ইন্টারনেটে জোচ্চুরি, কাঙ্ক্ষিত সেবা নেই

সমীর কুমার দে:  ‘ইন্টারনেট এক গোলকধাঁধা। এর চক্করে পড়লে আর রক্ষা নেই। শুধু টাকাই যায়। কিভাবে কাটে তাও বুঝি না। আর সেবার নামে যা মেলে তা বলে লাভ নেই। ঢাকা শহরে তো মেইলটা খোলা যায়। কিন্তু বিভাগীয় শহরে বা জেলা শহরে একটা মেইল খুলতেই কয়েক মিনিট লাগে। এভাবে কি ডিজিটাল বাংলাদেশ হবে?’ ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে ইন্টারনেট নিয়ে এভাবেই ক্ষোভের কথা বললেন বেসিস সভাপতি প্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার।

টুজি থেকে যখন থ্রিজি আসল, তখন সবাই স্বপ্নে বুক বেঁধেছিল। ইন্টারনেটের গতি হয়ত বাড়বে। নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করা যাবে। কিন্তু সেটা মিলছে না। সেবার নামে মানুষ যা পাচ্ছে তা কেবলই হতাশা। একটি ফাইল খুলতেই কেটে নিচ্ছে কয়েক মেগাবাইট ইন্টারনেট। আবার বন্ধ করে রাখলেও ইন্টারনেটের মেগাবাইট কমে যাচ্ছে! বিভিন্ন রকমের প্যাকেজের চক্করে পড়ে মানুষের ত্রাহিত্রাহি অবস্থা। এর মধ্যে আসছে ফোরজি। টু থেকে থ্রি, এরপর ফোর- শুধু সংখ্যাটাই পাল্টাচ্ছে, সেবার পরিবর্তন হচ্ছে না। বাড়ছে না ইন্টারনেটের গতিও।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ক্ষুব্ধ গ্রাহক আমীর উদ্দিন বলেন, ‘১৩ কোটি মানুষ এই মোবাইল ফোনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মোবাইল ফোন অপারেটররা টাকা কেটে নিচ্ছে, সেবা দিচ্ছে না। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাও আছে। কিন্তু কাউকেই তোয়াক্কা করছে না মোবাইল অপারেটররা। আসলে তাদের ক্ষমতার উত্স কি? কোন ক্ষমতার বলে তারা কোটি কোটি মানুষের সঙ্গে দিনের পর দিন প্রতারণা করে চলেছে। সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে মাঠে নামলে কারো রক্ষা হবে না।’

মোবাইল ফোন অপারেটররা বলছে, থ্রিজির যুগে প্রবেশের পর ইন্টারনেটে গতি বেড়েছে কয়েকগুণ। মানুষের জীবনযাত্রা সহজ হয়েছে। আর না বোঝার কারণে মেগাবাইট কমে যাচ্ছে। কারণ স্মার্ট ফোনে অনেক অ্যাপস থাকে, যা ইন্টারনেট চালু হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপডেট নিতে থাকে। ফলে গ্রাহক বুঝতে পারে না তার মেগাবাইট কিভাবে কমে যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইন্টারনেট হচ্ছে সভ্যতার মেরুদণ্ড। তাই ইন্টারনেট ছাড়া সভ্যতা কল্পনা করাও কঠিন। ফলে জনগণ যে টাকা দিচ্ছে তার যেন সঠিক সেবাটা পায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। মানুষকে বোকা বানিয়ে ইন্টারনেটের নামে মোবাইল ফোন থেকে যেন টাকা লুট হয়ে না যায়।

একজন তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘হাজার রকমের প্যাকেজের নামে জোচ্চুরি করে টাকা নেওয়া হচ্ছে। এত প্যাকেজ দেওয়া হয় শুধু মানুষকে বোকা বানাতে। এসব বিষয়ে অভিযোগ করে কোনো লাভ নেই। আমরা এখন জিম্মি।’

একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা জাকিউল ইসলাম বলেন, ‘মোবাইল ফোন থেকে কথা বলার সময় টাকা কেটে নিলেও আমরা ধরতে পারি। বুঝতে পারি কত টাকা কাটা গেল। কিন্তু ইন্টারনেটে তো কিছুই বোঝা যায় না।’ রাশেদুল ইসলাম নামে একজন গ্রাহক বলেন, এতদিন থ্রিজি সেবা সারাদেশে থাকার কথা। কিন্তু জেলা শহর তো নয়ই, বিভাগীয় শহরেও ঠিকমতো থ্রিজি পাওয়া যায় না। খোদ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় থ্রিজি আসে না। দুই মিনিট থ্রিজি থাকলে পরের মিনিটই টুজিতে নেমে আসে। টাকা কিন্তু কাটছে থ্রিজির দামেই।

মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘প্যাকেজের নামে যা হচ্ছে সেটা রীতিমতো মহা অন্যায়। কারণ আমার প্যাকেজ কখন শেষ হচ্ছে আমি জানি না। এরপর কিলোবাইট হিসেবে টাকা কাটতে শুরু করে। কিছুদিন পর দেখা যায় যত টাকাই থাকুক ব্যালেন্স শূন্য। এই ধরনের অনাচার পৃথিবীর কোনো দেশে হয় না। আর এখানে অনাচার হলে অভিযোগ করারও জায়গা নেই। তাই বলি এভাবে ডিজিটাল বাংলাদেশ হবে না। এর জন্য ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট দরকার।’

বিটিআরসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইন্টারনেট ব্যবহার সম্পর্কে গ্রাহকের অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করা হয়েছে। ডাক, ই-মেইল ও ফোন; ওয়েবসাইট এবং শর্ট কোডে অভিযোগ নেওয়া হচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির সর্বশেষ ফেব্রুয়ারির হিসাবে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে ইন্টারনেট গ্রাহক পৌনে ৭ কোটি।

প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর এক নিলামের মাধ্যমে থ্রিজির স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেওয়া হয়। গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি ও এয়ারটেল বরাদ্দ পায় থ্রিজি স্পেকট্রাম। ২ হাজার ১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ৪০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম বরাদ্দের নিলামে গ্রামীণফোন নেয় ১০ মেগাহার্টজ। বাংলালিংক, রবি ও এয়ারটেল প্রত্যেকে নেয় ৫ মেগাহার্টজ করে। আর আগে আগেই রাষ্ট্রীয় অপারেটর টেলিটককে দেওয়া হয় ১০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম।