লন্ডন হামলা সাধারণ মানুষের ওপর আঘাত

হাফ মুইর:  হামলার পর আতঙ্কিত মানুষের ছোটাছুটিম্যানচেস্টারে এক অল্প বয়সী মেয়ের কনসার্ট ছিল, ওয়েস্টমিনস্টারে ছিল পর্যটকের দিন। আর এবার ছিল মধ্য লন্ডনের আনন্দঘন শনিবার রাত। থেরেসা মে বলেছেন, আর সহ্য করা হবে না। তিনি আরও বলেছেন, ‘আমাদের দেশে চরমপন্থার ব্যাপারে সহনশীলতা একটু বেশি।’ তিনি ঠিকই বলেছেন। ‘মানুষের মনকে সহিংসতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা গেলে এবং আমাদের বহুত্ববাদী ব্রিটিশ মূল্যবোধ এই ঘৃণার সমর্থক ও প্রচারকদের চেয়ে উন্নত—এটা তাদের বোঝানো গেলে চরমপন্থাকে পরাজিত করা সম্ভব।’

আমি আশা করি, তিনি আবারও এই অনিয়ন্ত্রিত সহিংসতার বিরুদ্ধে সক্রিয় ব্যবস্থা নেবেন, যা ব্রিটিশ মূল্যবোধের সঙ্গে খাপ খায় না। গত কয়েক বছরের দূষিত রাজনীতির মধ্যে এই সহিংসতা সমাজকে বিভক্ত করেছে। আজকের এই দুঃখজনক দিনে একটি শিক্ষা নিতে হবে। ৭ জন মারা গেছেন, ৪৮ জন আহত হয়েছেন—এই অবস্থায় আমাদের হয় হত্যাকারী ও কাপুরুষদের পরাজিত করতে হবে অথবা কখনোই আমরা তা করব না।

এসব কিছুর পরপর আমরা দেখতে পাচ্ছি, এই পুনঃপুন ঘটনশীল বিভীষিকার একটি নির্দিষ্ট ধরন আছে।
এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষই মারা পড়ছে। সরকারি স্থাপনায় আমরা সশস্ত্র রক্ষী পাঠাতে পারি, কিন্তু শহরের পানশালা ও কনসার্ট হলকে কী করে বোমা ও আক্রমণ প্রতিরোধী করা যায়?

হঠাৎ করেই এই হামলা হয়। আগে থেকে সতর্কতামূলক টেলিফোন কল বা সংগুপ্ত বার্তা আসে না, মৌন বোঝাপড়াও নেই। ব্যাপারটা যেন এ রকম যে এত বছরের সন্ত্রাসবাদ বক্সিংয়ের নিয়মে পরিচালিত হয়েছে।

রাষ্ট্রের ভিত্তি ধ্বংস করার মতো দৃশ্যমান ও তাৎপর্যপূর্ণ উচ্চাকাঙ্ক্ষা এদের নেই। যে মানুষেরা ভ্যান বা গাড়ি নিয়ে হামলা চালাচ্ছে বা এক ফুট লম্বা ছুরি দিয়ে যাকে পাচ্ছে তাকে মেরে বসছে, তারা কিন্তু দৃশ্যত সেনাশিবির, পুলিশের থানা বা ব্যাংক অব ইংল্যান্ড নিশ্চিহ্ন করতে চাইছে না। তারা মুক্ত সমাজের ভিত বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াই করছে না; বরং যে মানুষেরা মুক্ত সমাজের সুবিধা ভোগ করছে, তাদের ওপর এরা হামলা চালাচ্ছে। বিভিন্ন দিক থেকেই বলা যায়, এটি আনন্দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, যার পেছনে আছে একধরনের বিকৃত ধর্মানুরাগ।

আমরা বাইরে গিয়ে খাইদাই, নাচি ও গাই, চরমপন্থীরা এসব ব্যাপারকে ক্ষয়িষ্ণু ও তুচ্ছ মনে করে। তা সত্ত্বেও এগুলো একধরনের রাজনৈতিক প্রতীক, আমরা যেখানে খুশি সেখানে যাই, যা ইচ্ছা তা-ই পরি, যাকে পছন্দ করি তাকেই ভালোবাসি; কারণ সামাজিক কাঠামো ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা আমাদের এটা করার অনুমতি দিয়েছে। চরমপন্থীরা এটা ভাঙতে না পারলে বা তার ভিত্তিতে আঘাত করতে না পারলে (তারা জানে, এটা তারা পারবে না) সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করে তোলে, যারা এই ব্যবস্থার মজাটা নেয়। এই ব্যবস্থা তাদের যে স্বাধীনতা দেয়, সেটা উপভোগ করে।

এই সময় পুলিশ ও রাজনীতিকদের পক্ষে আমাদের এটা বলাই স্বাভাবিক যে আমরা যেন সাধারণ কাজকর্ম চালিয়ে যাই, তারা আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে দ্বিগুণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের নতুন কমিশনার ক্রেসিদা ডিক সঠিক সুরেই কথা বলেছেন। জরুরি সেবাব্যবস্থার প্রশংসা করেছেন তিনি। অন্যদিকে শোকে মুহ্যমান সমাজকে তিনি জরুরি সেবার সঙ্গে সমন্বিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে, এটা তো জানা কথাই, যা একই সঙ্গে বিরুদ্ধাচরণেরও ব্যাপার। যে দোকান দ্রুত খুলে যায় বা যে বাস ও ট্রেন চলাচল করে এবং যে মানুষেরা চলাচল করে, তারা সবাই কিছু বলে যায়। এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো সমাজকে কার্যকর রাখে। আমরা সব সময় এটি বজায় রাখব।

কিন্তু এর চেয়েও বড় বিপদ আছে। সেটা হলো, যে ব্যাপারগুলো আমাদের আনন্দ দেয়, সেগুলো নিয়ে আমরা দুবার ভাবতে শুরু করব। অর্থাৎ রাতের বেলা পানশালায় যাওয়া বা গানবাজনায় মুখর বার বা ক্লাবে যাওয়া, গণপরিসরে সন্ধ্যা কাটানো, খেলার মাঠে যাওয়া, দাঁড়িয়ে থেকে কনসার্ট উপভোগ করা, শপিং মল, সিনেমা হল ও থিয়েটারে যাওয়া প্রভৃতি ব্যাপারে আমাদের দ্বিতীয়বার চিন্তা করতে হবে। এসব অভিজ্ঞতা জীবনকে সমৃদ্ধ ও সুন্দর করে। ওসব স্থানে যাওয়ার ঝুঁকি যে শিগগিরই দূরীভূত হবে, এমন সম্ভাবনা কম। কারণ, এই হত্যাকারীরা এসব ঘৃণা করে, কিন্তু ঝুঁকি সব সময়ই ন্যূনতম হবে, আমাদের এটাতে মূল্য দিতে হবে। আমরা কীভাবে কাজ করি বা কীভাবে খেলি, তা আসলে একই মুদ্রার দুই পিঠ। এমন বেদনাবিধুর সময়ে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে, এই চরমপন্থীদের আমরা নিজেদের সত্তা হরণ করার সুযোগ দিয়ে বসতে পারি।

অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া।

হাফ মুইর: দ্য গার্ডিয়ানের সহযোগী সম্পাদক।