আফগান যুদ্ধ কি আমরা ভুলে গেছি?

গ্রাসিয়ানা দেল কাসিলো:  গ্রাসিয়ানা দেল কাসিলোসংবাদপত্রের শিরোনামে সিরিয়া সংকটের খবরই প্রাধান্য পাচ্ছে, খুব কম মানুষই যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম যুদ্ধে গুরুত্ব দিচ্ছেন। বস্তুত, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের শুরুর দিকে আফগানিস্তানের যুদ্ধ কদাচিৎ উল্লেখিত হয়েছে। যদিও ট্রাম্প প্রশাসনে জিম ম্যাটিস ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এইচ আর ম্যাকমাস্টারের মতো দুজন অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তা আছেন। এর পরিবর্তন দরকার।

১৫ বছর ধরে আফগানিস্তানে ব্যর্থ হস্তক্ষেপের কারণে সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ২০১৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর যে ঐকমত্যের সরকার গড়ে উঠেছিল, তা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। অন্যদিকে আফগানিস্তানে আফিম উৎপাদন বাড়ছে এবং অর্থ পাচারে তারা এখন পৃথিবীতে দ্বিতীয়। ইউরোপসহ অন্যান্য জায়গায় আফগান শরণার্থীদের আগমন বেড়ে গেছে।

আফগানিস্তানের যুদ্ধে বিপুল ব্যয় হয়েছে। এখন পর্যন্ত খসড়া হিসাবে যৌথ বাহিনীর সাড়ে তিন হাজার সেনা মারা গেছে (যার মধ্যে ৭০ শতাংশই মার্কিন সেনা)। এর সঙ্গে সমপরিমাণ ঠিকাদার ও এক লাখ আফগান সেনা (নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, বিরোধী যোদ্ধা ও বেসামরিক মানুষ) মারা গেছে। ২০০২ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে ৭৮ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করেছে, যেটা দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই দশকের বাজেটের সমান। এ ছাড়া বাজেট-বহির্ভূত ব্যয়, যেমন অক্ষম মানুষদের প্রদেয় ভাতা ও মৃত সেনাদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ বাবদ আরও কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

আফগান যুদ্ধ আরও অনেক আগেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। সর্বোপরি মার্কিন সেনারা তো দেশটি পুনর্গঠন করতে বা সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে যায়নি। কিন্তু মার্কিনদের ভুল নীতি, পদক্ষেপ ও অগ্রাধিকারের কারণে যে গোষ্ঠীগুলোকে তার শায়েস্তা করার কথা ছিল, তাদের বরং সংখ্যা বাড়ছে: আল-কায়েদা, আফগান তালেবান ও আরও সম্প্রতি আইএসের।

২০১০ সালে বারাক ওবামা ‘জাতি গঠন’ ও অভ্যুত্থান দমনে আফগানিস্তানে সেনাসংখ্যা বাড়ান, যার লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া। বরং দেখা গেল, যেসব এলাকা জঙ্গি‘মুক্ত’ বলে ধারণা করা হয়েছিল, সেখান থেকে মার্কিন ও মিত্র সেনারা চলে যেতেই তালেবানসহ অন্যান্য চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো শিগগিরই ফিরে আসে।

অন্যদিকে আফগানিস্তানে যে স্রেফ গত বছরেই ৪৩ শতাংশ আফিম উৎপাদন বেড়েছে, তাতে বোঝা যায়, এই গোষ্ঠীগুলোর শক্তিমত্তা বেড়েছে। যারা এই মাদক চোরাচালানের টাকা দিয়ে নিজেদের প্রয়োজন মেটায়। পৃথিবীতে প্রতিবছর যে ৪৩০ থেকে ৪৫০ টন হেরোইন ও মরফিন উৎপাদিত হয়, তার মধ্যে ৩৮০ টন উৎপাদিত হয় আফগান আফিম দিয়ে।

তবে আফগানিস্তানকে সাহায্য ফাঁদে পড়তে দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দেশটির পুনর্গঠনে ১১ হাজার কোটি ডলার বিতরণ করেছে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের পুনর্গঠনে মার্শাল প্ল্যান অনুসারে যে ১ হাজার ২৫০ কোটি ডলার ব্যয় করা হয়েছিল, মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করা হলে এই খরচ তার সমান)। খসড়া হিসাবে এর মধ্যে সাত হাজার কোটি ডলার আফগান নিরাপত্তা বাহিনী গঠন ও অর্থায়নে ব্যয় হয়েছে। বাকি চার হাজার কোটি ডলার সামরিকবহির্ভূত অন্য খাতে ব্যয় হয়েছে।

এত ব্যয় সত্ত্বেও আফগানিস্তান আগামী কয়েক দশক পর্যন্ত নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে না। ২০০২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার কোটি ডলার। ২০১৬ সালে তার জিডিপির পরিমাণ ছিল মাত্র ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ দেশটির মাথাপিছু আয় ছিল ৫২৫ ডলার। আর ২০০২ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যরা গড়ে প্রতিবছর সমরবহির্ভূত সহায়তা বাবদ জিডিপির ৫০ শতাংশ দিয়েছে। আর এই সহায়তাও একই রকম অদক্ষ কায়দায় দেওয়া হয়েছে; যদিও ইউএস স্পেশাল ইন্সপেক্টর জেনারেল ফর আফগানিস্তান রিকনস্ট্রাকশনসহ অন্যরা বারবার বিপুল পরিমাণ অপচয়, জালিয়াতি ও অপব্যবহারের কথা বলেছেন।

ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার বদলে দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের আফগান অভিযানের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কার্যকর কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। এ রকম একটি কৌশল প্রণয়নের পরই সেনাবাহিনীর আরও সেনা পাঠানোর অনুরোধে প্রশাসনের সাড়া দেওয়া উচিত।

সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো, ম্যাটিস ও ম্যাকমাস্টার উভয়ই জানেন, আফগানিস্তানে আরও সেনা ও অর্থ পাঠালেই কাজ হবে না। বরং উভয়ই কার্যকর নীতি প্রণয়ন করে বিদ্রোহ দমনের প্রয়োজনীয়তায় জোর দিয়েছেন, যার মাধ্যমে অন্তত নতুন শত্রু ও ‘অধিকতর গোলাবারুদের’ চাহিদা সৃষ্টি হবে না। মার্কিন সামরিক বিভাগের সব উচ্চপদস্থ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এই যুক্তি আরও একধাপ এগিয়ে নিয়েছেন। তাঁরা কংগ্রেসের নেতাদের বলেছেন, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করতে হলে এর কারণ আমলে নিতে হবে, যেমন সুযোগের অভাব, নিরাপত্তাহীনতা, অবিচার ও আশাহীনতা।

খরচসাশ্রয়ী, সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির মাধ্যমে সিংহভাগ আফগান নাগরিকের উপকার করতে হলে মার্কিন নেতাদের নতুন বিপ্লবী চিন্তা করতে হবে। আলোচনার টেবিলে বেশ কিছু প্রস্তাব আছে। আমি নিজেই বলেছিলাম, সমন্বিত ‘পুনর্গঠন অঞ্চল’ গড়ে তোলা হোক।

এই ধরনের অঞ্চল গড়ে তোলা হলে সম্পদসমৃদ্ধ আফগানিস্তান সহায়তার জায়গায় প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা স্থানীয় সমাজের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করবে। বিদেশিরা স্থানীয় মানুষের জন্য খাদ্য ও সেবা উৎপাদনে তাদের সহযোগিতা করবে। এরা তাদের উৎখাত করবে না, যেটা প্রায়ই হয়ে থাকে। এর বিনিময়ে স্থানীয় মানুষ এই অঞ্চলের সুরক্ষা দেবে। এতে বিনিয়োগকারীরা কম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রপ্তানি করতে পারবে।

১৫ বছরের দ্বন্দ্বের পর আফগানিস্তানের যুদ্ধ শেষ করার জরুরত কিছুটা কমে গেছে। কিন্তু সত্য হচ্ছে, শুধু ইউরোপে শরণার্থীর স্রোত থামানোর জন্য নয়, সন্ত্রাসীদের দলভুক্তিকরণ বন্ধ করতে এটি এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি। এমন ‘বিনিয়োগ’ করতে হবে যার ‘প্রভাব’ অনুভূত হবে, যার মাধ্যমে স্থানীয় মানুষ ও বিনিয়োগকারী উভয়ই উপকৃত হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন ঠিক এ কাজটি করতে পারে।

অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট।

গ্রাসিয়ানা দেল কাসিলো: কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সদস্য।