১৫ ফেব্রুয়ারি ও ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন আর নয়

আলী ইমাম মজুমদার:  প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটসব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায় যুক্তরাষ্ট্র। নির্বাচন কমিশনও (ইসি) এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছে। কী প্রক্রিয়ায় এটা সম্ভব, তা নিয়ে সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটের নেতৃত্বে তিন সদস্যের এক প্রতিনিধিদল বৈঠক করেছে। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ইসি সচিব জানান, আগামী দিনে ১৫ ফেব্রুয়ারি ও ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন যেন আর না হয়, এ বিষয়ে দুপক্ষ একমত হয়েছে। এই সংক্রান্ত সব খবরের উৎস ঢাকার গণমাধ্যম। বেশ কয়েকটি কারণে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হয়। প্রথমত, আলোচ্য বিষয় ও মতৈক্যের মর্মার্থ।

আমাদের একটি অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার অত্যন্ত প্রয়োজন। এ ব্যাপারে পদ্ধতি–প্রক্রিয়া নিয়ে নানা কথা থাকলেও নীতিগতভাবে দ্বিমত করার সুযোগ কারও নেই। আরও গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটা উপলব্ধি করেন বলে সুস্পষ্ট হওয়ায় বিষয়টির গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। আলোচনাটি হয়েছে বর্তমান এককেন্দ্রিক বিশ্বের প্রধান পরাশক্তিধর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে। সেটাও আগ্রহ বৃদ্ধি করে। ইসি সচিবের মতে, সিইসি বলেছেন, ‘১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ সালে আমাদের ভালো নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। চার মাসের ব্যবধানেও ভালো নির্বাচন করেছে ইসি। সে ক্ষেত্রে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন যেন আর নয়, সে জন্য আমরা একমত।’

একটি নির্মম বাস্তবতাকে সামনে আনার জন্য সিইসি ধন্যবাদ পেতে পারেন। তিনি অবশ্য আরেকটু পেছনে গেলে ১৯৮৮ সালের ব্যর্থ নির্বাচন এবং ১৯৯১ সালের সফল নির্বাচন প্রসঙ্গও আনতে পারতেন। হতে পারে ১৯৮৮ সালের নির্বাচন স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের কাঠামোয় হয়েছিল। তবু তা তো আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। আর ১৯৯১ সালের নির্বাচন তো আরও চমকপ্রদ। সংবিধানে এমন কোনো বিধান না থাকা সত্ত্বেও দেশব্যাপী গণ-আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচার পতন এবং আন্দোলনরত দল ও জোটসমূহের দাবির মুখে দেশের কর্মরত প্রধান বিচারপতি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ব্যবস্থা করেন নির্বাচনের।

অবশ্য সংসদ সংবিধান সংশোধন করে এসব কার্যক্রমের ভূতাপেক্ষ বৈধতা দিয়েছে। যা-ই হোক একই প্রতিষ্ঠান কখনো সফল এবং কখনো ব্যর্থ হয়। তাদের সহযোগীও থাকে একই। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা। তাহলে ধরতে হবে এ প্রতিষ্ঠানগুলো সফল হতে পারে। প্রয়োজনে যথাযথ পরিবেশে তা হয়েছেও। আবার বৈরী পরিবেশে ব্যর্থ হয়েছে তারাই। তাহলে আমরা বিনা দ্বিধায় ধরে নিতে পারি, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি আর ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানগুলো সক্ষমতা প্রমাণে সমর্থ হয়নি। যদিও আইনি কাঠামো আর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় তেমন কোনো হেরফের ছিল না। তাহলে খুঁজে বের করতে হবে গলদ কোথায় ছিল?

সে বৈঠকেই আলোচিত হয়েছে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হলে সহিংসতা হয়। অংশগ্রহণমূলক হলে সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলেও আশা করা হয়েছে। ধারণাটি একেবারে অমূলক নয়। তবে একটি জাতীয় নির্বাচনে সবাই অংশগ্রহণ করে এবং ক্ষেত্রবিশেষে কেন করে না, এ বিষয়ে খোলামেলা কোনো আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেল না। অবশ্য নির্বাচন কমিশন এবং মার্কিন দূতাবাস তা জানে না, এমনও নয়। সাম্প্রতিক কালের যে কয়টা নির্বাচন এ দেশে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে বলে সিইসি নিজে উল্লেখ করেছেন, সেগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। বলার অপেক্ষা রাখে না সে জন্যই ওগুলোতে দলগুলোর অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। আর নির্বাচনকালীন সরকার ছিল নিরপেক্ষ। নির্বাচন কমিশন তো নিরপেক্ষ ছিল অবশ্যই।

নির্বাচন পরিচালনায় কমিশনের ভূমিকা মুখ্য। তবে তা বাস্তবায়নে প্রয়োজন হয় কয়েক লাখ জনবল। কমিশনের কিছু বাদ দিলে এরা প্রায় সবাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা কিংবা সামরিক বাহিনীর সদস্য। আর এর বিকল্পও নেই। এমনিতেই আমাদের নির্বাচন কমিশনের জনবলকাঠামো ইতিমধ্যে ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের প্রায় আট গুণ হয়ে গেছে। আরও কয়েক গুণ বাড়ালেও নির্বাচন পরিচালনা ও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য তাঁদের সরকারের ওপরই নির্ভর করতে হবে। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতিকে আমরা দলীয়করণের দাপটে বিপন্ন করে ফেলেছি।

তাই দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকলে এর একটি বড় প্রভাব নির্বাচন পরিচালনা ব্যবস্থায় পড়ে। সফল নির্বাচন কমিশনও এ–জাতীয় কয়েকটি ক্ষেত্রে ব্যর্থ হতে আমরা দেখেছি। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জুনের অত্যন্ত সফল নির্বাচন সম্পন্ন করা দুটো কমিশন পিছু হটেছে এর পরবর্তী সময়ে যথাক্রমে মাগুরা ও টাঙ্গাইল উপনির্বাচনে। বর্তমান সিইসি বিবেচ্য আলোচনাকালে ১৯৯৬ সালে চার মাসের ব্যবধানে যে দুটো নির্বাচনে সাফল্য ও ব্যর্থতার কথা বলেছেন, সে দুটোতেই তাঁর অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ। কোন পরিস্থিতিতে প্রথমটি ব্যর্থ হয়ে গেল আর সফল হয় পরেরটি, তা তাঁর ভালো জানা। আর ২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনটি সফল না হওয়ার কারণও তাঁর অজানা থাকার কথা নয়। আর এর গোড়ায় হাত দিয়ে কিছু একটা না করলে আপনাআপনিই ভালো নির্বাচন হবে না।

খোলামেলা কথা, আমাদের দেশের ক্ষমতা বলয় সংবিধান এবং রুলস অব বিজনেসের বিধান অনুসারে প্রধান নির্বাহীনির্ভর। তাই ক্ষমতায় যে রাজনৈতিক দলটি থাকে এর নেতা-কর্মীরা ব্যবস্থাটিকে প্রভাবিত করার অবস্থানে রয়ে যান। আর এ অবস্থানের অপব্যবহার তাঁরা করেছেন বারবার। অন্যদিকে আমাদের প্রতিবেশী ভারতে অনধিক ৩০০ জনবলের নির্বাচন কমিশন সরকারি যন্ত্রের সহায়তা নিয়েই সফল নির্বাচন করে যাচ্ছে। একবারে সাফসুতরো না হলেও এর মৌলিক গ্রহণযোগ্যতা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি। আর আমাদের এখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকেও নিজেদের অনুকূলে নিতে ২০০৪ সালে সংবিধান সংশোধন করে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। তবে বিধির বিধান কাটার মতো শক্তিশালী অবস্থানে তাঁরা ছিলেন না। তাই ২০০৭ সালের সূচনায় আগের সরকারের ছায়া রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নির্মমভাবে বিদায় নিতে হয়। আর শুধু সরকারকেই এসবের জন্য একতরফা দোষ দেওয়া যায় না।

আমাদের নির্বাচন কমিশনের আইনগতভাবে ব্যাপক স্বাধীনতা রয়েছে। তবে তার প্রকৃত প্রয়োগ হয় শুধু নিরপেক্ষ সরকার থাকলেই, দলীয় সরকারের সময়ে নয়। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ১৫৩ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার রহস্যটি আজও তলিয়ে দেখা হয়নি। ২০১৪ সালের সে নির্বাচনটিতে একটি বড় দল প্রার্থী না দেওয়ায় সিংহভাগ ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাবেন না, এটা অস্বাভাবিক নয়। যানওনি। তারপরও লাখো ভোটে বিজয় দেখানো হয় কীভাবে? আর সব জেনেশুনে নির্বাচনের পর তখনকার সিইসি জনগণকে অভিনন্দন জানিয়েছেন কোন মুখে। তেমন অভিনন্দন কিন্তু জানানো হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এবং ১৯৮৮ সালের এরশাদের ভোটারবিহীন নির্বাচনের পরেও। মানুষ অনেক কিছু ভুলে যায়। তবে সব নয়।

এ আলোচনাদৃষ্টে ধারণা করা যায়, সিইসি একটি অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে আগ্রহী। এ দেশের জনগণও তা-ই চায়। তবে তাঁর পতাকাতলে সব রাজনৈতিক দলকে নিতে পারবেন কি না, এটা নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোতে কমিশনের কার্যক্রমের ওপর। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল প্রধান বিরোধী দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার প্রশ্নে অনুদার। সরকারি কর্মচারীদের দলীয় আনুগত্য টিকিয়ে রাখতে তারা সর্বতোভাবে সচেষ্ট। প্রচলিত আইন অনুযায়ী এসব ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা বর্তমান পর্যায়ে কমিশনের নেই। তাঁরা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবেন শুধু তফসিল ঘোষণার পর। দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থায় কোনোরূপ পরিবর্তনের সম্ভাবনা লক্ষণীয় নয়। সে ক্ষেত্রে কমিশনের স্বতঃপ্রণোদিত কিছু ক্ষমতা গ্রহণ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পারে।

ভারতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বাজেট ঘোষণা বন্ধ করার কোনো ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের নেই। কিন্তু যেহেতু এ বাজেট নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে, তাই তারা সময়ে সময়ে এটা বন্ধ করে দেয়। শুরুতে সরকারের সঙ্গে ব্যাপক টানাহ্যাঁচড়া চললেও আইনি লড়াইয়ে কমিশনই জেতে। এ ক্ষমতা কমিশন নিজে নিয়েছে। এ ধরনের অন্য কিছু করে কি আমাদের ইসি একটি ঝাঁকুনি দিতে পারে? তাহলে তাদের সাম্প্রতিক কালের বক্তব্য বাস্তবায়নে সক্ষমতা বুঝতে পেরে আশাবাদী হব। নচেৎ এটিকেও কথার কথা বলেই বিবেচনা করতে হবে।

আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

majumderali1950@gmail.com