ১১ মাসের গড় আয় হয়েছে ২৮৯ কোটি ডলার। গড় আয় হিসেবে চলতি মাসের অর্থাত্ জুন মাসের রপ্তানি ভালো থাকলেও চলতি অর্থবছরের সাময়িক লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ঘাটতি যাবে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের বেশি।

দেশের প্রধান রপ্তানি আয় তৈরি পোশাক খাত থেকেই আসে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে গত ১১ মাসে এ খাতে ২ দশমিক ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়নি। গত ১১ মাসে মোট আয় হয়েছে ২ হাজার ৫৬২ কোটি ডলার। আর রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৭৩৮ কোটি ডলার। এ আয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত গত ৩৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন সময় অতিক্রম করছে বলা যায়। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সক্ষমতা হারাচ্ছে বাংলাদেশ। এতে রপ্তানি আয়ে ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। তবে নিট পোশাকে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা থাকায় এ খাতে রপ্তানি আয় এখনো অনেকটা ভালো। গত কয়েক মাসের পরিসংখ্যান অনুসারে দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক দিকেই যাচ্ছে।

অন্যদিকে দ্বিতীয় শীর্ষ রপ্তানি খাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে ১১২ কোটি ডলারের রপ্তানি আয় হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ। অন্যান্য খাতে রপ্তানি বাড়ানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান অবস্থায় রপ্তানি পণ্যে বহুমুখীকরণসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি পণ্যের নতুন বাজার সৃষ্টির উদ্যোগ এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে অব্যাহতভাবে রপ্তানি পণ্যের দাম কমতে থাকায় নতুন বাজারে পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে উদ্যোক্তারা।

এ ছাড়া নতুন বাজারে সরকার ৩ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার ফলে চীন, ভারত এবং রাশিয়ার মতো দেশগুলোতে রপ্তানি আয় বাড়ছে। রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে গত জুলাই-মে মেয়াদে দেশটিতে ২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার অর্থাত্ ১ হাজার ৯৭৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকার পণ্য রপ্তানি করা হয়, যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেশি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রাশিয়ায় মোট ৩১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ।

এর মধ্যে ওই বছরের জুলাই-মে মেয়াদে চীনে পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের আয় হয়েছিল ২৮ কোটি ২৫ লাখ ১০ হাজার ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জুলাই-মে মেয়াদে চীনে ৮৮ কোটি ১৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার অর্থাত্ ৭ হাজার ১১১ কোটি ৫১ লাখ টাকার পণ্য রপ্তানি করা হয়, যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেড়েছে।

প্রচলিত বাজারগুলোয় তৈরি পোশাকের অব্যাহত দরপতন হচ্ছে। এ অবস্থায় দেশের রপ্তানিকারকরা নিরুপায় হয়ে নতুন বাজারের সন্ধানে জোর দিচ্ছেন। ফলে রাশিয়া, ভারত এবং চীনের মতো বাজারগুলোয় সম্প্রতি দেশের রপ্তানি আয় বেড়েছে। তবে নতুন বাজারে সরকারের দেওয়া ৩ শতাংশ প্রণোদনা উদ্যোক্তাদের জন্য বেশ সহায়ক হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি সিদ্ধান্তের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ থেকে আকাশপথে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বেশ বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।

আকাশপথে কোনো রপ্তানি পণ্য ইউরোপের ২৮টি দেশে ঢুকতে পারবে না, বাংলাদেশের পণ্যবাহী কার্গো অন্য কোনো দেশের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিরাপদ বলে প্রমাণিত হওয়ার পর গন্তব্যের দেশে ঢুকতে পারবে। আকাশপথে রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে তার প্রভাবে বছরে ৩০ হাজার ৪০০ কোটি টাকার রপ্তানি বাণিজ্য ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

রপ্তানি বাণিজ্যের ক্রমহ্রাসমান প্রবৃদ্ধি যেমন সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। রপ্তানি বাণিজ্যে সৃষ্ট নেতিবাচক প্রভাব থেকে বের হয়ে আসার জন্য তৈরি পোশাক ছাড়াও অন্য প্রধান রপ্তানি পণ্যে সরকারি প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া পুরনো বিদ্যমান বাজারে নিজেদের রপ্তানি বাণিজ্যিকে সীমাবদ্ধ না রেখে নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করে সেখানে রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখন প্রয়োজন সময়োপযোগী কৌশল। যার প্রয়োগে সংকট উত্তরনের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।