টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা

রনজিত কুমার শীল, চট্টগ্রাম : কয়েক ঘন্টার টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। থৈ থৈ করছে পানি। একই সাথে অসহনীয় দূর্ভোগে পড়েছে নগরীর নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী ও ব্যবসায়ীরা। আবার আশংকা রয়েছে পাহাড় ধ্বসের। টানা বৃষ্টিতে ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারনে পাহাড় ধ্বসে পাহাড়ের পাদদেশে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের মারাত্বক প্রাণহানি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো: সামসুল আরেফিনের নির্দেশ কিছুদিন আগে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটগন নগরীর লালখান বাজারের মতিঝর্ণা পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে গ্যাস,পানি ও বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেন। এর পর আবার ও পাহাড়ের পাদদেশে অনেকে ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে। বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারনে সড়কে নেই কোন যানবাহন। কয়েকটি রিক্সা, হিউম্যান হলার ও সিএনজি অটো রিক্সা ছাড়া সড়কে আর কিছুই নেই।

আবার অনেক সিএনজি অটোরিক্সা, ব্যাটারী রিক্সা, বাস,টেম্পু,হিউম্যান হলার সড়কে হাঁটু পানিতে আটকা পড়ে যায়। নীচ তলার বাসা বাড়ী ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।নষ্ট হয়ে গেছে শাক- সব্জির বাগানসহ শত শত একর ফসলী জমি।

এদিকে, টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে চট্টগ্রাম নগরে জলাবদ্ধতা ও মানুষের দুর্ভোগের বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। এক বিবৃতিতে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত নগরবাসীর প্রতি সহানুভ‚তি প্রকাশ করে চট্টগ্রাম নগরীকে জলাবদ্ধতা মুক্ত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক সহযোগিতা চেয়েছেন।

টানা বৃষ্টিতে ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়েও পানি জমে যায়। ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক জসীম উদ্দিন জানান, তাদের মাঠে প্রায় তিন ফুট পানি জমেছে। গ্যারেজ, ফুয়েল রুম, প্রশাসনিক ভবনেও পানি ঢুকেছে। মাঠে রাখা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সরঞ্জাম পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের কার্যক্রমেও জটিলতা সৃষ্টি হবে বলে আশঙ্কা করছেন জসীম। গতকাল শুক্রবার ভোর থেকে ৯টা পর্যন্ত টানা বৃষ্টির পর কছুটা কমলেও ১০টার পর আবার বাড়তে শুরু করে। ঝড়বৃষ্টির মধ্যে নগরীর বিভিন্ন এলাকা সকাল থেকেই বিদ্যুৎহীন।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয় জানিয়েছে, সকাল ৬টা থেকে ছয় ঘণ্টায় ৬৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

আবহাওয়াবিদ শেখ ফরিদ আহমেদ বলেন, কালবৈশাখীর সঙ্গে ভারি বর্ষণ আজ শনিবার পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। তবে এজন্য কোনো সংকেত দেখাতে বলা হয়নি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, টানা বৃষ্টিতে নগরী মুরাদপুর,শুলকবহর, বিবিরহাট, নাজিরপাড়া, এশিয়ান হাইওয়ে সোসাইটি, ষোলশহর, ২ নং গেইট, জিইসি মোড়, প্রবত্তক মোড়, গোলপাহাড় মোড়, বহদ্দারহাট, বাকলিয়া, চকবাজার, ধুনির পুল,তাহের কলোনী,মিয়ার বাপের মসজিদ, দেওয়ান বাজার, বাদুরতলা,বউ বাজার, মিয়াখান নগর,হালিশহর, ছোটপুল, ঈদগা, অগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা, কাট্টলী, সাগরিকার বাইন্যা পাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।

অনেক স্থানে বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি একত্রিত হয়ে সড়ক, রাস্তা ও অলিগলিতে ৪/৫ ফুট পর্যন্ত পানি জমে গেছে। হাজার হাজার বাসা- বাড়ীতে পানি ঢুকে শিশু, বৃদ্ধ ও রোগীসহ অসংখ্য মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। পানিতে অনেক পরিবারের রান্না ঘরের চুলা পানিতে ঢুবে যাওয়ায় খাবার পর্যন্ত রান্না করতে পারছেনা।

নগরীর বাকলিয়া থানাধীন ডিসি রোডের মিয়ারবাপের মসজিদ সংলগ্ন দুলা মিয়া সওদাগর বাড়ির গৃহবধূ সৈয়দা খাতুন জানান, ভোর রাত থেকে টানা বৃষ্টির কারণে নিচ তলার ঘরে পানি ঢুকে গিয়ে মূল্যবান জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে যায়। একই সাথে রান্না ঘরের চুলা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার কারণে রান্নাবান্না করা সম্ভব হয়নি। সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের গাফেলতির কারণে ও সঠিক সময়ে নালা নর্দমা পরিস্কার না করার কারণে একটু বৃষ্টি হলেই নিজের এলাকাসহ আশপাশের নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে যায়।

নগরীর ডবলমুরিং থানাধীন আগ্রাবাদের ছোটপুল হিন্দুপাড়ার বাসিন্দা ওষুধ ব্যবসায়ী শুভাষ চন্দ্র শীল জানান, কয়েক ঘন্টার টানা বৃষ্টিতে ছোটপুল, বেপারিপাড়া ও সিডিএ আবাসিক এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি ও জোয়ারের পানির প্রভাবে ছোটপুল সড়কের উপর ৫/৬ ফুট পানি জমে বাসা-বাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। ফলে অনেক পরিবার তাদের শিশু সন্তানদের নিয়ে কেউ খাটের উপর আবার কেউ অন্যের বিল্ডিংয়ে আশ্রয় নিয়েছে। এসব এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি মেয়রের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তিনি।

নগরীর নালা- নর্দমা সঠিক সময়ে পরিস্কার না করা,নালা ও খাল দখল করে দোকানসহ অবৈধ স্থাপনা নির্মান, নির্দিষ্ট ডাস্টবিন ও বাসা বাড়ীতে সরবরাহকৃত বিনে ময়লা না ফেলে নালা বা ড্রেনে যত্রতত্র বাসা- বাড়ীর ময়লা আবর্জনা ফেলা, বৃষ্টির কারনে পাহাড় থেকে বালি নেমে এসে ড্রেন ভরাট, সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীদের কাজে অবহেলাসহ নানা কারনে একটু বৃষ্টিতেই নগরীতে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। ফলে নগরবাসী অবর্ণনীর্ দুর্ভোগে পড়ে- এমন মন্তব্য করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ মো: দেলোয়ার হোসেন।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন, সিডিএ,ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিতভাবে কাজ করলে চট্টগ্রাম নগরী জলাবদ্ধতামুক্ত গ্রিন ও ক্লিন সিটিতে রূপান্তরিত হবে।