পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অপরিহার্য

মিথুশিলাক মুরমু:  জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের প্রণীত বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক নিয়ে বেশ হৈ চৈ হচ্ছে দীর্ঘদিন থেকেই। কিছুদিন আগে জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রতিবেদনে জানতে পেরেছি যে, ধর্মীয় সংখ্যালঘু বুদ্ধিজীবী কিংবা সাহিত্যিকদের লেখাগুলো ক্রমশই নির্বাসিত করা হচ্ছে। অতঃপর আবিষ্কার করা সম্ভবপর হয়েছে যে, পাঠ্যপুস্তকগুলোতে ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার বীজ রোপণ করা হচ্ছে।

সাম্প্রদায়িকতা বলতে আমরা বুঝি ধর্ম বিশ্বাস এবং জাতিগত পরিচয়ে যারা মানুষকে মূল্যায়ন করে এবং নিজ ধর্ম বিশ্বাস ছাড়া অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, মানুষের চেতনাতে যখন মননশীলতায় ভালোবাসার পরিবর্তে জিঘাংসা, সাম্যের পরিবর্তে অসাম্য, সৃজনশীলতার পরিবর্তে দাম্ভিকতা, স্বাধীনতার পরিবর্তে অধিকার হরণ করে, তখন আমরা তাকে বলি সাম্প্রদায়িকতা। ‘সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদবিরোধী মঞ্চ’-এর ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় জাতীয় কনভেনশনের অন্যতম দাবি ছিল ‘জাতীয় সংসদে গৃহীত শিক্ষানীতি ২০১০, নারী উন্নয়ন নীতি দ্রুত বাস্তবায়ন এবং কৃষিসহ সব ক্ষেত্রে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।’

২০১০ খ্রিস্টাব্দের ২৮ মে প্রতিষ্ঠিত ‘সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদবিরোধী মঞ্চ’-এর স্মরণিকার সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়, সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসী শক্তি যেন আবার ক্ষমতায় ফিরে আসতে না পারে, সে লক্ষ্যে নিজেদের ঐক্য সুদৃঢ় করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে নিতে এ সম্মেলন ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করছি। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক ও সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হতে পারে না। ইংরেজ শাসনামলে ইংরেজরা উরারফব ধহফ জঁষব নীতি সুকৌশলে ব্যবহার করে উপমহাদেশের জনসাধারণের অসাম্প্রদায়িক চেতনাতে সাম্প্রদায়িকতার বীজ রোপণ করেছিল। ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য ‘সংস্কৃতি কলেজ’ নির্মাণ করে। অপরদিকে সিপাহী বিদ্রোহের পর স্যার সৈয়দ আহমেদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গবিভক্তির নাম করে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়।

ঢাকা ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে ‘বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশন’-এর পথযাত্রা শুরু হয়। সংখ্যালঘু আদিবাসী এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের দুঃখ-বেদনা, অধিকার-বঞ্চনার বিষয়গুলোতে সোচ্চার হয়ে সরকারের দোরগোড়ায় পেঁৗছানোর গুরুদায়িত্ব স্কন্ধে নিয়েছে। ১০ দফা দাবিতে ক্রমশই রাজপথ, মিডিয়া এবং সাংগঠনিকভাবে লবিং-গ্রুপিং করে সম্ভবপর স্বার্থকে উদ্ধার করতে একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ১০ দফার অন্যতম দাবি হলো_ ‘৭. মৌলচেতনায় ‘৭২-এর সংবিধানে ফিরে যেতে হবে, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার সব কার্যকর উদ্যোগ ও নীতি গ্রহণ করতে হবে; ৮. সরকারি স্কুল যেখানে খ্রিস্টান ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করছে, সেখানে তাদের ধর্মশিক্ষার জন্য খ্রিস্টান ধর্মশিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।’

ইতোমধ্যেই আমরা অবলোকন করেছি যে, ধর্মীয় সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরা পাঠ্যপুস্তকের অভাবে এবং শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে ইসলাম ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম কিংবা হিন্দু ধর্ম পরীক্ষা দিতে এক প্রকার বাধ্য হচ্ছে। অপরদিকে খ্রিস্টান ধর্মেও রোমান ক্যাথলিক ও প্রস্টেস্ট্যান্ট এ দু’গ্রুপের বিশ্বাসগত এবং পাঠ্যপুস্তকে শব্দগত অনেক পার্থক্য থাকাতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বেশ অসুবিধা হচ্ছে। ক্ষেত্র বিশেষে পবিত্র বাইবেলের সঙ্গেও পাঠ্যপুস্তকগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, বিষয়টি সত্যিই চিন্তা করার ব্যাপার। বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশন’-এর ৫ম কাউন্সিল অধিবেশন ২০১৬’-এর প্রদত্ত বাণীতে উল্লেখ করেছেন, ‘বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ।

বহু বছর ধরে এখানে মুসলিম, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টানসহ সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ সম্প্রীতির মেলবন্ধনে শান্তিতে বসবাস করে আসছেন। খ্রিস্টান সম্প্রদায় এ দেশের উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা, উন্নয়ন, সমবায়, বৈদেশিক রেমিটেন্স প্রবাহ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে এ সম্প্রদায়ের অবদান রয়েছে। … বর্তমান সরকার ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের প্রতি সমদৃষ্টিতে বিশ্বাসী। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক ও সমৃদ্ধ দেশ গড়তে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমি আশা করি সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করে রূপকল্প ২০২১ ও রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব।

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ-এর ৯ম ত্রিবার্ষিক জাতীয় সম্মেলনেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অপরিহার্য বিষয়টি উঠে আসছে। বলা হয়েছে, ‘… সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে’র ঘোষণা আছে, একই সঙ্গে তৃণমূলে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, হুমকি, হামলা অতীতের মতোই অব্যাহত আছে। … যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছে, কয়েকজনের ফাঁসিও হয়েছে, তবে একই সঙ্গে পাকিস্তানি কায়দায় সাম্প্রদায়িক অপশক্তির মেলবন্ধনে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তক সাম্প্রদায়িকীকরণ হয়েছে।

 

… যে কোন ধরনের সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, বর্ণবৈষম্য ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ রোধে রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিতে হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে সুনিশ্চিত করতে হবে।’ ইতিপূর্বে ৪ ডিসেম্বর ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত সংগঠনের ‘জাতীয় ঐকমত্যের দাবিনামাতেও লক্ষ্য করা যায়, ‘ … অপ্রিয় হলেও সত্য, দেশ আজও সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় বৈষম্যমুক্ত হতে পারেনি। সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজাল ছিন্ন করে এখনও সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসতে পারেনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান।’

দাবি-দাওয়ার প্রশ্নে বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্রে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সাম্প্রদায়িকতার অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে_ ক. জাতীয় স্কুল টেঙ্ট বুক বোর্ড প্রণীত ও অনুমোদিত পাঠ্যপুস্তকে দেশের সব ধর্ম ও জাতিসত্তার সমমর্যাদার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। খ. দেশের সব বিদ্যালয়ে ইসলাম ধর্মশিক্ষার পাশাপাশি হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টানসহ অপরাপর ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ধর্মজ্ঞ শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

সব পর্যায়ের ধর্মশিক্ষকের ক্ষেত্রে বেতন বৈষম্যের অবসান করতে হবে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে, অনুদানে ও পরিচালনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সব ধর্মের ধর্মীয় শিক্ষায়তন চালু করতে হবে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মশিক্ষার বিদ্যমান শিক্ষায়তনগুলোকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ শীর্ষক শিরোনামে বলা হয়_ যে কোন ধরনের সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, বর্ণবৈষম্য ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ রোধে রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিতে হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে সুনিশ্চিত করতে হবে। যথাযথ ক্ষমতায়ন ও অংশীদায়িত্ব নিশ্চিতকরণসহ উল্লেখিত দাবিসমূহ বাস্তবায়ন করা না হলে ধর্মীয় জাতিগত সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী ভবিষ্যতে ভিন্ন চিন্তা করতে বাধ্য হবে, যা কারও কাছে কাম্য নয়।

আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি যে, স্বাধীনতা উত্তরকালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকার দেশে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেন কিন্তু ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকান্ডের পর তারা আইনগতভাবে রাজনীতি করার সুযোগ পায়। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা তাইতো মহান মুক্তিযুদ্ধকে অসাম্প্রদায়িক চেতনাতে উন্নীত করতে পেরেছিলেন। স্বাধীন মুক্ত বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার ঠাঁই দিতে পেরেছিলেন। ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ থেকে ‘আওয়ামী লীগে’ পরিণত করতে তার ভূমিকা প্রশংসনীয়।

জীবনভর তিনি স্বীয় ধর্ম পালন করেছেন এবং অন্য ধর্মগুলোকে যথাযথ সম্মান, শ্রদ্ধা ও গুরুত্ব দিয়েছেন। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, তারই সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির হাজার বছরের বহমান ঐতিহ্যকে লালন ও প্রতিষ্ঠা করতে পিছপা হবেন না। আমাদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা প্রতিনিয়ত বিদ্যালয়ে জাতীয় সঙ্গীত এবং দেশ গড়ার জন্য শপথ বাক্য উচ্চারণ করে থাকে। শপথ বাক্যের গূঢ় রহস্য যেন ছেলেমেয়েরা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়, এটি আমাদের প্রত্যাশা।

অগ্রসরমান পাঠকদের উদ্দেশে শপথ বাক্যটি পুনর্বার উল্লেখ করা হলো_ ‘আমরা শপথ করিতেছি যে, স্বদেশের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখিব। স্ব-স্ব ধর্মের বিধিবিধান এবং বিদ্যালয়ের যাবতীয় নিয়ম-শৃঙ্খলা মানিয়া চলিব। পিতা-মাতা, শিক্ষক এবং গুরুজনের আদেশ মানিয়া চলিব। নিজেকে একজন আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়িয়া তুলিতে সর্বদা সচেষ্ট থাকিব। হে আল্লাহ, আমাদিগকে শক্তি দিন, আমরা যেন সৎ কর্মের দ্বারা দেশ ও জাতির সেবা করিয়া বাংলাদেশকে একটি আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে গড়িয়া তুলিতে পারি এবং বিদ্যালয়ের সুনাম উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করিতে পারি। আমিন।