ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানোন্নয়ন ও ‘মানতা’ জীবনগাথা

সৈয়দ ফারুক হোসেন:  দেশের কোনো অঞ্চলের মানুষ উপেক্ষিত থাকবে না বলে মে মাসে এক অনুষ্ঠানে আশ্বাস দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘ক্ষুুদ্র নৃগোষ্ঠীর যারা পিছিয়ে আছেন, শিক্ষা-দীক্ষা ও আর্থ-সামাজিকভাবে যাতে তারা উন্নত হতে পারেন, সেই উদ্যোগটা আমরা হাতে নিয়েছি।’ ওই অনুষ্ঠানে ক্ষুুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও এ জনপদে ক্ষুদ্র পেশাজীবী গোষ্ঠী এবং আদিবাসী রয়েছে, যাদের সংস্কৃতি ও জীবনধারা বৈচিত্র্যপূর্ণ। দেশের প্রায় ৫৫টি জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বসবাস করছে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সাদৃশ্য নিতান্তই কম। যারা সারা বছর জলে বাস করে এবং যারা অবহেলিত ও উপেক্ষিত, এমনই একটি ক্ষুুদ্র নৃগোষ্ঠীর নাম ‘মানতা’। ‘মানতা’ নামকরণ নিয়েও সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন বিভ্রান্তি। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ‘এরা আরাকান রাজ্যের মনতং আদিবাসী গোত্রের দেশত্যাগী অংশ। তাই এরা নিজেদের মনতং বলে পরিচয় দিতে বেশি আগ্রহী।’ ‘মনতং’ শব্দ থেকে ‘মানতা’ শব্দের উৎপত্তি হতে পারে বলে অনেকে ধারণা করছেন। তবে ‘মীন’ থেকে ‘মানতা’ শব্দের উৎপত্তি হতে পারে_ এ ধারণা অনেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য।

মানতা সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনের আখ্যান নিয়ে ইতিপূর্বে আর লেখালেখি হয়নি। এদের নিয়ে হয়নি কোনো গবেষণা। এ সম্প্রদায়ের ইতিহাসের পাতা রয়ে গেছে অনন্মোচিত। ফলে এদের কঠোর জীবন-সংগ্রামের চিত্রসহ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দিকগুলো রয়ে গেছে অজানা। সামাজিক-রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন এবং সুশীল সমাজ পর্যন্ত সবাই এ সম্প্রদায় সম্পর্কে অজ্ঞ। উপকূলের জেলে সম্প্রদায় নিয়ে যদিও এ যাবৎ কমবেশি লেখালেখি, সমীক্ষা হয়েছে, উন্নয়ন পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে; আলোর নিচে অন্ধকারের মতো মানতা সম্প্রদায় রয়ে গেছে দেশবাসীর জানার বাইরে। এ সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক দুরবস্থা আজ চরমে। শিক্ষা ও সচেতনতার অভাব এদের পঙ্গু করে রেখেছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি থেকেও এরা বিচ্ছিন্ন।

স্থানীয় সরকার ও প্রশাসন থেকে মিলছে না সহানুভূতি। তাদের নেই ভূমির অধিকার, নেই নূ্যনতম সামাজিক নিরাপত্তা। এসব কারণেই মানতা সম্প্রদায়ের জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে চলছে প্রবল সংকট। এদের নৃতাত্তি্বক পরিচয় ও সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তির পথে। নানা সমস্যা এদেরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। মানতারা এ ভূখণ্ডের কয়েকশ’ বছরের পুরনো বাসিন্দা হলেও এদের আজও নেই কোনো নাগরিক অধিকার। নাগরিক পরিচয়ের সংকট এদের প্রবল। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য, নাগরিক অধিকারের অন্যতম ভিত্তি ভোটাধিকার থেকে মানতা সম্প্রদায় প্রায় পুরোপুরি বঞ্চিত।

মূল ভূমি কিংবা ডাঙায় কোনো স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় এরা কোনো ধরনের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে না। কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অন্য কোনো কারণে যারা নৌকাসহ সহায়-সম্পদ হারিয়ে শহর-বন্দর-গ্রামে বস্তিবাসী হয়, তাদেরই একাংশের নাম ভোটার তালিকায় স্থান পায়। এর বেশি কিছু নয়। যারা নৌকায় থাকে তাদেরকে আদমশুমারিতেও গণনার আওতায় আনা হয় না। জন্মনিবন্ধনসহ সব সুযোগ-সুবিধা থেকে এরা বঞ্চিত। এরা সরকারি-বেসরকারি কোনো পর্যায় থেকেই উন্নয়নের সামান্যতম ছোঁয়া পায় না। প্রশাসন কিংবা স্থানীয় সরকার কাঠামো সম্পর্কে এদের কোনো ধারণা নেই। ব্যাংক থেকে এরা পায় না ঋণ; সরকারি স্বাস্থ্যসেবা থেকেও হয় বঞ্চিত।

শিশুদের স্কুলে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জন্মনিয়ন্ত্রণে এদের কোনো আগ্রহ নেই। এ ছাড়া স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় এবং ভূমি সমস্যার কারণে এ সম্প্রদায়ের মানুষ মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়েও এরা মূল ভূমিতে আশ্রয় নিতে পারে না।

মানতা সম্প্রদায়েরও রয়েছে বৈচিত্র্যময় জীবনধারা। এ সম্প্রদায়টি পিতৃতান্ত্রিক হলেও সংসার জীবনে নারীর ভূমিকা ব্যাপক। এখানে নারী চুল বাঁধে, পুতুল নিয়ে খেলা করে, রান্না করে, সন্তান জন্ম দেয়, স্বামী-সন্তান ও পরিজনের যত্ন নেয়। এরা শক্ত হাতে নৌকার হাল ধরে, ঝড়-তুফানে নদী পাড়ি দেয়, জালের রশি কাঁধে নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে যায়। বড়শিতে খাবার গাঁথে, মাছ ধরে। সে মাছ নিজ হাতে বাজারে বিক্রি করে। অর্থাৎ সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু নারী।

জীবনযুদ্ধের মাঝেও মানতা সম্প্রদায়ের মানুষ হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনায় বেঁচে থাকে। অবসরে নৌকায় বসে গানের আসর। এরা ধর্মে মুসলমান, হিন্দু ও বৌদ্ধ। মানতাদের মধ্যে প্রচলিত আছে বহু সংস্কার। এরা আজও দিন-ক্ষণ-তিথি দেখে চলাফেরা করার চেষ্টা করে। মূল ভূমির মানুষের সঙ্গে বিরোধ এড়িয়ে নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকে। পোশাক-পরিচ্ছদে বাঙালিত্বের ছাপ থাকলেও প্রায় প্রত্যেক পুরুষের কোমরে থাকে গামছা। এরা নৌকায় ঘর-সংসার করে, ঘুরে বেড়ায়। মাছ ধরা, রান্নাবান্না, জন্ম-মৃত্যু-বিয়েসহ জীবনপ্রবাহ নৌকায়ই নির্বাহ করে।

বাংলাদেশের মুক্ত জল-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা মানতা সম্প্রদায় প্র্রায় সারাদেশেই কমবেশি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তবে দেশের উপকূলীয় অঞ্চল বিশেষ করে পটুয়াখালী, বরিশাল ও ভোলা জেলায় এদের সংখ্যা বেশি। ভোলা সদর ও লালমোহন উপজেলায় সরেজমিন অনুসন্ধানকালে মানতা সম্প্রদায়ের অন্তত ১০ হাজার মানুষের দেখা গেছে। পটুয়াখালী জেলার কালাইয়া ও গলাচিপায় রয়েছে কমপক্ষে ১৫শ’ মানতা। বরিশালের শ্রীপুর ও মেহেন্দীগঞ্জে এ সম্প্রদায়ের বিপুল সংখ্যক মানুষের দেখা মিলেছে। এর বাইরে মাদারীপুর, ফরিদপুর, ঢাকা, পিরোজপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, বরগুনা, খুলনা, চাঁদপুর, ঝালকাঠি, মানিকগঞ্জ, কুমিল্লাসহ দেশের বহু জেলায় এদের উপস্থিতি দৃশ্যমান। তবে এ সম্প্রদায়ের মোট লোকসংখ্যা সম্পর্কে সরকারি পর্যায়ে কোনো তথ্য নেই। অনেক প্রবীণ মানতাই ধারণা করেন, তাদের সম্প্রদায়ের লোকসংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ।

মানতাদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের হার শূন্যের কোঠায়। শিক্ষা ছাড়াও মানতা সম্প্রদায় খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান ইত্যাদি মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। এদের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থা, ভাষা, ধর্ম, সম্প্রদায়গত বৈচিত্র্য ও যাযাবর জীবনযাপনের প্রাচীন পদ্ধতি তাদের সংস্কৃতিকে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে। এদের প্রধান উৎসব ও অনুষ্ঠানাদি এবং তা পালনের কাল ও ধরন, ধর্মবিশ্বাস, শ্রেণিবিন্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, সর্দার প্রথা, বিচার ব্যবস্থা, গৃহায়ন ও লোকাচার, বিয়ে, সেবাব্রত ভাষা, শিক্ষা, মূল্যবোধ, মনোবৃত্তি, দৃঢ়তা, বিমুখতা, সংস্কার প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে এবং মূলধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সচেষ্ট হতে হবে।

মানতাদের পেশা, ভূমিহীনতা, নৃতাত্তি্বক বৈশিষ্ট্য, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, পশ্চাৎপদতা, ভোটাধিকার প্রয়োগে সমস্যা ও সমাধানে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকের এগিয়ে আসতে হবে।
যেহেতু মানতা সম্প্রদায় আজন্ম মৎস্য শিকারে দক্ষ সেহেতু তাদের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া যেতে পারে। শারীরিকভাবে অক্ষম, বৃদ্ধ-নারী-শিশুদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান, বিশেষত কুটিরশিল্পের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। স্থায়ী আবাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদনমুখী করা যেতে পারে। তাদের জন্য ক্ষুদ্র ব্যবসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষায় মানতা সম্প্রদায়ের জন্য সমুদ্রতীরে পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা যেতে পারে। ঝড়-বন্যা প্রতিরোধে সক্ষম নৌকার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। মাছ বিক্রির ক্ষেত্রে তাদের জন্য খাজনা মওকুফ করা যেতে পারে। ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে মহাজনি প্রথা উচ্ছেদ ও হাটবাজারের ফড়িয়া ব্যবস্থা উচ্ছেদ করা যেতে পারে। সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত দেশের প্রতিটি মানুষ যেন না খেয়ে থাকে_ এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে মানতাদের মতো দেশের সব নৃগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন।

ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়