বিশ্বের কম বয়সী কজন রাষ্ট্রনেতা

নিউজ ডেস্ক:  নেপোলিয়নের পর সবচেয়ে কম বয়সে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হয়ে আলোচনায় আসেন ইমানুয়েল ম্যাক্রন। তার বয়স মাত্র ৩৯। রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞতার ভূমিকাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পৃথিবীর অনেক দেশের পরিচালনায় আছে কম বয়সী নেতৃত্ব। যারা কোনো অংশে পিছিয়ে নেই অভিজ্ঞজনদের থেকে। তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিয়ে এবারের আয়োজন। লিখেছেন শামস্ বিশ্বাস

ভানেসা দ্য আমব্রোসিও, সান মারিনো

বিশ্বের সবচেয়ে ছোট দেশগুলোর মধ্যে সান মারিনো একটি। রাজধানী সান মেরিনো সিটি। দেশটির খবর সাধারণত বিশ্বসংবাদমাধ্যমে কম আসে। ইউরোপ মহাদেশে অবস্থিত এ দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের বয়স মাত্র ২৯। জন্ম ২৫ এপ্রিল ১৯৮৮ সালে। সান মারিনোর রাষ্ট্রপ্রধানের পদবির নাম ’ক্যাপ্টেন রিজেন্ট’। ভানেসা দ্য আমব্রোসিও ১ এপ্রিল ২০১৭ থেকে আগমী আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন। ২০১৪ সালে তিনি দেশটির গ্রেট এবং জেনারেল কাউন্সিল নির্বাচিত হন। তিনি বুলগেরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট। তিনি সান মারিনো কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ফ্রান্সিসকো বারতির নাতনি।

কিম জং উন, উত্তর কোরিয়া

গণতান্ত্রিক গণপ্রজাতন্ত্রী কোরিয়া অর্থাৎ উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা হচ্ছেন কিম জং উন। তিনি হচ্ছেন কিম জং ইলের (১৯৪১-২০১১) চতুর্থ সন্তান ও কিম ইল-সাংয়ের (১৯১২-১৯২৪) নাতি। তিনি বর্তমানে ওয়ার্কার্স পার্টি অব কোরিয়ার ফার্স্ট সেক্রেটারি, উত্তর কোরিয়ার কেন্দ্রীয় সেনা কমিশন ও জাতীয় প্রতিরক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান এবং কোরিয়ান পিপলস আর্মির সুপ্রিম কমান্ডারও তিনি। তার বাবা অর্থাৎ কিম জং ইলের রাজ্য অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পর তিনি ২৮ ডিসেম্বর ২০১১ সালে নিজেকে উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি তার বাবা কিম জং ইল ও মা কো ইয়ং হির তৃতীয় ও সর্বকনিষ্ঠ পুত্র। তিনি বিশ্বের দ্বিতীয় কনিষ্ঠতম রাষ্ট্রপ্রধান। তার বয়স ৩৪। জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৩।

শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি, কাতার

২০১৩ সালে তিনি তার বাবার কাছ থেকে ক্ষমতা পেয়ে কাতারের আমির হয়েছেন। বয়স ৩৬। জন্ম ৩ জুন ১৯৮০। ২০২২ সালের কাতারের বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়ার পেছনে শেখ আল থানির বিশেষ ভূমিকা ছিল। কাতারের রাজনীতি একটি পরম রাজতন্ত্র কাঠামোয় সংঘটিত হয়। কাতারের আমির হলেন একাধারে রাষ্ট্রের প্রধান ও সরকারপ্রধান। কাতারের মোট জনসংখ্যা ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন। কাতার বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ মাথাপিছু আয়ের রাষ্ট্র। সৌদি আরব, ওমানের পর কাতার অন্যতম রক্ষণশীল রাষ্ট্র। কাতারের নাগরিক সুযোগ-সুবিধার মান খুবই উন্নত।

জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক, ভুটান

জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুকের জন্ম ১৯৮০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। তিনি ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাজত্ব করা বর্তমান রাজবংশের পঞ্চম রাজা। ২০০৬ সালে বাবা জিগমে সিংহে ওয়াংচুক সরে দাঁড়ালে ভুটানের রাজার দায়িত্ব পান জিগমে খেসার ওয়াংচুক। রাজা জিগমে ২০০৮ সালের নভেম্বরে অফিশিয়ালি মুকুটপ্রাপ্ত হন। তিনি রাজা হওয়ার পর ভুটানের রাজনীতিতে ব্যাপক বিবর্তন ঘটে। আধুনিক গণতন্ত্রের জন্য একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। নির্বাচন হয় এবং নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে। রাজা জিগমে অক্সফোর্ড থেকে গ্র্যাজুয়েট করেছেন। তার বয়স বর্তমানে ৩৭ বছর।

সালেহ আলি আল-সামাদ, ইয়েমেন

জন্ম ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি। ২০১৬ সাল থেকে ইয়েমেনের সুপ্রিম পলিটিক্যাল কাউন্সিলের সভাপতি। ইয়েমেন মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ। এটি আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। ১৯৯০ সালে ইয়েমেন আরব প্রজাতন্ত্র (উত্তর ইয়েমেন) ও গণপ্রজাতন্ত্রী ইয়েমেন (দক্ষিণ ইয়েমেন) দেশ দুটিকে একত্রিত করে ইয়েমেন প্রজাতন্ত্র গঠন করা হয়। সানা’আ ইয়েমেন প্রজাতন্ত্রের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। ইয়েমেনের রাজনীতি একটি রাষ্ট্রপতিশাসিত প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় সংঘটিত হয়। রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের প্রধান। সরকারপ্রধান হলেন রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের ওপর ন্যস্ত। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সরকার ও আইনসভা উভয়ের ওপর ন্যস্ত। বিচার বিভাগ তাত্ত্বিকভাবে নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভা থেকে স্বাধীন।

ইউরি রাতাস, এস্তোনিয়া

উত্তর-পূর্ব ইউরোপের সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র এস্তোনিয়ার কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন ইউরি রাতাস। তার বয়স ৩৮। জন্ম ১৯৭৮ সালের ২ জুলাই। সরকারিভাবে এর নাম এস্তোনিয়া প্রজাতন্ত্র। দেশটি বাল্টিক সাগরের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত। এস্তোনিয়া বাল্টিক দেশগুলোর মধ্যে ক্ষুদ্রতম এবং সবচেয়ে উত্তরে অবস্থিত। এস্তোনিয়া মূলত জলা ও প্রাচীন অরণ্যে পূর্ণ একটি নিম্নভূমি। দেশটির উপকূলীয় জলসীমায় বহু দ্বীপ আছে। এস্তোনিয়ার রাজধানী তাল্লিন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাল্টিক সমুদ্রবন্দর এবং দেশের বৃহত্তম শহর। দেশটির বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। এস্তোনিয়া ১৯৯১ সালের ২০ আগস্ট ফের স্বাধীনতা অর্জন করে। এস্তোনিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্ণ সদস্যপদ এবং ন্যাটো জোটভুক্ত।

এমিল ডিমিটিভিভ, মেসিডোনিয়া

২০১৬ সাল থেকে মেসিডোনিয়ার অন্তর্র্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী। জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭৯ সালের ১ মার্চ। বয়স এখন ৩৮-এর কোঠায়। মেসেডোনিয়া দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে বলকান উপদ্বীপের একটি রাষ্ট্র। এটি আগে যুগোসøাভিয়ার অন্তর্গত ছিল। ১৯৯১ সালের নভেম্বরে দেশটি স্বাধীনতা ঘোষণা করে। স্কপিয়ে দেশের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। মেসেডোনিয়া প্রজাতন্ত্রের রাজনীতি একটি সংসদীয় প্রতিনিধিত্বমূলক বহুদলীয় গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় সংগঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের প্রধান। সরকারপ্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের ওপর ন্যস্ত। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ১২০ সদস্যের আইনসভার ওপর ন্যস্ত। বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভা থেকে স্বাধীন।

ভোলোদিমির গ্রসম্যান, ইউক্রেন

ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী মি. গ্রসম্যানের বয়স ৩৮, ক্ষমতায় আছেন ২০১৬ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে। যদিও তার দেশের সর্বেসর্বা প্রেসিডেন্ট পেত্রো পোরোশেনকো। জন্ম ১৯৭৮ সালের ২০ জানুয়ারি। রাশিয়ার পর এটি ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র। ইউক্রেনের রাজনীতি একটি অর্ধরাষ্ট্রপতিশাসিত প্রতিনিধিত্বমূলক বহুদলীয় গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের কাঠামোয় পরিচালিত হয়। নির্বাহী ক্ষমতা মন্ত্রিসভার হাতে ন্যস্ত। আইন প্রণয়ন ক্ষমতা আইনসভার হাতে ন্যস্ত। ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। পেত্র পোরোশেনকো ২০১৪ সাল থেকে দেশটির বর্তমান রাষ্ট্রপতি।

ইমানুয়েল ম্যাক্রন, ফ্রান্স

৩৯ বছর বয়সে প্রেসিডেন্টে নির্বাচিত হয়ে ইমানুয়েল ম্যাক্রন ফ্রান্সে ইতিহাস তৈরি করেছেন। ফ্রান্সে এই রেকর্ড ছিল এত দিন লুই-নেপোলিয়ান বোনাপাটের। ১৮৪৮ সালে ৪০ বছর বয়সে নেপোলিয়ান ক্ষমতা নিয়েছিলেন। ম্যাক্রনের জন্ম ১৯৭৭ সালের ২১ ডিসেম্বর। নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগে তিনি কোনো রাজনৈতিক পদের অধিকারী ছিলেন না। ২০০৮ সালে তিনি বিনিয়োগ ব্যাংকার হিসেবে পেশাদারি জীবন শুরু করেন এবং ২০১২ সাল নাগাদ একজন কোটিপতিতে পরিণত হন। ২০১২ সালে তিনি ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদের একজন প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হন। ২০১৪ সালে তিনি ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী পদে নিযুক্ত হন এবং ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি এ পদে কাজ করেন। ২০১৬ সালে তিনি সরকার থেকে পদত্যাগ করেন এবং ‘অঁ মার্শ’ (‘এগিয়ে চলো’) আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন। সেই দল থেকেই তিনি ২০১৭ সালের ফরাসি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একজন মধ্যপন্থি প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন।

ইউসেফ চাহেদ, তিউনিসিয়া

তিউনিসিয়ার ১৫তম সরকারপ্রধান ইউসেফ চাহেদ। জন্ম ১৯৭৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। বর্তমান বয়স ৪১ বছর। তিউনিসিয়া জাতীয় কৃষি ইনস্টিটিউটের কৃষি প্রকৌশলের ছাত্র ইউসেফ চাহেদ ১৯৯৮ সালে ভ্যালিডিকোরিয়ানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৮৮১ সাল থেকে তিউনিসিয়া ফ্রান্সের একটি উপনিবেশ ছিল। ১৯৫৬ সালে এটি স্বাধীনতা লাভ করে। আধুনিক তিউনিসিয়ার স্থপতি হাবিব বুর্গিবা দেশটিকে স্বাধীনতায় নেতৃত্ব দেন এবং ৩০ বছর ধরে দেশটির রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর তিউনিসিয়া উত্তর আফ্রিকার সবচেয়ে স্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ইসলাম এখানকার রাষ্ট্রধর্ম; প্রায় সব তিউনিসীয় নাগরিক মুসলিম। কিন্তু সরকার ইসলামি মৌলবাদীদের রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করেছে। ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর আরব-গণজাগরণের সূচনা হয় তিউনিসিয়ায়। জেসমিন বিপ্লবের ফলে ১৪ জানুয়ারি শাসক জেন এল আবেদিন বেন আলির পতন ঘটে এবং তিনি সৌদি আরবে পালিয়ে যান। ২০১৬ সালের ৬ আগস্ট থেকে দেশটির সরকারপ্রধানের দায়িত্বে আছেন ইউসেফ চাছেন ইউসেফ চাহেদ।

এ ছাড়া কজন বেশি বয়সী রাষ্ট্রপ্রধান

রবার্ট মুগাবে (জন্ম : ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৪) ১৯৮৭ সালে জিম্বাবুয়ের রাষ্ট্রপতি। বয়স এখন ৯৩ বছর।

এলিজাবেথ দ্বিতীয় (জন্ম : ২১ এপ্রিল, ১৯৬২) বয়স এখন ৯১ বছর। ১৯৫২ সাল থেকে তিনি যুক্তরাজ্যে রানিসহ ১৫ দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে।

বেজি ক্যাড এসসেবি (জন্ম : ২৯ নভেম্বর ১৯২৬) বয়স ৯০-এর কোঠায়। ২০১৪ থেকে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট।

কিম ইয়ং-নাম (জন্ম : ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮) বয়স ৮৯ বছর। ১৯৯৮ থেকে উত্তর কোরিয়া সুপ্রিম পিপলস অ্যাসেম্বলি প্রেসিডিয়ামের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে আছেন।

শেখ সাবাহ আল আহমদ আল-জাবের আল-সাবাহ (জন্ম : ১৬ জুন ১৯২৯) বয়স ৮৭ বছর। কুয়েতের আমির ২০০৬ সাল থেকে।

স্যার এলিয়ট বেলগ্রেভ (জন্ম : ১৬ মার্চ ১৯৩১) বয়স এখন ৮৬ বছর। ২০১২ থেকে গভর্নর জেনারেল বার্বাডোজের।

রাউল কাস্ত্রো (জন্ম : ৩ জুন ১৯৩১) ২০০৮ সাল থেকে কিউবার রাষ্ট্রপতি। বয়স ৮৫ বছর।

ডেম মার্গরাইট পিনডলিং (জন্ম : ২৬ জুন ১৯৩২) বয়স এখন ৮৪ বছর। বাহামার গভর্নর জেনারেল ২০১৪ সাল থেকে।

স্যার কর্নভিল ইয়াং (জন্ম : ২০ নভেম্বর ১৯৩২) বয়স ৮৪-এর কোঠায়। বেলিজের গভর্নর জেনারেল ১৯৯৩ সাল থেকে।

পল বিয়া (জন্ম : ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৩) ১৯৮২ সাল থেকে ক্যামেরুনের ৮৪ বছর বয়স্ক এ রাষ্ট্রপতি ক্ষমতায় আছেন।